কিন্তু আমার এ ঠিকানা তো ওখানে কাউকে জানিয়ে আসিনি! উনি টের পেলেন কেমন করে?
মনের কথা চেপে ভদ্রতা করে বললুম, আরে আসুন বংশীধরবাবু! বসুন।
বংশীধরবাবু বললেন,–কই একটু পড়ুন না শুনি।
পড়ছি, পড়ছি, সবে তো দুলাইন লিখেছি। কিন্তু আশ্চর্য আপনি এই বৃষ্টির মধ্যে–বলতে-বলতে থেমে গেলুম। বংশীধরবাবু হঠাৎ আঁতকে উঠে পিছিয়ে গিয়ে বললেন, ওরে বাবা! এ ব্যাটা আবার কে? বলেই আবছায়া হয়ে গেলেন। তারপর বেমালুম অদৃশ্য!
তারপর দেখি ঢ্যাঙা রোগা এক ফো ভদ্রলোক ঘরের কোণা থেকে এগিয়ে আসছেন। এঁকে দেখেই বুঝি বংশীধরবাবু ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলেন?
গুঁফো ভদ্রলোক চোখ কটমট করে বললেন,–কে হে ছোকরা? কী লিখলে পড়ে শোনাও তো।
খুব রাগ হল এবার। নিশ্চয় দরজা বন্ধ করতে ভুলেছি! দরজার দিকটা ছায়ার মধ্যে বলে বোঝা যাচ্ছে না। বললুম, আপনি তো মশাই বলা কওয়া নেই ঘরের মধ্যে হুট করে ঢুকে পড়লেন যে?
গুঁফো ভদ্রলোক হি-হি করে হাসলেন, ইস! বিষ নেই কুলোপনা চক্কর! ভারি দুলাইন ছাইপাঁশ লিখেই ধরাকে সরা জ্ঞান করা হচ্ছে। জানো আমি কে? আমি বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক হলধর শর্মা।
শুনেই বড় লজ্জায় পড়ে গেলুম। হেঁট হয়ে পা ছোঁওয়ার চেষ্টা করে বললুম, ক্ষমা করবেন। আপনার কত বই আমি ছেলেবেলায় পড়েছি। তা আপনি বুঝি এ বাড়িতেই থাকেন?
–এ বাড়িতে কী বলছ হে? তার আগে পড়ো কী লিখলে শুনি।
হলধর শর্মা দুপা এগিয়ে এলেন। অগত্যা পড়তেই হল। লাইনদুটো শোনার পর শর্মা মশাই বললেন, হুঁ, শুরুটা ভালোই। তবে শিকারিকে একটা ঘোড়া দাও। বন্দুকের বদলে দাও তীরধনুক। জমবে ভালো।
–গল্পটা যে একালের শর্মা মশাই।
–গল্পের আবার কাল? যা বললুম লেখো। এই আমি বসলুম। পুরো লিখে ফেল। শুনে তবে যাব।
বেগতিক দেখে বললুম,–বাইরের লোকের সামনে আমার লেখা আসে না শর্মা মশাই।
শর্মা চটে বললেন, বাইরের লোক মানে? আমি তো এ ঘরেই থাকি বললুম না?
–এঘরে আপনি থাকেন মানে? অবাক হয়ে বললুম। এঘর তো খালি পড়েছিল। আমি বাড়িওলার কাছে ভাড়া নিয়ে আজ বিকেলে এঘরে এসেছি।
–ট্রেসপাস করেছ বাপু! পরের ঘরে এসে থাকা কি ভালো? একসময় এই ঘরেই আমি থাকতুম। তবে নেহাত এসেই গেছ যখন আপত্তি করব না। বিশেষ করে তুমি নতুন লেখক। তোমায় উপদেশ দেওয়া এবং সাহায্য করাই আমার কর্তব্য। কই লিখতে শুরু করো। আটকালে বলবে। আমি বলে দেব।
কাঁচুমাচু মুখে বললুম,–সেটা কি ঠিক হবে?
হলধর শর্মা খাপ্পা হয়ে বললেন, আলবাতঠিক হবে। নাও–আমি ডিকটেশান দিচ্ছি, লিখে যাও।
প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিকের কথা অমান্য করি কোন মুখে? অগত্যা ডিকটেশান নিতে শুরু করলুম। গোড়ায় যে দুলাইন লিখেছিলুম, তা কেটে দিতেও হল ওঁর নির্দেশে। তারপর লিখতে লিখতে টের পেলুম, সত্যি, এই হল পাকা হাতের রচনা। কী জমাট এই গল্পটা! ছাপা হলে হইচই পড়ে যাবে এবার।
লেখা শেষ হওয়ার পর হলধর শর্মা বললেন, আর তোমায় কষ্ট দেব না। এবার আমার প্রাতঃভ্রমণের সময় হল। তুমি বিশ্রাম করো। আবার কাল রাতে যথাসময়ে দেখা হবে।
কাগজগুলো গোছাচ্ছিলুম। গোছান শেষ করে ঘুরে দেখি শৰ্মা মশাই নেই। বুঝলুম, তাহলে এই বাড়িতেই কোনও ফ্ল্যাটে থাকেন। আমার সঙ্গে রসিকতা করছিলেন। কিংবা হয়তো লেখার জন্য ঘরটাও ভাড়া নিয়েছিলেন।
কিন্তু তারপর বুকটা ধড়াস করে উঠল, যখন দরজার কাছে গেলুম। এ কী! দরজা তো ভেতর থেকেই বন্ধ রয়েছে। হ্যাঁ–আমিই বন্ধ করেছিলুম, মনে পড়েছে। তাহলে?
ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় শুয়ে পড়লুম। তখন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
ঘুম হওয়ার কথা নয়। একটু বেলা হলে বেরিয়ে দেখি ছাদের কোণায় দোতলার মধুবাবু ডন দিচ্ছেন। কাল বিকেলেই আলাপ হয়েছে। ডন শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, নমস্কার স্যার! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে?
বললাম,–মোটও না মধুবাবু! সারারাত…
মধুবাবু চাপা হেসে বললেন, শর্মামশাই জ্বালিয়েছেন বুঝি? আপনাকে খুলেই বলি স্যার, এঘরে কেউ একরাত্তিরের বেশি বাস করেন না। তাই অ্যাদ্দিন খালি পড়েছিল। আপনাকে কালই আভাস দেব ভাবছিলুম, রাগ করবেন বলে সাহস পাইনি।
ব্যাপারটা কী বলুন তো?
মধুবাবু অবাক হয়ে বললেন,–সে কী স্যার? নিজে লেখক হয়েও জানেন না? শিশুসাহিত্যিক হলধর শর্মা কবে গত হয়েছেন। সেকি আজকের কথা? বছর সাতেক তো হবেই। তখন আমি স্কুলের ছাত্র।
কী করে জানব? আমি গ্রাম থেকে কলকাতার এসেছি মাস কয়েক আগে। সাহিত্যিকদের মধ্যে কে জীবিত, কে মৃত, তা নিয়ে মাথা ঝামাইনি। গল্প লিখি আর কাগজে পাঠাই। কোনও-কোনও লেখা ছাপাও হয়।
চুপ করে আছি দেখে মধুবাবু বললেন, জ্বালাতন বলতে ওই এক ডিকটেশান নিতে হবে। তা নিজেও যখন লেখেন, তখন আর অসুবিধেটা কী? দেখবেন সয়ে যাবে ক্রমশ।
শর্মারহস্য তাহলে ফাঁস হল। কিন্তু বংশীধর অধিকারী? তার আবির্ভাব দরজা আঁটা ঘরে!
মেসে খোঁজ নিয়ে জানলাম যেদিন আমি মেস ছেড়ে আসি, সেদিনই সন্ধ্যায় হার্টফেল করে মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ষাট।
তবে সুখের কথা হল শর্মার ভয়ে বংশীধর আর আমায় জ্বালাতে যাননি। এদিকে শর্মা রোজ রাতে ডিকটেশান দিতে দিতে বলেন, শিগগির এবার তুমি ভালো গল্প লিখতে পারবে। এটাই শেষপর্যন্ত আমার পক্ষে আশার কথা।
শ্যামখুড়োর কুটির
সেই যারা বাংলা মুল্লুকের পাড়াগাঁয়ে রাতবিরেতের অন্ধকারে নিরিবিলি জায়গায় আলো জ্বেলে কীসব খুঁজে বেড়ায়, এই মার্কিন মুল্লুকেও এসেও তাদের দেখা পেয়ে যাব ভাবতেও পারিনি।
