ছোটমামা রেগেই ছিলেন। বললেন,–তা জেনে তোমার কাজ কী? কে তুমি? গাছে কী করছ?
–অ্যাঁ! বলে কী। গাছে কী করছি! হি হি হি হি! ন্যাকা!
–খবরদার! বাজে কথা বলবে না বলে দিচ্ছি।
–এটা বাজে কথা হল? জানোনা গাছে কী করছি?
ছোটমামা খাপ্পা হয়ে বললেন, না। জানি না। আমরা মানুষ। আমরা তোমার মতো রাত-বিরেতে গাছে কাটাই না।
–হি হি হি! প্রথম-প্রথম এই ভুলটা হয়।
–কী ভুল হয়?
–মানুষ-মানুষ ভুল।
–কী অদ্ভুত।
–অদ্ভুত তো বটেই। অদটুকু বাদ যেতে কয়েকটা দিন দেরি, এই যা। তা তোমরা কি ডেরা খুঁজে বেড়াচ্ছ? বোকা আর কাকে বলে? ভুতোর রিকশতে চেপে–হি হি হি! ভুতোটা এক নম্বর ধড়িবাজ। সাবধান করে দিচ্ছি কিন্তু!
ছোটমামা রিকশ থেকে নেমে ঘুষি পাকিয়ে দাঁড়ালেন। –কে হে তুমি! গাছ থেকে নেমে এসো তো দেখি।
আমিও নামতে দেরি করলাম না। ছোটমামার মারামারি করার অভ্যাস আছে। কিন্তু রাতবিরেতে গাছের লোকটার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেন কি না আমার সন্দেহ। রিকশওয়ালাও আসছে না। মারামারি বাধলে থামাবে কে, এটাই আমার ভাবনা।
ছোটমামা ঘুষি বাগিয়ে এবার হুঙ্কার দিলেন, কাম অন! কাম অন!
গাছের লোকটা বিদঘুঁটে হাসল-হি হি হি হি! ইংরেজির কী ছিরি! কাম অন কী হে ছোকরা? গেট ডাউন! কিন্তু গেট ডাউন করি কী করে? একটা ঠ্যাং-ই যে নেই। থাকলে পরে এতক্ষণ নেমে কানটি ধরে স্ট্যান্ড আপ অন দা বেঞ্চ করিয়ে দিতাম।
পাশের একটা গাছ থেকে কেউ বলল, কী হে পণ্ডিতমশাই? ছাত্র জোটাতে পারলেন নাকি?
–নাহ। গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করা যায় না।
ছোটমামা আর সহ্য করতে পারলেন না। রাস্তার ধারে পাথরকুচির স্তূপ থেকে পাথর কুড়িয়ে ছুঁড়তে শুরু করলেন। আমাকে বললেন,–হাত লাগা পুটু। আমাকে গাধা বলছে! আমাকে ইংরেজি শেখাচ্ছে পাঠশালার পণ্ডিত!
ওদিকে পণ্ডিতমশাইয়ের চেঁচামেচিতে চারদিকে সাড়া পড়ে গেছে। হইহই-রইরই করতে-করতে কালো কালো কারা সব গাছ থেকে ঝুপঝাঁপ করে নেমে দৌড়ে আসছিল। আমি ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেললাম, ছোটমামা! এবার ছোটমামার চোখে পড়ল ব্যাপারটা। তারপর যা ভেবেছিলাম এবং বরাবর যা ঘটে আসছে তাই হল। ছোটমামা চলে আয় পুঁটু–বলে রিকশওয়ালা যেদিকে গিয়েছিল, সেই দিকে দৌড়লেন। আমিও দৌড়লাম।
কিন্তু ভাগ্যিস ছোটমামা হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলেন, তাই সঙ্গ পাওয়া গেল। জ্যোত্সায় একটা ভাঙাচোরা দালানবাড়ি দেখা যাচ্ছিল। বাড়ির দরজায় ছোটমামা ধাক্কা দিতে লাগলেন। একটু পরে ভেতর থেকে সাড়া এল, কে?
ছোটমামা ব্যস্তভাবে বললেন,–আমরা খুব বিপদে পড়েছি। দয়া করে দরজা খুলুন।
–কী বিপদ?
–কারা আমাদের তাড়া করেছে।
–তারা কারা?
–গাছে-গাছে যারা থাকে।
–গাছে থাকে ভূত বনে থাকে বাঘ।
জলে থাকে মাছ মনে থাকে রাগ।
–কী বিপদ! আপনি পদ্য বলছেন নাকি?
–ঠিক ধরেছ। কেমন হয়েছে পদ্যটা বলো?
–খুব ভালো। দয়া করে এবার দরজা খুলুন। ওরা আসছে।
ঘোড়ার যদি পাড়ে ডিম
জলে যদি জ্বলে পিদিম
বলো তবে অতঃ কিম?
ছোটমামার পদ্য লেখার বাতিক ছিল। বলে দিলেন, জাম গাছে ফলবে শিম। খাসা! খাসা! স্বাগত! সুস্বাগত!
দরজা খুলে গেল। ছোটমামা বললেন, আলো নেই কেন? আলো জ্বালুন।
যতবড় কবি দুই হোস না।
যদি না বাসিস ভালো জোসনা
থেকে যাবে কত আফসোস না!
তাই বলি চুপ করে বোস না।
ভদ্রলোক বাইরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। জানালা গলিয়ে জ্যোস্না এসে ঘরে ঢুকেছিল। আবছা দেখা যাচ্ছিল–ওঁকে। ঢ্যাঙা, বড়-বড় চুল, পরনে পাঞ্জাবি পাজামা। হাতে একটা বই বা মোটা খাতা। পাতা ওল্টাতে শুরু করলেন। তারপর বললেন,–এই পদ্যটা আরও ভালো।
–একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল
সারস পাখি লম্বা ঠোঁটে হাড় তুলিয়া দিল
পুরস্কার চাইলে পরে বাঘ রাগিয়া কহে,
মুন্ডুখানা ফেরত পেলি তা-ই যথেষ্ট নহে?
পাশের ঘর থেকে কেউ বিটকেল গলায় ডাকল,-ঘোতনা। অ্যাই ঘোতনা! কাকে পদ্য শোনাচ্ছিস?
–মানুষকে।
–কয় জন মানুষ?
–দেড়জন।
–ধুস! পোষাবে না।
ছোটমামা বললেন,–কে উনি?
কবি ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, আমার দাদার ওই এক স্বভাব। খালি খাই-খাই।
–খাই-খাই মানে?
–দাদার খুব খিদে আর কী! যাক গে। এই পদ্যটা পড়ি…।
সেই সময় বাইরে ডাকাডাকি শোনা গেল,–ছোটবাবু! ছোটবাবু! ছোটবাবু! কবি খাপ্পা হয়ে দরজা খুলে বললেন, কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছিস কেন রে ভূতো?
–আমার প্যাসেঞ্জার হারিয়ে গেছে। খুঁজে বেড়াচ্ছি।
–কয় জন?
–আজ্ঞে দেড়জন।
ছোটমামা আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিলেন।–চলে আয় পুঁটু!
রিকশওয়ালা আমাদের দেখেই বলে উঠল, সর্বনাশ! কোথায় ঢুকেছিলেন আপনারা! চলে আসুন! চলে আসুন! এ বাড়ির বড়বাবুর বেজায় খিদে।
আমরা তিনজনে দৌড়চ্ছি। পেছনে কবির করুণ আর্তনাদ কানে আসছে, অত ভালো পদ্যখানা শুনে গেল না! আমার যে আবার মরতে ইচ্ছে করছে গো! ও হো হো হো…
ছোটমামা রাস্তার কাছে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ওহে রিকশওয়ালা! ওরা সব নেই তো?
রিকশওয়ালা হাসল। নাহ! ঘুমিয়ে পড়েছে। ভোস-ভোস করে ঘুমোচ্ছে। শুনতে পাচ্ছেন না?
ছোটমামা কান ধরে শুনে বললে, হুঁ!
আমি তেমন কোনও শব্দ পেলুম না। তবে বাতাসে গাছপালা খুব নড়ছে। নানারকম শব্দও হচ্ছে বটে। কিন্তু ভেস-ভোঁস নয়। শোঁ শোঁ শন শন সর সর খড় খড়। কে জানে বাবা কী।…
