তারাপদ আমার কথার ওপর বলল, আমি ভিজিনি।
অবাক হয়ে বললুম,–ভিজিসনি মানে? এখনও তো সমানে বৃষ্টি হচ্ছে।
তারাপদ সেকথার জবাব না দিয়ে বলল,–এক কাপ চা চাই। রঘুনাথ কোথায়?
–রঘুনাথ আমার জন্য চা করতে গেছে। ওকে বল গিয়ে।
তারাপদ কিচেনের দিকে চলে গেল। তারপরই হারিকেনটা দপদপ করতে করতে নিভে গেল।
আমি সিগারেট খাই না।
তাই দেশলাই নেই। ডাকলুম, রঘুনাথ! একটা দেশলাই। আলো নিভে গেছে।
রঘুনাথের কোনও সাড়া নেই। তারাপদও ফিরে আসছে না। ঘরের ভেতর গাঢ় অন্ধকার। মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে। সেই আলোয় মুহূর্তের জন্য দেখলুম, দরজা দিয়ে কেউ ঢুকল। বললুম,–কে?
–আমি গোপাল।
–হ্যারিকেনটা নিভে গেছে। দেশলাই জ্বাল।
গোপাল বলল,–দেশলাইটা ভিজে গেছে। জ্বলবে না। রঘুনাথ কই?
–কিচেনে চা করতে গেছে।
–আর কেউ আসেনি?
–তারাপদ এসেছে। কিচেনে গেল চায়ের কথা বলতে।
–আমারও চা খেতে ইচ্ছে করছে। রঘুনাথকে বলে আসি।
অন্ধকারে গোপালের ভিজে জুতোর মচমচ শব্দ শোনা গেল। সেই সময় বিদ্যুতের আলোয় দেখলুম আরেক মেম্বার ঢুকছে। বললুম,–কে?
সেলিমের সাড়া পেলুম,–পুঁটু নাকি? আর কেউ আসেনি?
–তারাপদ এসেছে। কিচেনে গেল চায়ের কথা বলতে।
–আমারও চা খাওয়া দরকার। বলে আসি।
অন্ধকারে ভিজে চটি-জুতোর শব্দ শুনে বুঝলুম, সেলিমও কিচেনে চলে গেল। রঘুনাথ এখনও কেন আসছে না বোঝা যায়। কেটলির জলে আরও দুকাপ জল ঢালতে হবে তাকে। কাজেই সময় লাগবে জল গরম হতে। একসঙ্গে ছকাপ জল ঢাললেই তো হয়। বারবার একজন করে আসবে আর চায়ের জল গরম হবে আরও সময় লাগবে। কথাটা কিচেনে গিয়ে বলার জন্য উঠব ভাবছি, দরজায় আর এক মেম্বারকে দেখা গেল। গলা শুনে বুঝলুম, ব্রতীন। সে ডাকল, রঘুনাথ। রঘুনাথ?
বললুম, ব্ৰতীন কী করে এলি রে? ভিজিসনি?
ব্রতীন বলল, পুঁটু নাকি? অন্ধকারে বসে আছিস দেখছি।
–লোডশেডিং। হ্যারিকেনটা নিভে গেল। দেশলাই দে।
–আর দেশলাই! ভিজে ঢোল হয়ে গেছে। হারে পুঁটু, আর কেউ আসেনি?
–তারাপদ, গোপাল আর সেলিম এসেছে। কিচেনে রঘুনাথকে চায়ের কথা বলতে গেছে।
ব্রতীন অন্ধকারে খ্যাখ্যা করে হেসে বলল,-তাহলে আমিও যাই। চা খেতে ইচ্ছে করছে।
জুতোর শব্দে বুঝলুম সে-ও চলে গেল। নাঃ, এরকম করলে আর চা খাওয়াই হবে না। উঠে দাঁড়ালুম কিচেনে যাওয়ার জন্য। সেই সময় কাছাকাছি দীপকের সাড়া পেলাম, কোথায় যাচ্ছিস পুঁটু?
চমকে উঠে বললুম, দীপক, তুই কখন এলি? তোকে তো ঢুকতে দেখলুম না!
দীপক আমার উল্টোদিকের চেয়ার থেকে খি-খি করে হেসে বলল,–দেখবি কী করে? অন্ধকার যে!
তারপরই ব্রতীনের সাড়া পেলুম, আমাকেও দেখতে পায়নি পুটু!
ওরা দুজনে হাসতে লাগল। বললুম,–হাসি পরে হবে। হ্যারিকেনটা জ্বালানো দরকার যে!
দীপক বলল, অন্ধকার ভালো লাগছে। তাই না ব্ৰতীন?
ব্রতীন সায় দিয়ে বলল, এ্যা। আর অন্ধকারেই আড্ডাটা জমবে ভালো। কিন্তু চা-টা না হলে আড্ডা তো জমবে না। দেখি, রঘুনাথ চায়ের ব্যবস্থা করছে নাকি।
দীপক বলল,–চ। আমিও যাই। পুঁটু, যাবি নাকি?
রাগ করে বললুম, নাহ। কখন রঘুনাথকে চায়ের কথা বলেছি। তার পাত্তা নেই। এদিকে তারাপদ, সেলিম আর গোপাল গেল তো গেলই। চায়ের নিকুচি করেছে।
ব্রতীন বলল,–আয় দীপক! পুটু মনে হচ্ছে রাগ করে চা খাবে না।
অন্ধকারে খসখস চটাং চটাৎ মসমস শব্দ হল। বুঝলুম ভেজা জুতোর শব্দ। সবাই ভিজে গেছে। ভিজতে বাধ্য। রাস্তায় এতক্ষণ এক কোমর জল না হয়ে যায় । কিন্তু তারাপদ যে বলল সে একটুও নাকি ভেজেনি? নিশ্চয় বাস বা গাড়ি পেয়েছিল।
কিন্তু আমি বসে আছি তো আছিই। রঘুনাথের পাত্ত নেই, ওদেরও নেই। ব্যাপারটা দেখা দরকার। হলঘরের কোনার দিকের দরজা দিয়ে কিচেনকাম-ডাইনিং রুমে যাওয়া যায়। অন্ধকারে ঠাহর করে সেই দরজার কাছে গেলুম। গিয়ে দেখি, কেরোসিন কুকার জ্বলছে। কেটলিও চাপানো আছে। সেই আলোয় আবছা দেখা গেল ডাইনিং টেবিলের পাঁচটা চেয়ারে আমার পাঁচ বন্ধু বসে আছে। একটা চেয়ার খালি। কিন্তু রঘুনাথকে দেখতে পেলুম না।
আমাকে দেখে তারাপদ ডাকল,–চলে আয় পুঁটু! বসে পড়! চা খাওয়াটা এখানেই জমবে।
বললুম, রঘুনাথ কোথায়?
তারাপদ হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হেসে বলল, ঘুনাথ পালিয়ে গেছে।
–সে কী পালাল কেন?
–আমাকে দেখে।
অবাক হয়ে খালি চেয়ারটাতে বসে বললুম,–তোকে দেখে পালানোর কী আছে?
তারাপদ জবাব দিতে যাচ্ছিল, দীপক বলল,–চেপে যা, চেপে যা! দ্যাখ, চায়ের জল ফুটছে নাকি।
তারাপদ উঠে গিয়ে চা করতে থাকল। বললুম, হ্যাঁ রে দীপু, চেপে যা বললি কেন?
দীপক মিটিমিটি হেসে বলল,–সেসব কথা পরে হবেখন। চা খাওয়া যাক। বৃষ্টিটা বেশ জমেছে।
ব্রতীন বলল,–শুধু চা? তেলেভাজা-টাজা হলে ভালো হতো।
গোপাল বলল,-পরের বার হবে। আপাতত চা খেয়ে চাঙ্গা হওয়া যাক।
আমি বললুম, একটা আলো চাই যে! এ ঘরে মোমবাতি নেই? বরং হ্যারিকেনটা নিয়ে আসা যাক।
সেলিম বলে উঠল,-না-না! এই শনি-সন্ধ্যাটা বিনি আলোতেই আড্ডা দেওয়া যাক।
ততক্ষণে তারাপদর চা তৈরি হয়ে গেছে। কাপগুলো সে প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিল। চুমুক দিয়ে তেতে লাগল। বললুম,–বিচ্ছিরি কড়া হয়ে গেছে। তারাপদ, তুই
চা করতে জানিসনে।
তারাপদ চেয়ারে বসে বলল, কড়া চা না হলে এখন চলে? দীপক বলল,-কুকারটা নিভিয়ে দে। খামোকা তেল খরচ করা কেন?
