.
এবার আর কোনও গণ্ডগোল হল না। আমাদের গাঁয়ের মোড়ে পৌঁছে দিয়ে রিকশওয়ালা ভাড়া মিটিয়ে নিল।
ছোটমামা জিগ্যেস করলেন, তুমি কোন গাছে থাকো হে?
রিকশওয়ালা বেজায় হেসে বলল, আমি কেন গাছে থাকতে যাব বাবুমশাই? আমার কি ঘরদোর নেই? নামটাই না হয় ভুতো। রাতবিরেতে রিকশ চালাই বলেই তেনাদের সঙ্গে চেনাজানা হয়েছে।
ছোটমামার সন্দিগ্ধস্বরে বললেন,–তুমি মানুষ?
আজ্ঞে ষোলো আনা মানুষ।–বলে সে শেষরাতের জ্যোৎস্নায় রিকশ চালিয়ে কালো হতে-হতে দূরে মিলিয়ে গেল।
শনি-সন্ধ্যার পঞ্চভূত
আমরা উত্তর কলকাতার কজন বন্ধু মিলে একটা ক্লাব করেছিলুম। উদ্দেশ্য ছিল প্রতি শনিবার সন্ধ্যাবেলায় চুটিয়ে আড্ডা দেব। তাস, দাবা আর ক্যারাম খেলব। সেই সঙ্গে ফিস্টিরও আয়োজন থাকবে।
প্রথমে ঠিক হয়েছিল ক্লাবের নাম হবে স্যাটারডে ইভনিং ক্লাব। কিন্তু তারাপদর মধ্যে বাঙালি-বাঙালি ভাব বড় বেশি। তার মতে, স্বাধীন দেশে ইংরেজিপ্রীতি দাস মনোভাবের প্রতীক। সেই কবে ইংরেজ এ দেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে। এখনও ইংরেজি আঁকড়ে থাকার মানে হয় না। ক্লাবের নাম হোক শনি-সন্ধ্যা ক্লাব।
শেষপর্যন্ত তাইই হল। এ-ও ঠিক করা হল, আমরা ছজন বন্ধু বাদে আর কাউকেই শনি-সন্ধ্যা ক্লাবের মেম্বার করব না। তারাপদ, দীপক, গোপাল, সেলিম, ব্রতীন এবং আমি এই ছজন মেম্বার। কিন্তু শুধু ক্লাব করলেই হল না, একটা ঘর চাই। দীপক সে-সমস্যার সমাধান করে দিল। গঙ্গার ধারে তার দাদামশাইয়ের একটা পুরোনো বাগানবাড়ি খালি পড়ে আছে। সেই বাড়ির হলঘরটাই আমাদের ক্লাবের ডেরা হবে।
গঙ্গার ধারে চারদিকে পাঁচিল-ঘেরা প্রায় দু-একর জায়গা। মধ্যিখানে একতলা বাড়ি। কেয়ারটেকার রঘুনাথ একটা ঘরে থাকে। পুরোনো আমলের ফলবাগান জঙ্গ ল হয়ে গেছে। কিছু উঁচু গাছও পরিবেশকে জঙ্গুলে করে ফেলেছে। এক রবিবার সামনের লনটা পরিষ্কার করা হল। পরের শনিবার ফিস্টি হল ধূমধাম করে। রঘুনাথ খুব খুশি। বাড়িটা এতদিন হানাবাড়ি হয়েছিল। রাতবিরেতে ভূতের অত্যাচারে নাকি তিষ্ঠোতে পারছিল না। এবার ভূতেরা ভয় পেয়ে জব্দ হয়ে যাবে। মানুষ ভূতকে যেমন ভয় পায়, ভূতও নাকি মানুষকে দেখে ভয় পায়।
রঘুনাথের কথা শুনে আমরা হাসাহাসি করেছিলাম। এমন নিরিবিলি জায়গায় একা থাকলে মাথায় খুব কল্পনাশক্তি গজায়। বিশেষ করে রাতবিরেতে ছুঁচো-হঁদুর আরশোলার চলাফেরা এবং গাছপালা-ঝোঁপঝাড়ে বাতাসের শব্দ ভুতুড়ে মনে হতেই পারে। তবে রঘুনাথকে সাহসী বলতেই হবে। তার তাগড়াই গড়ন। গায়ে জোরও আছে মনে হয়। প্রতি শনিবার সন্ধ্যার আড্ডায় সে কিছুক্ষণ অন্তর চা জোগান দেয়। বাইরে থেকে পান-সিগারেট, আবার কখনও তেলেভাজা, মুড়ি, জিলিপি, কচুরি, সিঙাড়া যখন যা ফরমায়েশ করা হয়, সে এনে দেয়। দীপক আর সেলিম দাবা খেলতে বসে। বাকি চারজন ক্যারাম খেলি বা তাস পিটি। হইহল্লা করি। তারপর রাত দশটার যে যার বাড়ি ফিরি।
আমরা ক্লাবের মেম্বাররা একটা শর্ত করে নিয়েছিলুম। ঝড়-বৃষ্টি হোক, রাস্তায় জল জমুক, কিংবা এলাকায় হাঙ্গামা হোক কিংবা কারফিউ জারি হোক, প্রত্যেককে শনিবার সন্ধ্যা ছটা নাগাদ ক্লাবে পৌঁছতেই হবে। না এলে একশো টাকা ফাইন। ফাইন দেওয়ার ভয়ে প্রত্যেকে শনিসন্ধ্যায় আচ্ছায় ঠিকই এসে জুটত।
ক্লাব শুরু হয়েছিল এপ্রিলে। তারপর দেখতে-দেখতে জুন মাস এসে গেল। বর্ষা শুরু হল। এক পশলা বৃষ্টিতেই রাস্তায় এক হাঁটু জল জমে যায়। একদিন বিকেলে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি বিপদ বাধাল। রাস্তায় জল ঠেলে আমার যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ায় ছাতি সামলানো কঠিন। একটা রিকশাও পাওয়া গেল না। কিন্তু একশো টাকা জরিমানার ভয়ে মরিয়া হয়ে বেরিয়ে পড়লুম। বুদ্ধি করে কিটব্যাগে একপ্রস্থ প্যান্ট শার্ট-তোয়ালে নিলুম। তারপর বাগানবাড়িতে যখন পৌঁছলুম, তখন ভিজে একসা হয়ে গেছি। বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলুম বিকেল চারটেয়। পৌঁছতে দুঘণ্টা লেগে গেছে। রঘুনাথ একটা লণ্ঠন জ্বেলে দাঁড়িয়েছিল। বলল, বিকেল থেকে লোডশেডিং দাদাবাবু! মনে হচ্ছে কেবিল ফল্টা বেশি বৃষ্টি হলেই এইরকম হয়। বরাবর দেখে আসছি।
বললুম, আর কেউ আসেনি?
রঘুনাথ বলল, না। তবে এসে যাবেন একে-একে। আপনি বসুন। খুব ভিজে গেছেন দেখছি। এক কাজ করুন। আমি একটা শুকনো কাপড় এনে দিচ্ছি
বললুম, দরকার হবে না রঘুনাথ। শুকনো কাপড় সঙ্গে নিয়েই বেরিয়েছি। তুমি বরং এক কাপ চা খাওয়াতে পারো নাকি দেখো।
রঘুনাথ হলঘরে একটা টেবিলে লণ্ঠন রেখে চলে গেল। লণ্ঠনটা এ বাড়ির মতো পুরনো। কাঁচে কালি পড়েছে। আলোটা তেমন খেলছে না। মাঝেমাঝে দপদপ করছে। নিভে গেলেই কেলেঙ্কারি। বাইরে ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি সমানে চলেছে। তোয়ালেতে গা মুছে শুকনো প্যান্ট শার্ট পরে ভিজে কাপড়গুলো নিঙড়ে একট জানালার রডে কোনওরকমে ঝুলিলে রাখলুম। তারপর চেয়ারে বসে পা দুটো টেবিলে তুলে দিলুম। জুতো ভিজে ঠান্ডা হয়ে গেছে।
হ্যারিকেনের কাঁচে কালি বেড়ে যাচ্ছে দেখে দম কমিয়ে দিলুম। সেই সময় কেউ ঘরে ঢুকল। আবছা আলোয় দেখলুম, তারাপদ। বললুম, কী রে? আসতে পারলি তাহলে?
তারাপদ বলল, আসতেই হবে।
–ভিজে গেছিস তো? বুদ্ধি করে আমার মতো—
