রিকশওয়ালা হেসে অস্থির। রুখেই তো আছি বাবুমশাই! যাওয়া হবে কোথায়?
আমারও হাসি পাচ্ছিল। ছোটমামার সবকিছুই অদ্ভুত। তো আমরা ঝাপুইহাটি যাব শুনে রিকশওয়ালা খুশি হল। বলল,–চলুন! আমি কাছাকাছি থাকি। ওদিককার প্যাসেঞ্জারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম! খালি-খালি রিকশা নিয়ে বাড়ি ফেরা পোয় না।
রিকশতে উঠে বসলে ঘুমটা আমাকে বাগে পেয়েছিল। কিন্তু ছোটমামার বারবার ধমক এবং পড়ে গিয়ে হাড়গোড় ভেঙে যাওয়ার হুমকি ক্রমশ ঘুমটাকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল। কিছুদূর চলার পর রিকশওয়ালা থামাল। ছোটমামা বললেন, কী হল? চেন খুলে গেল নাকি?
রিকশওয়ালা সিট থেকে নেমে বলল, আজ্ঞে না। চক্কোত্তিমশাই হজমিগুলি আনতে দিয়েছিলেন। দিয়ে আসি।
ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, এখানে কোথায় তোমার চক্কোত্তিমশাই?
রিকশওয়ালা কান করল না। রাস্তার ধারে ঝাকড়া একটা গাছের তলায় গিয়ে ডাকল,–চক্কোত্তিমশাই! ঘুমোচ্ছন নাকি?
গাছের ভেতর থেকে খ্যানখেনে গলায় কেউ বলল,–ঘুমোব কী রে বাবা! পেট আইঢাই। এত দেরি করলি কেনরে?
–প্যাসেঞ্জার পেলে তো আসব। এই নিন হজমিগুলি।
–এনেছিস? কই দে-দে। শিগগিরি দে।
রিকশওয়ালা তাকে হজমিগুলি দিয়ে এসে সিটে উঠল। প্যাডেলে চাপ দিল। রিকশর চাকা গড়াল। ছোটমামা বললে, ব্যাপার কী হে রিকশওয়ালা? তোমার চক্কোত্তিমশাই কি গাছে থাকেন নাকি?
–আজ্ঞে ।
–অ্যাঁ? গাছ থাকেন কেন?
–এটাই তো তেনার ডেরা।
–তার মানে?
–মানে নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কি বাবুমশাই? কঁপুইহাটি যাবেন। পৌঁছে দেব। ব্যস।
ছোটমামা রেগে গেলেন।
–অদ্ভুত তো তোমার কথাবার্তা! রাতবিরেতে গাছের ওপর–
রিকশওয়ালা ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, চুপ! চুপ! চক্কোত্তিমশাইয়ের কানে গেলেই কেলেঙ্কারি। আমার কাছ থেকে ততক্ষণে ঘুমটা কেটে পড়েছে। বারবার দেখে আসছি, ছোটমামার সঙ্গে কোথাও রাতবিরেতে বেরোলেই গোলমেলে সব ঘটনা ঘটে। বুঝতে পারি না, রাত এলেই কেন পৃথিবীটা অন্যরকম হয়ে যায়? না কি ছোটমামার ভুলেই রাতটা গোলমেলে হয়ে যায়? কিন্তু তারপর তো ছোটমামা চলে আয় পুঁটু বলে শেষপর্যন্ত উধাও হয়ে যান। ধাক্কাটা সামলাতে হয় আমাকেই। এবার কতদূর গড়াবে কে জানে! বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল।
একটু পরে আবার রিকশ দাঁড়াল এবং রিকশওয়ালা তড়াক করে নেমে গিয়ে ডাক দিল, ঠাকরুনদিদি! অ ঠাকরুনদিদি!
একটা শুকনো গাছের ডাল থেকে নেমে সাদা কাপড় পরা কেউ এগিয়ে এগিয়ে এল। ভুতু এলি? কখন থেকে পথের দিকে তাকিয়ে চোখে ব্যথা ধরে গেল। দোক্তা এনেছিস তো?
–না আনলে ডাকছি কেন? এই নিন।
দোতা নিয়ে ঠাকরুনদিদি ন্যাড়া গাছটার দিকে চলে গেল। ছোটমামা গুম হয়ে বসে ছিলেন। বললেন,–কোনও মানে হয়?
রিকশওয়ালা আবার চুপচাপ রিকশ চালাতে শুরু করল। কিছুদুর গেছি, হঠাৎ কোত্থেকে কেউ হেঁড়ে গলায় ডাকল, ভুতু! অ ভুতু! অ্যাই ভুতো!
ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন,–থেমো না, যে-ই ডাকুক।
একটা কালো বেঁটে লোক ধমক দিল,–অ্যাই ব্যাটাচ্ছেলে! কথা কানে যায় না?
রিকশওয়ালা বলল,-রোজ-রোজ বাকিতে জিনিস দেবে নাকি?
–দেবে না মানে? ওর বাপ দেবে। এখনও তেষট্টি টাকা সাতষট্টি পয়সা জমা আছে খাতায়!
–সে আপনি মামলা করে আদায় করুন গে!
লোকটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।–বাজে কথা বলিসনে। আসলে তুই যাসনি দত্তর দোকানে।
কী ঝামেলা করছেন বাবু? গাড়িতে প্যাসেঞ্জার আছে দেখছেন না?
লোকটা প্রায় কেঁদে ফেলল। এখন আমি ঘুমোব কি করে? একগুলি আফিং আমাকে এত রাত্তিরে কে দেবে?
রিকশওয়ালা পরামর্শ দিল, শ্মশানতলায় চলে যান। দারোগাবাবুর কাছে একগুলি পেতেও পারেন।
-–ওরে বাবা! মৌতাত ভাঙলে লকআপে ঢোকাবে।
–তা হলে বরঞ্চ পাঁচুর কাছে যান।
–সে ব্যাটা তো চোর।
–চোর বলেই বলছি। দারোগাবাবুর কৌটো থেকে দু-একটা গুলি সেই হাতাতে পারবে।
লোকটা কিন্তু কিন্তু করে বলল,–তা পাঁচুকে পাচ্ছি কোথায়? ও তো ফেরারি আসামী।
রিকশওয়ালা চাপাস্বরে বলল,–সন্ধেবেলা পাঁচুকে একপলক দেখেছি। মোড়লমশাইয়ের তালগাছের কাছে দাঁড়িয়েছিল। মোড়লমশাই গঞ্জের মেলায় গেছেন। কাজেই পাঁচু নিশ্চয় তেনার ডেরায় ঘুমিয়ে নিচ্ছে।
বেঁটে কালো ছায়ামূর্তিটি তখনই উধাও হয়ে গেল। রিকশওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলল, রোজ রাত্তিরে আসার এই এক জ্বালা বাবুমশাই! রাজ্যের লোকের হাজার ফরমাশ।
ছোটমামা গুম হয়ে বসে আছেন। আমি ভাবছি, হঠাৎ আমাকে ফেলে পালিয়ে না যান। বড্ড বেশি গোলমেলে ঘটনা ঘটছে। কিছু দূর যাওয়ার পর রাস্তা বাঁক নিল। এবার দুধারে ঘন জঙ্গল। রাস্তায় চকরাবকরা জ্যোৎস্না পড়েছে।
রিকশাওয়ালা বলল, আর এক জায়গায় একটুখানি থামতে হবে। সিঙ্গি মশাইয়ের নস্যির কৌটোটা দিয়েই আমার ছুটি।
একখানে জঙ্গলটা কিছু ফঁকা। রিকশ সেখানে থামল। রিকশওয়ালা সিট থেকে নেনে রাস্তার ধারে গিয়ে চেঁচাতে থাকল, সিঙ্গিমশাই! সিঙ্গিমশাই।
তারপর সাড়া না পেয়ে এগিয়ে গেল। আর তাকে দেখতে পেলাম না। ভয়ে ভয়ে ডাকলাম, ছোটমামা!
ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন,–চুপচাপ বসে থাক। আমাদের বাড়ি পৌঁছনো নিয়ে কথা।
এইসময় কাছাকাছি একটা গাছ থেকে কেউ বলল,-কারা এখানে? ছোটমামা ভারিক্কি চালে বললেন, আমরা।
–আমরা মানে? নাম কী? বাড়ি কোথায়?
