শ্যামখুড়ো খিকখিক করে হেসে বললেন,–তোমাদের আমি ডিনার খাওয়াতে পারতুম। তুমি ঠিকই ধরেছ।
বাঁচা গেল। মার্কিনিরা রাতের খাওয়া সূর্য ডোবার সঙ্গে-সঙ্গে খেয়ে নেয়। কাজেই আমি ও বব শ্যামখুড়োর কাছে যদি ওই সময় আসতুম, কী হতো ভেবে শিউরে উঠলুম। বব কফির কাপটা রেখে দিয়েছে ততক্ষণে। খুড়ো আপন খেয়ালে বসে বসে দুলছেন। নইলে নিশ্চয় আপত্তি করতেন এবং গিলতে বাধ্য করতেন। দেখাদেখি আমিও কাপটা রেখে দিলুম।
এই সময় একটা প্রকাণ্ড কালো কুকুর নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে খুড়োর পায়ের কাছে বসল। অবাক হয়ে দেখলাম, তার লেজটা পুরোপুরি বাদ। লেজের জায়গায় একটা গর্ত-মত রয়েছে। কুকুরটার জ্বলজ্বলে চোখ। সেই চোখে আমায় দেখছে দেখে ভীষণ ভড়কে গেলুম। কিন্তু ভড়কালে চলবে না। সাহস চাই, প্রচুর সাহস।
বব কুকুরটাকে দেখে বলল, খুড়ো আশাকরি জিমকে কুকুরের স্বাভাবিক খাদ্য খাওয়ান?
শ্যামখুড়ো জবাব দেবার আগেই জিম করল কী, যেন ববকে দেখাবার জন্য মুখ বাড়িয়ে ফায়ারপ্লেস থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো কামড়ে নিল। তারপর মুখ কাত করে হাড় চিবুনোর ভঙ্গিতে চিবুতে শুরু করল। অঙ্গারের কুচি চিড়বিড় করে ছিটকে পড়তে থাকল।
এতক্ষণে বব ভীষণ চমকে উঠল এবং তার চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। শ্যামখুড়োর চোখে পড়লে ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, আঃ, জিম! খায় না, ছিঃ খায় না! বদহজম হবে। তখন সেদিনকার মতো ঘোড়ার নাদির গুলি গিলতে হবে।
জিম বারণ মানল। হয়তো ঘোড়ার নাদির গুলি গিলতে হবে বলেই।
এবার শ্যামখুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হুম! তোমার সঙ্গে কতাবার্তা শুরু করা যাক। হা হে, তোমরা ভারতীয়রা নাকি অনেক রকম গুপ্তবিদ্যা জানো মানে, অকাল্টের কথাই বলছি। একটু নমুনা দেখাও না আমায়?
–খুড়োমশাই, আমি তো কিছু জানি না। করুণ মুখভঙ্গি করে বললুম। আড়চোখে লক্ষ করলুম, ববের ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসি ফুটেছে। আমার অবস্থা দেখেই হয়তো বা।
শ্যামখুড়ো বললেন, জানিনে বললে ছাড়ছিনে বাপু। বলি, আপত্তিটা কীসের? বিদ্যা তো অপরের কাছে জাহির করার জন্যই! বিদ্যা জেনে কি কেউ ঘরে চুপচাপ মুখ বুজে বসে থাকে? কই, ঝাড়ো একখানা নমুনা। ধরো, শূন্যে মাটি ছাড়া হয় বসা– কিংবা জ্বলন্ত আগুনে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকা। যে-কোনওটা।
বেগতিক দেখে বব বলল, বরং তোমার তাসের ম্যাজিকটা দেখাতে পারো খুড়োকে।
খুড়ো ভুরু কুঁচকে বলল,-ম্যাজিক ম্যাজিক কে দেখতে চেয়েছে ছোকরা?
তেজী বব বলল, সবই তো ম্যাজিক। ওই যে অকাট না ফকাল্ট না গুপ্তবিদ্যার কথা বললেন, তা স্রেফ ম্যাজিক ছাড়া কী? একটু আগে আপনার জিমের আগুন খাওয়াটাও তাই। আপনি আসলে একজন ম্যাজিশিয়ান। তা কি বুঝিনি?
–কী বললে? কী বললে? শ্যামখুড়ো রাগের চোটে সটান উঠে দাঁড়ালেন।
–আপনি ম্যাজিশিয়ান। বব অকুতোভয়ে বলল।
আমি ববের দিকে বারবার চোখ টিপছি। এ বিপদের সময় তর্ক করতে নেই। গোঁয়ার বব আমার দিকে তাকাচ্ছেই না। এদিকে শ্যামখুড়ো দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়ে আছেন। গুলি-গুলি চোখ দুটো থেকে দেখতে পাচ্ছি, স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ছে। তবু হাঁদারাম বব কিছু আঁচ করছে না।
হঠাং লিকলিকে আঙুল তুলে খুড়ো চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, বেরিয়ে যাও! বেরিয়ে যাও!
যাচ্ছি।–বলে বব উঠে গটগট করে বেরিয়ে গেল।
আমি উঠতে যাচ্ছি, খুড়ো আমার কাধ চেপে বসিয়ে দিলেন। সারা গা হিম হয়ে গেল। কিন্তু খুডোর মুখে মিঠে হাসি ফুটেছে তক্ষুনি। বুড়ো আঙুল তুলে ববের উদ্দেশে বললেন,–কি জানে না ও ছোকরা। কখনও ওর সঙ্গে আর মিশো না। তুমি আমার কাছে থেকে যাও।
মৃদু আপত্তি করে বললুম,–পরে সময় করে আসব খুড়ো! এখন বরং আমায় যেতে দিন।
এই ঠান্ডায় কোথায় যাবে বাপু?–শ্যামখুড়ো সস্নেহে বললেন,–পাশের ঘরে আরামে ঘুমোতে পারবে। যাকগে, যা নিয়ে কথা হচ্ছিল। কই, শূন্যে বসে থাকাটাই একটু দেখাও।
অগত্যা বললুম,–যখন তখন এ বিদ্যা প্রকাশ করতে নেই খুড়ো। শাস্ত্রে নিষেধ আছে। তিতিনক্ষত্র এসব দেখে তবে না। পাজি দেখে দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে।
খুড়ো বললেন,-তাই বুঝি? ঠিক আছে। তাহলে ওই তো আগুন রয়েছে। অন্তত আগুনে পিঠ রেখে শোয়াটা একবার দেখাও। ওঠো, দেরি কোরো না। টম ডিক হ্যারি এক্ষুনি এসে পড়বে। ওরা এলে আমার অন্য সব কাজকর্ম আছে। ফুরসত পাব না। ওঠো, ওঠো।
আগুনটাও এসময় ফায়ারপ্লেসে কেন কে জানে, দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। আঁতকে উঠলুম। শ্যামখুড়ো লিকলিকে আঙুলে আমাকে খোঁচাতে শুরু করেছেন। পাজি তিথি-নক্ষত্রের কথা তুলব কী, ক্রমাগত পাঁজরে ও পেটে খোঁচা খেয়ে কাতুকুতু লাগছে। হি-হি করে হাসি পেয়ে গেল শেষ অব্দি। তখন শ্যামখুড়োও হি-হি করে হাসতে-হাসতে কাতুকুতু বাড়িয়ে দিলেন।
কাতুকুতুর চোটে ফায়ারপ্লেসে গিয়ে ছিটকে পড়ি আর কী, হঠাৎ হইহই করে দরজা দিয়ে তিনটে নোক ঢুকল। তিনজনের হাতেই তিনটে অদ্ভুত লণ্ঠন। হ্যাঁ, এরাই জলার ধারের সেই তারা। শ্যামখুড়ো আমায় ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–পাওয়া গেল?
টম হ্যারি ডিক তুমুল কোলাহল করে জবাব দিল,–পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে!
শ্যামখুড়ো বেজায় খুশিতে নাচতে নাচতে বললেন,–কোথায় পেলি?
