বব খুশি হয়ে বলল, এসো।
মানে একটা ভরসা হচ্ছে দুজন একসঙ্গে থাকলে ওরা সুবিধা করতে পারবে না। তাছাড়া ববের গায়ে অসুরের জোর আছে। পকেটে রিভলভারও আছে, রিভলভারের গুলিতে ওদের ক্ষতি কিছু না হোক, আমরা অন্তত মনে সাহস পাব। রাতবিরেতে ভয় পেলে আওয়াজ একটা মোক্ষম দাওয়াই কিনা। সেজন্যই নিয়ম আছে ভয় পেলে জোরে গান গাইতে হয় কিংবা আপন মনে কথা বলতে হয়। সাহস ছাড়া ভূতপেতকে হারানোর আর কোনও উপায় নেই। ভয় পেয়েছি টের পেলেই ওরা ঘাড়টি মটকে দেবে। কাজেই ভূতের পাল্লায় পড়লেই হাবভাবে দেখাতে হবে তুমি ভীষণ সাহসী। তাহলে উল্টে ভূতই ভয় পেয়ে পালাবে।
জলার ধার দিয়ে গিয়ে নরম ঘাসে ঢাকা টিলায় উঠতে-উঠতে বললুম,– রিভলবারটা তৈরি রেখো কিন্তু। কিছু বলা যায় না।
বব বলল, না না। এরা চাষাভূষা লোক। বড্ড গোবেচারা।
–বব, কুকুরের লেজ খোঁজাখুঁজির ব্যাপারটা নিয়ে তোমার মনে সন্দেহ জাগছে?
–ওটা তো রসিকতা। তুমি মার্কিন চাষাভূষাদের হালচাল জানো না। ওরা ভারি রসিক।
–যে কর্তার কথা বললে, সে রসিক না হতেও পারে।
চলো তো দেখি লোকটা কেমন। বলে বব জগিংয়ের ভঙ্গিতে টিলাটা বেয়ে উঠতে থাকল।
আমার হাঁপ ধরে যাওয়ার দাখিল। তবে শিগগির থামতে হল আমাদের সামনে ঘন গাছপালা। একফালি পথ খুঁজে পেলুম। পথ ধরে একটু এগুলে কুকুরের ডাক শোনা গেল।
কুকুরের ডাকটা সত্যি বলেই মনে হচ্ছিল আমার। ভূতদের কুকুর থাকতে পারে। কিন্তু তারা কখন ডাকে বলে শুনিনি। যতো এগোচ্ছি, কুকুরটার হাঁকডাক তত বেড়ে যাচ্ছে। সামনে আবছা একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু কোনও আলো নেই। এমন তো হওয়ার কথা নয়। এদেশে বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না! শুধু আলো নয়, হাজার রকমের দরকারি কাজে বিদ্যুৎ লাগে।
বব বলল, ভারি অদ্ভুত তো। মনে হচ্ছে বাড়ির ভেতর কুকুরটাকে বেঁধে রেখে বাড়ির লোকেরা কোথায় বেরিয়েছে। আলো নেই কেন?
এবার ফিসফিস করে বললুম, বব। সেজন্যেই তো তখন বলছিলুম, এরা মানুষ নয়।
বব আমার কথা শুনে হেসে উঠল। তখন থেকে তুমি মানুষ নয় মানুষ নয় করছ কেন বলো তো?
আসল কথাটা বলতে যাচ্ছিলুম, হঠাৎ বাড়ির সবগুলো আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল। কুকুরের ডাকটাও থেমে গেল। সামনে সুন্দর একটা কাঠের বাড়ি দেখতে পেলুম। ছোট্ট লনে একটা ফুলবাগিচাও দেখলুম। বব দৌড়ে গিয়ে বারান্দায় উঠল এবং দরজায় নক করল। আমি লনে দাঁড়িয়ে আলো-অন্ধকারে চোখ বুলিয়ে বিপজ্জনক কিছু আছে কিনা খুঁজতে থাকলুম।
দরজা ফঁক করে এক বুড়ো ভদ্রলোক উঁকি মেরে বললেন, কী চাই?
বব সবিনয়ে বলল,–দেখুন, আমরা আসছিলাম সিডার র্যাপিড এয়ারপোর্ট থেকে। এক বন্ধুকে প্লেনে তুলতে গিয়েছিলুম। ফেরার পথে গাড়িটা বিগড়ে গেছে।
বুড়ো নির্বিকার মুখে বললেন, আমি কী করতে পারি?
–দয়া করে যদি আপনার লোকদের একটু বলেন—
ভদ্রলোক বললেন, আমার লোকেরা সবাই এখন কাজে বেরিয়েছে।
রাগী বব খাপ্পা হয়ে বলল, কুকুরের লেজ খুঁজতে বুঝি?
আশ্চর্য, ভদ্রলোক খিকখিক করে হাসলেন, তাহলে তো জানোই দেখছি। আমার জিমের ওই এক দোষ বুঝলে? বেড়াতে গিয়ে একটা না একটা কিছু ফেলে আসবেই! প্রত্যেক দিন! আজ তো লেজ ফেলে এসেছে। কাল এসেছিল সামনের বাঁ ঠ্যাংটা ফেলে। হতভাগা খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বাড়ি ফিরেছিল। শেষে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া গেল একটা ওক গাছের মাথায়।
বব রাগ চেপে বলল, উড়ে গিয়ে আটকে ছিল বুঝি?
না না।–বুড়ো খুব হাসলেন। দুষ্টু বাজপাখির কাজ। ভাগ্যিস, পরদিন খাবে বলে বাসায় রেখে দিয়েছিল। নইলে জিম খোঁড়া হয়ে থাকত।
বলেই বুড়োর চোখ পড়ল আমার দিকে। বললেন,–ওটা কে?
চটপট বললুম, আমি ভারতের লোক। এদেশে বেড়াতে এসেছি।
দরজাটা পুরো খুলে ভদ্রলোক বেরুলেন। মস্ত আলখাল্লার মতো কালো ওভারকোট গায়ে চাপানো। লম্বাটে চেহারা! নাকটা অসম্ভব খাড়া আর লম্বা। কোটরাগত ছোট্ট দুটো চোখ। ভুরু, চুল, দাড়ি সব সাদা। হাত বাড়িয়ে বললেন, স্বাগত, সুস্বাগত। তুমি ভারতের লোক! এসো এসো। ভেতরে এসো। কী সৌভাগ্য আমার, এতকাল পরে একজন ভারতের লোক পাওয়া গেল। তোমায় আমার বড় দরকার!
বব তো হতভম্ব। কিন্তু বাইরের কনকনে ঠান্ডায় ততক্ষণে রক্ত যেন জমে গেছে। ভূত হোক, আর প্রেতই হোক, ঘরের ভেতর ঢোকাটাই এখন জরুরি।
ভেতরটা সেকেলে আসবাবে ঠাসা! একপাশে ফায়ারপ্লেসও রয়েছে সাবেকি রীতিতে! কানট্রি এলাকায় মার্কিনদের ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা সত্ত্বেও শখ করে ওরা সেকালের মতো ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালে এবং সেখানে বসে গল্পস্বল্প করে।
বব গুম হয়ে বসে রইল। ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম শ্যাম বানভিল। এই এলাকায় লোকে আমায় আংকল শ্যাম–শ্যাম খুড়ো বলে ডাকে। হুম! আগে কফি খাও। পরে কথাবার্তা হবে!
দুধ চিনি ছাড়া কালো কফি খেতে আমি ততদিনে অভ্যস্ত। কিন্তু মুখে দিয়েই বুঝেছি, গণ্ডগোল আছে। রুমাল বের করে মুখ মোছার ছলে তরল পদার্থটুকু পাচার করে দিলুম। তারপর আড়-চোখে দেখি বব কাপ থেকে বাঁ হাতের দুই আঙুলে সরু কী একটা টেনে তুলল। তুলে বলল,–এটা কী শ্যামখুড়ো? বাজ পাখিটার আঙুল নাকি?
শ্যামখুড়ো চোখ বুজে দুলতে-দুলতে বললেন, না, না, ঘাসফড়িং।
বব বলল,–চিনে পাখির বাসার ঝোল রান্না করে খায় শুনেছি। ঘাসফড়িং সেদ্ধ করে কফি খাওয়ার কথা জানা ছিল না। আশা করি ডিনারে আপনি ছুঁচোর রোস্ট এবং পাচার পালকের স্যালাড় খেয়েছেন?
