তারপদর পাশে দীপক, সেলিম, ব্রতীন আর গোপালের মুণ্ডু দেখা গেল। মুখগুলো করুণ। দীপক বলল, আমরা ভূত নই, রঘুনাথ! পুটু, তুই একটু বুঝিয়ে বল না ওকে।
বললুম,–তোমরা যে ভূত নও, তার প্রমাণ?
পাঁচ দুগুণে দশখানা হাত জানালার ভেতর গলিয়ে দিল ওরা। তারাপদ বলল, ছুঁয়ে দ্যাখ পুঁটু! ভূতের হাত হলে ঠান্ডা হিম হবে।
আমি ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত বাড়িয়েছি, রঘুনাথ বলল,–ছোঁবেন না দাদাবাবু! বরং আমি আগে পরীক্ষা করে দেখি। যদি ভূত না হয়, রামরাম বলুক ওরা।
পাঁচটা মুখে করুণ সুরে উচ্চারিত হল, রাম রাম রাম রাম রাম রাম।
রঘুনাথ এ ঘরের দরজা খুলে দিল। পাঁচজনে হুমমুড় করে ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়ল। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ওদের দেখতে-দেখতে বললুম, ব্যাপারটা কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু!
তারাপদ বলল, আমরাও বুঝতে পারছি না পুঁটু! একটু আগে আমরা পাঁচজনে একটা টেম্পে ভাড়া করে চলে এলুম। এসে দেখি দরজা খোলা। কেউ কোথাও নেই। হ্যারিকেনটা জ্বেলে তাস আর ক্যারাম খেলতে খেলতে হঠাৎ শুনি হল্লা করে কারা তেড়ে আসছে। অমনি ভয় পেয়ে হ্যারিকেন নিভিয়ে আমরা পালিয়ে গেলুম। তারপর অতিকষ্টে গাছে চড়ে গা ঢাকা দিলুম।
দীপক বলল,–ভাগ্যিস গাছের ওপর টর্চের আলো ফেলেনি ওরা।
রঘুনাথ হো-হো করে হেসে ফেলল। বলল, বুঝেছি, বুঝেছি। আপনাদের ঢুকতে দেখে ভূত পাঁচটা পালিয়ে গিয়েছিল। মানুষ যেমন ভূত দেখে ভয় পায়, ভূতেরাও মানুষ দেখে ভয় পায়।
তারাপদ বলল,-পুঁটু, কী হয়েছিল বল তো? তুই কখন এসেছিস?
দীপক বলল,–চা খেতে-খেতে সব শুনছি। রঘুনাথ, শিগগির চা করো।
রঘুনাথ কেরোসিন কুকার ধরাল। তারপর বলল,–আজ রাত্তিরে আর বাড়ি ফিরে কাজ নেই দাদাবাবুরা। চা করে খিচুড়ির ব্যবস্থা করছি। কী বলেন?
আমরা সবাই একবাক্যে সায় দিলুম।…
শর্মার বকলমে
সত্যি বলতে কি বংশীধর অধিকারীর জ্বালায় আমাকে মীর্জাপুরের অত ভালো মেসটা ছাড়তে হয়েছিল। যেই কাগজ কলম নিয়ে একটা গল্প লিখব বলে বসেছি, ভদ্রলোক এসে একগাল হেসে বলতেন, কী লিখলেন একটু পড়ুন না শুনি! এখন লেখা হয়নি বললেও রেহাই ছিল না। খুব আগ্রহ দেখিয়ে বলতেন, কী লিখবেন ভাবছেন, তাই বলুন না শুনি।
দিনের পর দিন এরকম জ্বালাতন। মনে-মনে যাচ্ছেতাই বিরক্ত হলেও চেপে থাকতুম ভদ্রতার খাতিরে। বংশীধরবাবু কিন্তু অতি অমায়িক মানুষ। মাথায় টাক ছিল। গোলগাল মুখ। হাসিটা ছিল ভারি মিঠে! নাদুসনুদুস বেঁটে শরীর নিয়ে ধুপধুপ শব্দ করে গেণবাড়ির এঘর থেকে ওঘরে ঘুরে বেড়াতেন। সবার সুখ-দুঃখের খোঁজ খবর নিতেন। গায়ে পড়ে উপকার করতে চাইতেন।
কিন্তু আমার সহ্য হচ্ছিল না ওঁকে। তিনমাস লেগে যেত একটা ছোট গল্প লিখতে। আর আশ্চর্য ব্যাপার, কীভাবে যেন টের পেয়ে যেতেন, আমি লিখতে বসেছি। অমনি চলে আসতেন আমার কাছে। পাশে বসে মুণ্ডু বাড়িয়ে বলতেন, কই একটু পড়ন না শুনি… ।
বর্ষানাগাদ নকুড় মল্লিক লেনে তিনতলা বাড়ির ছাদে একটা চিলেকোঠা গোছের ঘর খুঁজে বের করলুম। বাড়ির মালিক এক কথাতেই ভাড়া দিতে রাজি হয়ে গেলেন। শুধু তাই নয়, বললেন, ভাড়া যা দেওয়ার দেবেন খুশিমতো। ও নিয়ে দরাদরি করব না। আপনি মশাই লেখক মানুষ! আমি আপনার লেখার ভক্ত।
কলকাতা শহরে কোনও বাড়িওলা এমন কথা বললে কোন লেখকের না মন আনন্দে থইথই নেচে ওঠে! তবু ভাড়ার ব্যাপারটা ঠিক করাই ভালো। অনেক বলেকয়ে পঞ্চাশ টাকা দিতে চাইলুম। বাড়িওলা ভদ্রলোক তাও নেবেন না। বলেন, বরং তিরিশ দেবেন। ওরে বাবা। আপনি একজন লেখক বলে কথা!
মেস থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে যখন ও বাড়িতে চলে যাচ্ছি, বংশীধর খুব বাধা দিয়েছিলেন। প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। একটু কষ্ট হয়েছিল বইকী, অতকাল একসঙ্গে বাস করেছি।
নকুড় মল্লিক লেনের বাড়িতে গিয়ে মহানন্দে গল্প লেখা শুরু করলুম। কেউ বাধা দেওয়ার নেই। নিরিবিলি তিনতলার ওপর ছোট ঘর। এতবড় ফাঁকা ছাদ। প্রাণভরে আকাশ দেখা যায়। আর আমায় পায় কে? আকাশ না দেখতে পেলে কি মাথায় কিছু বড়-বড় ভাব আসে?
প্রথম রাতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কাগজ কলম নিয়ে বসলুম। বসামাত্র প্লট এসে গেল। প্লটটা এই?
এক শিকারি বনের মধ্যে পথ হারিয়ে অবশেষে একটা পুরোনো ভাঙাচোরা দুর্গে পৌঁছলেন। খুঁজে খুঁজে একটা অক্ষত ঘরে ঢুকে রাত কাটানোর কথা ভাবছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন একটা অদ্ভুত চেহারার লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে– দরজা দিয়ে নয়, দেয়াল থেকে। তার মানে দেয়ালে টাঙানো একটা ছেঁড়া ছবি থেকে। শিকারির বন্দুকে আর গুলি নেই। এদিকে ছবির লোকটা তার গলা টিপতে আসছে।
শিকারিকে না বাঁচালে গল্প হবে না। কীভাবে বাঁচাব তখনও ভাবিনি। লেখাটাতে শুরু করা যাক।
সবে দুলাইন লিখেছি, আমার কাঁধের ওপর কার নিঃশ্বাস পড়ল। চমকে উঠে দেখি কী আশ্চর্য, কী অসম্ভব ব্যাপার, মীর্জাপুরের মেসের সেই বংশীধর অধিকারী পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। একগাল হেসে ঠিক তেমনি চাপাগলায় বলে উঠলেন, কী লিখলেন, পড়ুন না শুনি!
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। ঘরের দরজা কি বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলুম? নিশ্চয় মীজাপুর থেকে ভদ্রলোক এই বৃষ্টির মধ্যে নকুর মল্লিক লেনে হাজির হয়েছেন।
