তারাপদ বলল,–একটু জ্বলুক না। পুঁটু অন্ধকার পছন্দ করে না।
কথাটা বলে সে আমার দিকে ঘুরল। হঠাৎ দেখলুম, তারাপদ নয়। প্যান্ট শার্ট পরা একটা কঙ্কাল! চমকে উঠে অন্যদের দিকে তাকালুম। আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে গেল। বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। পাঁচটি পোশাকপরা কঙ্কাল ডাইনিং টেবিল ঘিরে চায়ে চুমুক দিচ্ছে।
অমনি বিকট চেঁচিয়ে উঠলুম, রঘুনাথ! রঘুনাথ!
কঙ্কালগুলো হিহিহিহি করে হাসতে লাগল। চেয়ার থেকে উঠে মরিয়া হয়ে হলঘরে, তারপর সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে চাচাতে থাকলুম, রঘুনাথ! রঘুনাথ!
বৃষ্টি সমানে ঝিরঝির করে ঝরছে। লনের ওধারে একটা গ্যারেজ ঘর আছে দেখেছি। সেখানে দীপকের দাদামশাইয়ের গাড়ি থাকত একসময়। সেখান থেকে রঘুনাথের সাড়া এল,–পালিয়ে আসুন দাদাবাবু! পালিয়ে আসুন!
দৌড়ে ঘাস ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে গ্যারেজঘরে পৌঁছলুম। আবছা রঘুনাথকে দেখা যাচ্ছিল। সে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, খুব বেঁচে গেছেন দাদাবাবু!
হাঁপাতে-হাঁপাতে বললুম,–পাঁচ-পাঁচটা ভূ-ভূ-ভূ…
চুপ! চুপ! রঘুনাথ বলল, এই বিপদের সময় ও কথাটা বলতে নাই।
একটু ধাতস্থ হওয়ার পর বললুম, কিন্তু এখানে আর কতক্ষণ থাকব? বৃষ্টি ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। চলো! বরং আশে-পাশের বাড়ির লোকজনের কাছে গিয়ে ব্যাপারটা বলি। ওদের তাড়ানো দরকার।
রঘুনাথ বলল, ঠিক বলেছেন। কথাটা এতক্ষণ কেন যে মাথায় আসেনি! তবে আপনাকে আর কষ্ট করে বেরুতে হবে না। আপনি এখানে চুপচাপ বসে থাকুন। পাড়ার সবাই আমাকে চেনে। আমি এক্ষুনি লোক ডেকে আনি।
মুখে বললুম বটে, তাই যাও, কিন্তু একা থাকতে ভয় করছিল। রঘুনাথ চলে যাওয়ার পর ভয়টা আরাও বেড়ে গেল। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি একটা কঙ্কাল চুপিচুপি এসে আমার ঘাড়টি মটকে দেবে। অবশেষে গুঁড়ি মেরে বসলুম, যাতে ওরা আমাকে এখানে দেখতে না পায়।
তারপর বসে আছি তো আছি। রঘুনাথের পাত্তা নেই। অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে। বৃষ্টিটা অবশ্য কমে গেছে। একসময় বাড়ির দিক থেকে কাদের চাপা গলায় কথাবার্তা শোনা গেল। উঁকি মেরে দেখি, হলঘরের ভেতরে হ্যারিকেন জ্বলছে। খোলা দরজা-জানালা দিয়ে ছায়ামূর্তির মতো যাদের দেখা যাচ্ছে, তারা সেই পঞ্চভূত ছাড়া আর কারা হবে? একটু পরে তারাপদর ডাকাডাকি শুনতে পেলুম,–রঘুনাথ! রঘুনাথ!
সর্বনাশ! পঞ্চভূত আবার আমার বন্ধুদের রূপ ধরে নতুন কোনও মতলব ভেঁজেছে। রঘুনাথটা একেবারে অপদার্থ। পঞ্চভূতের খবর পেলে জল কাদা ভেঙে লোকেরা মারমার করে তেড়ে আসবেই। সে বোধহয় ঠিকভাবে কথাটা বুঝিয়ে বলতে পারছে না। কিংবা লোকেরা তার কথা বিশ্বাস করছে না।
আবার চাপাগলায় কথাবার্তা, তারপর ক্যারামের গুটি চলার খটখট শব্দ শুনতে পেলুম। রোসো ব্যাটাচ্ছেলেরা রঘুনাথ এখনই এসে যাবে লোকজন নিয়ে। মেরে ভূত ভাগিয়ে দেবে।
আরও কিছুক্ষণ কেটে গেল। গ্যারেজঘর থেকে দেখতে পাচ্ছি, পঞ্চভূত ক্যারাম আর তাস খেলছে। রাগে গায়ে জ্বালা ধরে গেল। একবার দীপকের কথা শুনতে পেলুম। সে বলল,–এই ভিজে জামা-প্যান্ট নিশ্চয় পুঁটুর।
তারপরই একটা হল্লা শোনা গেল। বাগানবাড়ির গেট দিয়ে টর্চ জ্বেলে লাঠিসোটা নিয়ে একদল লোক ঢুকেছে। তাদের আগে মারমার বলে হাঁক ছেড়ে রঘুনাথ দৌড়ে আসছে। ভেতরে ঢুকেই চাচাতে লাগল, কই ভূত? মারমার। ঠ্যাং ভেঙে দে।
সাহস পেয়ে আমিও যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে। লন পেরিয়ে মারমুখী ভিড় হলঘরের দরজার সামনে যেতেই দড়াম করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। হ্যারিকেনের আলোও গেল নিভে। এতে মারমুখী লোকগুলো আরও রেগে গিয়ে দরজায় লাথি মারতে লাগল। লাথির চোঠে দরজা মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। লোকগুলোকই ভূত? মারমার! ভূতের ঠ্যাং ভেঙে দেয় বলে ঘরে ঢুকল। টর্চের আলোয় কাকেও দেখা গেল না।
একটা দল নিয়ে আমি আর রঘুনাথ কিচেনে ঢুকলুম। আর একটা দল বাড়ির চারপাশে খুঁজতে বেরুল। কিন্তু পঞ্চভূতের পাত্র পাওয়া গেল না। কিচেনের ডাইনিং টেবিলে ছটা কাপ দেখতে পেলুম। পাঁচটা কাপে চায়ের তলানি পড়ে আছে। একটা কাপ চায়ে ভর্তি। এই কাপটা আমার।
রঘুনাথ বলল,–মানুষের ভয়ে ভূতগুলো পালিয়ে গেছে দেখছি।
একজন তাগড়াই চেহারার লোক তার লাঠিটা রঘুনাথকে দিয়ে বলল,–এটা হাতের কাছে রেখে দিও রঘুদা। আমরা যাই। ফের যদি ঝামেলা করে, খবর দিও।
বাড়ির চারদিকে যারা খোঁজাখুঁজি করছিল, তারা হলঘরে ফিরে এসে বলল,–পালিয়ে গেছে। তাদের একজন দেশলাই জ্বেলে লণ্ঠনটা ধরাল। তারপর বলল,–চলি রঘুদা! তেমন কিছু হলে আবার খবর দিও।
পাড়ার লোকগুলো চলে যাওয়ার পর রঘুনাথ বলল, হ্যারিকেনটা নিয়ে কিচেনে চলুন দাদাবাবু! ভূতের এঁটো কাপগুলো ধুয়ে ফেলি। তারপর দুজনে চা খাওয়া যাবে। বড্ড ধকল গেছে।
কিচেনের ডাইনিং টেবিলে হ্যারিকেন রেখে বসে আছি। রঘুনাথ বেসিনে কাপগুলো, রগড়েরগড়ে ধুচ্ছে। এমন সময় জানালায় কে চাপাস্বরে ডাকল,–পুঁটু! পুঁটু!
চমকে উঠে বললুম, রঘুনাথ! লাঠি-লাঠি! আবার এসেছে ওরা।
রঘুনাথ বেসিনে কাপ রেখে লাঠি বাগিয়ে দাঁড়াল। জানালায় তারাপদর মুণ্ডু দেখা গেল। সে কাঁদকাঁদ স্বরে বলল, আমরা ভূত নই। দরজা খুলে দাও, টুকি।
বললুম, দরজা খুলো না রঘুনাথ। ঝামেলা করলে লাঠির গুঁতো মারো।
