মুরারিবাবু বললেন, আপনি ভুল দেখেছেন! আমি ছড়িহাতে বেঞ্চে বসিনি। ছড়িটা ওখানেই রাখা ছিল।
এবার তর্ক বেধে গেল। ভদ্রলোক চেঁচিয়ে ডাকলেন, অবিনাশদা! রঞ্জনবাবু! আপনারা শিগগির এখানে আসুন তো!
সেই বেঞ্চ থেকে চার প্রবীণ হন্তদন্ত এসে গেলেন। তারপর কথাটা শুনে সব্বাই একবাক্যে বললেন,–পরিতোষবাবু ঠিকই বলছেন। আমরাও দেখেছি আপনি এই কালো ছড়ি হাতে নিয়ে এসে বেঞ্চে বসলেন। এখন বলছেন, ওটা নাকি আপনার নয়। ব্যাপারটা কী খুলে বলুন তো?
সবকথা খুলে বললে হয়তো এঁরা তাকে পাগল ভেবে ঠাট্টাতামাশা করবেন। এই ভেবে মুরারিবাবু ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, ঠিক আছে। ছড়িটা দিন।
বলে ছড়িটা নিয়েই তিনি হন্তদন্ত বেরিয়ে এলেন পার্ক থেকে। এঁরা চারজন ততক্ষণে হাসাহাসি করে সত্যিই বলছেন,–পাগল! পাগল! এক্কেবারে বদ্ধপাগল!
মুরারিবাবু মনে-মনে বললেন,–এখনও পাগল হইনি। তবে শিগগির যে পাগলা হয়ে যাব, তা ঠিক। ওঃ! হতচ্ছাড়া ছড়িটা!
গলিতে ঢুকে তিনি ঠিক করলেন, ছড়িটা বরং থানায় জমা দেবেন। শুধু বলবেন, এটা তিনি আজ ভোরবেলা পার্কে কুড়িয়ে পেয়েছেন।…..
বাড়ি ফিরে ব্রেকফাস্ট করে এবং তারিয়ে-তারিয়ে এক গেলাস চা খেয়ে মুরারিবাবু ছড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
কিন্তু থানায় গিয়ে আরেক কাণ্ড।
থানার বড়বাবু ছড়িটা দেখেই উত্তেজিতভাবে হাঁক দিলেন, সমাদ্দারবাবু! সমাদ্দারবাবু! শিগগির আসুন।
একজন পুলিশ অফিসার হন্তদন্ত ঘরে ঢুকে বললেন, বলুন সার!
বড়বাবু বললেন, দেখুন তো এটা আঢ্যিবাবুর সেই ছড়িটা কিনা! ওঁর স্ত্রী বলেছিলেন, একটা কালো ছড়ি হাতানোর জন্যই ডাকাতরা আঢ্যিবাবুকে খুন করেছিল। ভদ্রমহিলা ছড়িটার যে ডেসক্রিপশন দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে এটা মিলে যাচ্ছে। তাই না?
সমাদ্দারবাবুও ছড়িটা দেখে চমকে উঠেছিলেন। ওটা হাতে নিয়ে হাতলের নিচে রুপোলি অংশটা খুঁটিয়ে দেখার পর তিনি বললেন, হ্যাঁ সার! এই তো এখানে খোদাই করা আছে এস, কে, আত্যি। তার মানে সুশীলকুমার আত্যি।
মুরারিবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। বড়বাবু তার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন,–দেখুন মশাই! এটা এক সাংঘাতিক মার্ডার কেস। ছেলেখেলা নয়। সত্যি করে বলুন তো আপনি এটা কোথায় পেয়েছেন?
সমাদ্দারবাবু বললেন,-সার! আগে দেখা যাক, এটার ভেতর হীরেগুলো আছে কি না। যদি না থাকে, তাহলে এই ভদ্রলোককে অ্যারেস্ট করতে হবে।
বলে তিনি ছড়ির হাতলটা ঘোরাতে শুরু করলেন। মুরারিবাবু অবাক হয়ে দেখলেন, পঁাচ খুলে হাতলটা আলাদা হয়ে গেল। তারপর সমাদ্দারবাবু ছড়ির মাথার দিকটা টেবিলে ঠুকতে থাকলেন। কয়েকবার ঠোকার পর খুদে তিন টুকরো উজ্জ্বল কী জিনিস বেরিয়ে এল। জানালা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছিল বড়বাবুর টেবিলে। সেই রোদে তিন টুকরো জিনিস থেকে চোখ ধাঁধানো দীপ্তি ঝলমলিয়ে উঠল। মুরারিবাবু হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
এবার বড়বাবু সহাস্যে বললেন, আপনি এই ছড়িটা কোথায় পেলেন, বলুন তো মশাই?
মুরারিবাবু গুম হয়ে বললেন,–আজ ভোরবেলা পার্কে কুড়িয়ে পেয়েছি। কিন্তু ব্যাপারটা কী সার?
বললুম না? মার্ডার কেস। বড়বাবু বললেন, কদিন আগে সুশীলকুমার আঢ্যি নামে এক ভদ্রলোক এই ছড়িহাতে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। তারপর একটা গলির মোড়ে তাঁর ডেডবডি পাওয়া যায়।
সমাদ্দারবাবু বললেন, স্যার! আমার মনে হচ্ছে, যে কোনও কারণেই হোক, খুনিরা এই ছড়িটা হাতাতে পারেনি।
বড়বাবু বললেন, কারণটা এবার আসামীদুটোর মুখ থেকেই শোনা যাক। ওদের হাজত থেকে এখনই নিয়ে আসুন। ওরা এবার কী বলে শোনা যাক।
সমাদ্দারবাবুর নির্দেশে দুজন কনস্টেবল হাতকড়া এবং কোমরে দড়িবাঁধা দুটো লোককে টানতে-টানতে নিয়ে এল। একজন বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা এবং অন্যজন রোগা। সমাদ্দারবাবু তাদের পেটে বারকতক বেটনের গুতো মেরে বললেন,–বল হতচ্ছাড়ারা! এই ছড়ির জন্যই তোরা সুশীলবাবুকে মার্ডার করেছিস। কিন্তু ছড়িটা হাতাতে পারিসনি কেন?
বেটনের গুতোর সঙ্গে চুল খামচে বেজায় টানাটানির চোটে অস্থির হয়ে বেঁটে লোকটা বলে উঠল, আমরা দুজনে সঙ্গে ছিলুম বটে, তবে খুনটা করেছিল বেচুলাল, সার! ছড়িটা সেই হাতিয়েছিল। পরদিন বেচুর কাছে গিয়ে শুনি, ছড়িটা নাকি তার ঘর থেকে নিপাত্তা হয়ে গেছে। আমরা বিশ্বাস করিনি। ওকে খুব শাসিয়েছিলুম। বেচু মা কালীর দিব্যি কেটে বলেছিল, রাতদুপুরে খুটখুট শব্দ শুনে সে আলো জ্বেলে দেখেছিল, ছড়িটা নাকি জানলা গলিয়ে পালিয়ে গেল। আর ঘরে নাকি ঝঝালো সেন্টের গন্ধ। আপনারা বেচুকে খুঁজে বের করুন সার!
এবার মুরারিবাবু চুপ করে থাকতে পারলেন না। বলে উঠলেন, একটা কথা জিগ্যেস করি। সুশীলবাবুর মাথার চুল কি সাদা ছিল?
বেঁটে আসামী ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।
–ওঁর পরনে কি গিলেকরা আদ্দির পাঞ্জাবি ছিল?
–আজ্ঞে।
–পরনে ধাক্কাপাড়ের ধুতি আর পায়ে পামশু ছিল?
–আজ্ঞে।
মুরারিবাবু চুপ করে গেলেন। বড়বাবু বললেন, আপনি সুশীলবাবুকে চিনতেন নাকি মশাই?
আস্তে মাথা নেড়ে মুরারিবাবু বললেন,-এবার কি আমি যেতে পারি সার?
–হ্যাঁ। তবে নাম-ঠিকানা আর একটা স্টেটমেন্ট লিখে দিয়ে যান। সমাদ্দারবাবু! এঁর স্টেটমেন্ট নিন।
