একটু খটকা লাগল! বললুম,–আবার মারা পড়বে মানে? কবার মারা পড়েছ হে? আঁ?
আজ্ঞে বেশি নয়। মোটে একবার। লোকটা আবার ফোতফেঁত করে নাব ঝাড়ল। ওরে বাবা! ওই একবারেই যে কষ্ট পেয়েছি, আবার মরতে হলেওঃ!
ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো বাপু! –ওর কান্নাকাটি দেখে এবং এই সন্দেহজনক কথাবার্তায় একটু ভড়কে গিয়েই বললুম!
–বুঝলেন না স্যার?
–মোটও না।
–আজ সন্ধ্যাবেলায় আমি সম্ভবত গাড়িচাপা পড়েছিলুম। আবছা মনে পড়ছে এটুকু।
–বলো কী হে? তারপর? তারপর?
–তারপর আর কী? মরে গেলুম।
আকাশ থেকে পড়লুম একেবারে,–মরে গেলে? মরেই যদি গেলে তাহলে এখানে এসে আমার সঙ্গে কথা বলছ কী করে?
–সেটাই তো বুঝতে পারছি না স্যার! এমন কী, আমি কে—
–ওয়েট, ওয়েট! তুমি বলতে চাইছ যে তুমি ভূ-ভূ-ভূ…
লোকটা চাপা গলায় বলে উঠল,–বলবেন না স্যার, বলবেন না। শুনলে ভয় করে। ওদের ভীষণ ভয় পাই। তাছাড়া জানেন তো? কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই!
এতক্ষণে আমার গায়ে কাঁটা দিল। আস্তে বললুম,–তুমি ঠিকই বলছ। কিন্তু তুমি তো এখন ওদেরই একজন। অথচ তুমি ওদের ভয় পাচ্ছ। এতো ভারি বিদঘুঁটে কথা বাপু।
–আমি যে সবে ওদের একজন হয়েছি। নতুনদের যা হয়।
আমার সন্দেহ ঘুচে গেল। তাহলে যা ভেবেছি, তাই। এখন মাথার ঠিক রাখা দরকার। চারদিক আঁধারকালো নিশুতি-নিঝুম। সাবধানে কথা বলা উচিত। বললুম, দেখো ভাই, এক কাজ করো। তুমি বরং পাকাপাকি একটা আস্তানা করে নাও কোথাও।
–আপনার ছাদটা মন্দ নয় স্যার। বেশ নিরিবিলি।
–তোমার মাথা খারাপ? বরং ওই যে দেখছ চিনুবাবুদের চিলেকোঠা–দেখতে পাচ্ছ তো?
-–ওরে বাবা! হাসপাতালের মর্গ থেকে প্রথমে তো ওখানেই গিয়েছিলুম। ওখানে যে এক বড়বাবুর আস্তানা। যেমন তুষো চেহারা, তেমনি গলার আওয়াজ। পিস্তল তুলে বলে, পাকড়া! পাকড়ো!
–বুঝেছি। চিনুবাবুর বাবা। একসময় পুলিশের দারোগা ছিলেন!
–তাই মনে হল দেখে। এজন্যই বলে, স্বভাব যায় না মলে! পিস্তলটারও।
–তোমারও যায়নি মনে হচ্ছে! তুমি কী ছিলে বলল তো?
–আজ্ঞে, সেটাই তো মনে পড়ছে না।
–বাঃ! ট্যাক্সিচাপা পড়াটা মনে পড়ছে, চিনুবাবুদের চিলেকোঠায় যাওয়াটা মনে পড়ছে আর এই আসল কথাটা মনে পড়ছে না?
–কিছু কিছু মনে পড়ছে, কিছু কিছু পড়ছে না। বুঝলেন না? সদ্য-সদ্য মরেছি কিনা! সব গণ্ডগোল হয়ে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
–বেশ। এখন কী করতে চাও। তাই বলল। আমার ঘুম পাচ্ছে।
–আপনি শোন না স্যার। শুয়ে পড়ুন।
–আর তুমি!
–বসে ভাবি। ভেবে দেখি, আমি কে? তারপর একটা ঠিক করা যাবে।
আপত্তি করে বললুম,–সেটা কাজের হল না। তুমি বরং অন্য কোথাও গিয়ে ভাবো।
–আমাকে কি ভয় পাচ্ছেন স্যার?
–পাচ্ছি বইকী।
–ভয় পাবেন না দয়া করে। কারণ আমার নিজেকেই নিজের ভয় করছে!
–কেন? কেন?
বুঝলেন না? টাটকা মরেছি? এখনও ধাতস্থ হয়নি কিছু। দেখতে পাচ্ছেন না স্যার–এখনও অশরীরী পর্যন্ত হতে পারছি না। শরীরটাকে যত ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করি তত এসে পেয়ে বসছে। সেই দুঃখেই তো কঁদছিলুম তখন।
চেষ্টা করে দেখো!–হাই তুলে বললুম। তারপর মাদুর বিছিয়ে বসলুম এতক্ষণে। যার নিজের নিজেকে ভয় করছে, তাকে আমার ভয় পাওয়ার কোনও মানে হয় না।
লোকটা বলল, আপনি শুয়ে পড়ুন। দেখি কী করা যায়।
অগত্যা আমি শুয়ে পড়লুম। কিন্তু কাত হয়ে একটা চোখ রাখলুম ওর দিকে। লোকটা একটু পরে হঠাৎ জিমন্যাস্টিক শুরু করল। ছোটাছুটি, ডিগবাজি, শূন্যে চরকির মতো পাক খেয়ে হরেক কসরত করে একসময় থামল। সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলতে থাকল ক্লান্ত হয়ে বললাম, ও কী করছ হে?
–আজ্ঞে, অদৃশ্য হওয়ার চেষ্টা করছি। পারছি না।
–পারবে, পারবে। আবার শুরু কর।
–করব। কিন্তু গলা যে শুকিয়ে গেল। বড্ড তেষ্টা। দয়া করে এক গ্লাস জল খাওয়াবেন স্যার?
–খাওয়াব। কিন্তু কথা দাও, অশরীরী মানে অদৃশ্য হতে পারলে এ ছাদ ছেড়ে চলে যাবে।
–দিচ্ছি স্যার? চলে যাব কোথাও।
–শুধু দিচ্ছি বললে হবে না। দিব্যি কর।
কার নাম করব?
একটু ভেবে বললুম,–বাবা মহাদেবের নামে! উনিই তোমাদের দেবতা, জানো না?
লোকটা বাবা মহাদেবের নামে দিব্যি করলে আমি জল আনতে গেলুম।
এক গেলাস জল নিয়ে ছাদে ডাকলুম, কই হে! জল নাও। কিন্তু কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। আরও কয়েকবার ডাকাডাকি করে বুঝলুম, ওর চেষ্টা সফল হয়েছে। তখন জলটা নিজেই খেয়ে শুয়ে পড়লুম নিশ্চিন্তে। কিন্তু লোকটা কে?
অবশ্য সকালের কাগজে দুর্ঘটনার খবরে লোকটার নাম পেয়ে যেতেও পারি।…
রাতের মানুষ
ঝুলনপূর্ণিমার রাতে গঞ্জের মেলায় ছোটমামার সঙ্গে কলকাতায় যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম। সন্ধের দিকে বৃষ্টি পড়ছিল। ফেরার সময় দেখি আকাশ ফাঁকা। ঝলমলে চাঁদ কাত হয়ে বাদবাকি জ্যোত্সা ঢেলে নিজেকে খালি করে দিচ্ছে। রাস্তা শুনশান ফাঁকা। মানুষজন মেলায় রাত কাটাতেই আসে। কিন্তু ছোটমামা খুঁতখুঁতে মানুষ।–ঘুম পাচ্ছে বলেই যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়তে হবে নাকি? মোটে তো পাঁচ কিমি রাস্তা। চলে আয় টু।
ঘুম-ঘুম চোখে রাস্তা হাঁটা কষ্টকর। তা ছাড়া ছোটমামার চেয়ে আমার পাদুটো বড্ড বেশি ছোট। বারবার পিছিয়ে পড়ছি, আর ধমক খাচ্ছি।
হঠাৎ রাস্তার বাঁকের মুখে গঞ্জের শেষদিকটায় একটা সাইকেলরিকশ দেখা গেল। রিকশটা দাঁড়িয়েই ছিল। তবু ছোটমামা চেঁচিয়ে উঠলেন,-রোখকে! রোখকে।
