তফাতটা শুধু দেখলুম ভাষার। সেই একইরকম তিনটে আলো নিয়ে তিনটি ছায়ামূর্তি জলার ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নাকি স্বরে একজন বলল, এখানেই তো থাকার কথা। গেল কোথায়?
অন্যজন বলল,–ভালো করে খুঁজে দ্যাখ না।
তৃতীয়জন বলল,–কেউ মেরে দেয়নি তো?
ভাষাটা ইংরেজি। এমনিতে বেশির ভাগ মার্কিন একটু নাকি স্বরে কথা বলে। এরা তো ভূত। গলার স্বর বেজায় রকমের খোনা।
আমার সঙ্গী বব তেজি ছোকরা। ভূত বিশ্বাস করে না। সে বলল, একটু অপেক্ষা করো। ওদের ডেকে আনি। মনে হচ্ছে, গাড়িটা ঠেলতে হবে। উনষাট বছর বয়সের এই বুড়োগাড়ির পক্ষে এমনটা হবেই।
উঁচু হাইওয়ের ডান ঘেঁষে আমাদের গাড়িটা দাঁড় করানো। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত। কনকনে হাওয়া বইছে। ঠান্ডায় হিম হয়ে গেছি গাড়ি থেকে নেমেই। দূরে বহু দূরে আলোর ফুটকি দেখা যাচ্ছে। হাইওয়েতে কয়েক ফার্লং অন্তর ল্যাম্পপোস্ট যদিও রয়েছে, আমরা থেমেছি দুই ল্যাম্পপোস্টের মাঝামাঝি জায়গায়।
ইচ্ছে করে কি কেউ থামে? একেই বলে, যেখানে ভুতের ভয়, সেখানেই সন্ধে হয়। বব হাইওয়ের পরে ঢালু জমির দিকে পা বাড়াচ্ছে দেখে পিছু ডেকে বললুম, বব! বব! কথা শোনো!
বব থেমে বলল, কী হল?
–যাচ্ছ কোথায় তুমি? একটা কথা বলছি, শোনো।
নিচের দিকে আবছাভাবে একটা জলা দেখা যাচ্ছে। নক্ষত্রের প্রতিবিম্ব পড়েছে। ঝিকমিক করে কাঁপছে। সেখানে তিনটে আলো ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে। সেদিকে দেখিয়ে বব বলল, ওদের ডেকে আনি। তুমি কি একা ঠেলতে পারবে ভাবছ? তুমি তো বাতাসেই উড়ে যাচ্ছ দেখছি।
বব হাসছিল। বললুম,–বব! ওরা কারা, কী ভাবছ তুমি?
বব সেদিকে তাকিয়ে বলল,-এখানে একটা গরুর খোঁয়াড় আছে দেখেছি। ওরা খোঁয়াড়েরই লোক হবে। না হলে খামার বাড়ির চাষাভুষো।
দুপা এগিয়ে চাপা গলায় বললুম,–ওরা কী বলাবলি করছিল আমার কানে এসেছে বব। শ্যামখুডোর কুটির
এবার বব একটু চমকাল বুঝি। সেও গলা চেপে বলল, আমাদের ওপর ওরা হামলা করবে বলছিল নাকি? দ্যাখো, হাইওয়েতে এমন হামলা প্রায়ই হয়। তবে আমাদের কাছে দামি কিছু তো নেই। তাছাড়া আমার কাছে একটা অটোমেটিক রিভলভার আছে। ভেবো না।
বললুম, না না! আমার ধারণা, ওরা হয়তো মানুষ নয় বব!
বব অবাক হয়ে বলল,–মানুষ নয় মানে? তবে ওরা কী?
–দ্যাখো বব, তাহলে তোমায় অনেক গল্প বলতে হয়। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ব্যস্তভাবে বললুম। বরং হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে থেকেই আমরা কোনও গাড়ি থামিয়ে সাহায্য চাইব।
বব রাস্তার দুদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখে নিয়ে বলল, আশ্চর্য তো! এখন কোনও দিক থেকেই গাড়ি আসছে না! এটা এক আন্ত রাজ্য হাইওয়ে। চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ির বিরাম থাকে না। হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন?
–সেজন্যেই তো বলছি, গতিক ভালো নয়। এসো, আপাতত গাড়ির ভেতর ঢুকে সিগারেট টানি। ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না।
বলে আমি গাড়িতে ঢুকে বসলুম। বব কিন্তু এল না। বলল, এদিকে লোকগুলোও চলে যাচ্ছে যে! হাতেরি, তোমার কথার নিকুচি করেছে। বোসো, এক্ষুনি আসছি।
সে দৌড়ে ঢাল বেয়ে নেমে গেল। নিচে জলার ধারে আলো তিনটে ওদিকে উঁচুতে উঠে এগিয়ে যাচ্ছে কালো টিলার মতো উঁচু জায়গার দিকে। একটু পরে কিন্তু তিনটে আলোই মিলিয়ে গেল। তখন বব ফিরে এসে বলল,-ব্যাটাচ্ছেলেদের অত করে ডাকলুম। শুনতেই পেল না। দ্যাখো দিকি, কী মুশকিলে পড়া গেল! ওহে, একবার বেরিয়ে একটু ঠেলে দাও না, দেখি কী হয়। এসো এসো।
অগত্যা বেরোতে হল। বব একপাশে দাঁড়িয়ে ঠেলতে-ঠেলতে স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করল, অন্যদিকে আমি কাঁধ লাগালাম। কিন্তু গাড়ি কান্নার মতো শব্দ করতে থাকল শুধু। স্টার্ট নিল না। এই সেকেলে ১৯২১ সালের মডেল ভিনটেজ গাড়িটা তবু মায়াবশে বব ছাড়তে নারাজ।
হতাশ হয়ে বব অন্ধকারে সেই কালো টিলাটার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই সময় দেখলুম, এবার তিনটে নয়, মোটে একটা আলো নেমে আসছে জলার দিকে। আলোটা জলাঅব্দি এসে একবার থামল। তারপর আমাদের দিকে উঠতে থাকল। অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। কিন্তু বব নেচে উঠল প্রায়। সে জোর গলায় ডেকে বলল, ওহে লোকটা, আরও একটু পা চালিয়ে এসো দিকি! বড় বিপদে পড়েছি আমরা।
আলোটা ঢালু জায়গায় থেমে গেল। তারপর খনখনে গলায় জিগ্যেস করল, কে তোমরা? হয়েছেটা কী?
বব বলল,–গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছে না; ঠেলে দিলে বোধহয় নেবে।
–আমার সময় নেই। কর্তার কুকুরের লেজ হারিয়ে গেছে। খুঁজে বেড়াছি।
–কী হারিয়েছে বললে?
লেজ।–বলে আলোওয়ালা ছায়ামূর্তিটা গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পেরুতে থাকল।
বব হাসতে-হাসতে বলল,–তুমি তো ভারি রসিক লোক দেখছি!
আলোওয়ালা বলল,-রসিকতা কী বলছ? প্রাণ নিয়ে টানাটানি! কর্তার যা মেজাজ। জিমের লেজ খুঁজে না আনলে চাকরি চলে যাবে।
আলোওয়ালা রাস্তার ওধারে গিয়ে মাঠে নামল। বব বলল, উঁহু উঁহু। এভাবে রাত কাটানোর মানে হয় না। তুমি অপেক্ষা করো, আমি ওর কর্তার কাছে গিয়ে সাহায্য চাই।
আমি তো ভুক্তভোগী যাকে বলে। বাংলার পাড়াগাঁয়ে একবার ঠিক এমন আলোওয়ালাদের পাল্লায় পড়ে যা ভূগেছিলাম কহতব্য নয়। এটা তো বিদেশবিভূঁই। একা এখানে থাকি, আর যে আলোওয়ালাটা সদ্য ওধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাকে বাগে পেয়ে ঘাড় মটকাবে আরকী! তাই বললুম, চলো বব। তোমার সঙ্গে আমিও যাই!
