ওরা কোরাস গাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,–ভোঁদরের গর্তে।
–কাল ব্যাটাকে দেখব। এখন আয় তোরা, জিমকে ধর। লেজটা পরিয়ে দিই।
চারজনে জিমকে নিয়ে ব্যস্ত হল! আর সেই সুযোগে আমি ফুড়ুত করে কেটে পড়লুম দরজা গলিয়ে। তারপর দৌড়, দৌড়, দৌড়। অন্ধকারে কতবার ঠোক্কর খেলুম। রাস্তায় গড়িয়ে পড়লুম। শিশিরে কাদায় পোশাকের অবস্থা যা হল, বলার নয়।
হাইওয়েতে পৌঁছে ভাগ্যিস গাড়িটা পাওয়া গেল। ভেতরে বব নির্বিকার ঘুমোচ্ছিল। ঘুমজড়ানো গলায় বলল,–শুয়ে পড়ো। সকাল অব্দি উপায় নেই।
হাইওয়েতে পুলিশের টহলদারি আছে। শেষরাতে তাদের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল। গাড়ির অবস্থা দেখে তাদের অফিসার ববকে বলেছিল,–এই ভিনটেজ মালটা ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেনো। বব তাতে রাজি। তাদের গাড়িতেই আমাদের লিফট দিয়েছিল।
পথে বব হঠাৎ জিগ্যেস করেছিল,–গাড়ি খারাপ হওয়া জায়গাটার ওখানে টিলার ওপর কে থাকে বলুন তো? ভারী অদ্ভুত লোক।
অফিসার চোখ পাকিয়ে বলেছিলেন,-গাঁজা খাও নাকি?
বব খাপ্পা।–সিগারেট খাওয়া নিশ্চয় গাঁজা খাওয়া নয়।
অফিসার একটু হেসে বলেছিলেন,-ও জায়গাটার নাম আংকল স্যামস কেবিন। শ্যামখুডোর কুটির। বিখ্যাত বই আংকল টমস কেবিনের অনুকরণ। ওখানে শ্যাম নামে একটা লোক থাকত। ভাঙা বাড়িটার সামনে তার কবর দেখেছি। ফলকে মৃত্যুসাল লেখা আছে ১৮৭৫।
বব আমার দিকে চোখ টিপে, কেন কে জানে, শুধু মুচকি হেসেছিল। আমি হাসিনি। ফোঁস করে বড় রকমের একটা নিশ্বাস ফেলেছিলুম। কারণ এই নিয়ে দুবার ফঁড়া গেছে। একবার বাংলামুল্লুকে, আর এবার মার্কিনমুল্লুকে। তফাতটা শুধু ভাষার।…
সত্যি ভূত মিথ্যে ভূত
সেদিন সন্ধ্যায় ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি ঝরছে! টেবিলবাতির আলোয় জম্পেশ করে ৫।একখানা গল্প লেখার জন্য কলম বাগিয়ে ধরেছি, এমনসময় কলিংবেল বাজল। বাজল বলা ভুল, বাজতে লাগল।
লেখার মুড নষ্ট হলে সব লিখিয়েই খাপ্পা হন। খাপ্পা হয়ে উঠে গেলুম। কলিংবেল একবার বাজানোই যথেষ্ট। অন্তত এই কথাটা বলেও মনের ঝাল ঝাড়ব, আগন্তুক যেই হোক না কেন।
দরজা খুলে দেখি, ঢ্যাঙা কেঠো চেহারার প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক। পরনে সাদাসিধে ধুতি-পাঞ্জাবি! মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি-গোঁফ এবং মিটিমিটি হাসি। কিছু বলার আগেই করজোড়ে নমস্কার করলেন। আপনি কি বিখ্যাত লেখক নকুড়চন্দ্র গুই? আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথাবার্তা আছে।
বিখ্যাত কথাটায় প্রশংসা ছিল। আর প্রশংসা শুনলে কোন লেখক না খুশি হন! আমিও খুশি হলুম বইকী। অমন করে বেল বাজানোর কৈফিয়ত চাইতেও ভুলে গেলুম। তাছাড়া জরুরি কথাবার্তা ব্যাপারটাও আশাব্যঞ্জক। ভদ্রলোক নিশ্চয় কোনও প্রকাশক। তাই খাতির করে বললুম,–আসুন, আসুন। ভেতরে এসে বসুন। তারপর কথাবার্তা হবে।
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে সোফায় বসলেন। তারপর হাই তুলে বললেন,–আপনি তো ভূতের গল্প লেখেন?
একটু হেসে বললুম,–মাঝে-মাঝে দু-চারটে লিখি। তা আপনি কি–
ভদ্রলোক আমার কথায় বাধা দিয়ে বললেন, আমার কথা পরে হচ্ছে। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন।
এবার একটু অবাক হয়ে বললুম, কী আপনার প্রশ্ন?
–ওই যে বললুম, আপনি ভূতের গল্প লেখেন! কিন্তু কথাটা হল, আপনি যে ভূতের গল্প লেখেন, আপনি কি কখনও ভূত দেখেছেন?
বিরক্তি চেপে বললুম,–লেখকরা যা লেখেন, কল্পনা করেই লেখেন। ভূতের গল্প লিখতে হলে স্বচক্ষে ভূত দেখতেই হবে, এটা কোনও যুক্তি নয়।
–তার মানে আপনি বানিয়ে লেখেন! সুতরাং আপনি মিথ্যা কথা লেখেন। আপনি একজন মিথ্যুক।
খাপ্পা হয়ে বললুম, কী যা-তা বলছেন আপনি?
ভদ্রলোক বাঁকা হেসে বললেন,–ঠিকই বলছি। আপনি জানেন চীনে-ভূতের গল্প লেখা মানা? লিখলেই জেলে ঢুকিয়ে দেয়। শুধু তাই নয় জেলে ঢুকিয়ে মেথরের কাজ করিয়ে ছাড়ে।
–চীনে কী হয়, তা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নেই, আর দেখুন, আমার সময়ের দাম আছে। আপনি আসুন।
ভদ্রলোক আমাকে গ্রাহ্য করলেন না। বললেন,–ডুকে যখন পড়েছি, তখন সহজে বেরুচ্ছিনে–অন্তত একটা চূড়ান্ত বোঝাঁপড়া যতক্ষণ না হচ্ছে!
গলার স্বর আর কথার ভঙ্গিতে একটু দমে গিয়ে বললুম, কী মুশকিল। বোঝাঁপড়াটা কীসের?
–ভূতের ব্যাপারে।
–বুঝলাম না।
–আপনি–মানে আপনার মতো যারা ভূত নিয়ে গল্প লেখেন তাঁরা কেউই ভূত দেখেননি। অথচ ভূত নিয়ে গল্প লেখেন। আপনারা মিথ্যুক। আপনাদের চীনা শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।
–বেশ। গভর্নমেন্টকে বলুন ব্যবস্থা করতে।
গভর্নমেন্টকে বলে কি হবে না। ভদ্রলোক পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে নাকে এক টিপ নস্যি গুজলেন। তারপর বিকট একখানা হাঁচি হেচে বললেন, ভূতেদের না দেখে ভূতের গল্প লেখা অন্যায়। কারণ এতে খামোকা ভূতেদের ডিসটার্ব করা হয়। চীনারা এটা বুঝেছে বলেই শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।
–ভূত না দেখে ভূতের গল্প লিখলে ভূতেদের ডিসটার্ব করা হয় বলছেন। কথাটা বুঝলুম না।
–খুব সহজ কথা। যাদের স্বচক্ষে দেখেননি, তাদের কথা লিখছেন, তার মানে আপনি তাদের সম্পর্কে ভুলভাল ইনফরমেশন দিচ্ছেন। তারা যা নয়, তাই লিখছেন। তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে, আপনি সত্যের অপলাপ করছেন।
–তাহলে আপনি বলছেন সত্যি সত্যি ভূত আছে?
–আলবত আছে। আপনারা তাদের সম্পর্কে যা লিখছেন, তা কখনও সত্যিকার ভূতের কথা নয়। স্রেফ নকল ভূতের কথা। আপনারা পাঠকদের ঠকিয়ে পয়সা কামাচ্ছেন।
