হারাধন বলে উঠল,–কোদা! ওই সেই বেড়ালটা!
কেষ্টবাবু হুঙ্কার দিয়ে বললেন,-বেড়ালটাকে ধরো হারাধন! আমি এই ছোকরার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দেখি, কীভাবে একে দলে দেওয়া যায়।
পানুবাবু বললেন,–অত আলাপ-আলোচনার কী আছে? ছোকরা যদি নিরীহ আর শান্ত হয়, ওকে বলুন না! ওই তো একটা সিলিংফ্যান ঝুলছে। চাই শুধু একটা শক্ত দড়ি। ঘরেই পেয়ে যাবে। হ্যাঁ, আমার নাইলনের মজবুত দড়িটা এখনও আছে নিশ্চয়। বৃষ্টি-বাদলের দিনে ঘরে ভিজে কাপড় শুকোতে দিতুম। অত ভালো দড়ি কি এই ছোকরা ফেলে দেবে?
এতক্ষণে আর্তনাদ করে উঠলাম,–না না না! ওরে বাবা। আমি ফ্যান থেকে ঝুলতে পারব না!
তারপরই বিদ্যুৎ এসে গেল। টেবিল ল্যাম্পের সুইচ টিপে দিলাম। অমনি খাটের তলা থেকে আমার মাথার পিছন দিয়ে কালো লম্বাটে একটা ছায়ামূর্তি যেন পিছলে বেরিয়ে গেল। মাথার দিকে ঠান্ডাহিম বাতাসের ঝাঁপটানি টের পেলাম। এক লাফে উঠে গিয়ে ঘরের টিউবলাইট জ্বালিয়ে দিলাম।
সেই সময় চোখে পড়ল, একটা কালো বেড়াল পাশের দিকের জানালা থেকে সরে-সরে গেল। ওদিকে একটা আম গাছ আছে। আম গাছে কাকেরা বাসা করে। বেড়ালটাকে ওই গাছের গুঁড়ি বেয়ে একদিন উঠতে দেখেছিলাম না?
কিন্তু এতক্ষণে মনে হল, ব্যাপারটা বুঝে গেছি। তবে আগাগোড়া সবটাই নিছক দুঃস্বপ্ন কি না কে জানে! আতঙ্কে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। এক গ্লাস জল খেয়ে একটু সুস্থ বোধ করলাম। তারপর টেবিলল্যাম্পটা নামিয়ে খাটের তলাটা দেখে নিলাম। খবরের কাগজগুলো এবং সুটকেসটা যথাস্থানে আছে। তবে সুটকেসটা একটু যেন কাত হয়ে গেছে…
কীভাবে সেই রাত্রিটা কাটিয়েছিলাম, সে আমিই জানি। পরদিন সকালে দোতলার ফ্ল্যাটে আমার পরিচিত রামবাবুকে গিয়ে ধরলাম। উনিই তেতলার ওয়ানরুম ফ্ল্যাটটা আমাকে পাইয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ির মালিক তার বন্ধু।
আমার পীড়াপীড়িতে রামবাবু বললেন, হ্যাঁ। আজকাল ফ্ল্যাটটি খালি পড়ে থাকে। আসলে আপনার একটা মাথাগোঁজার জায়গা দরকার ছিল। তাই ওই ফ্ল্যাটটাই
বাধা দিয়ে বললাম, কিন্তু আপনার একটু আভাস দেওয়া উচিত ছিল।
রামবাবু হাসলেন।–আপনাকে যদি বলতাম ওই ফ্ল্যাটে হারাধনবাবু, তারপর পানুবাবু, শেষে কেষ্টবাবু পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন, আপনি কি ওখানে থাকতে রাজি হতেন? তবে দেখুন, ওরা আপনার কোনও ক্ষতি তো করেনি।
–কী বলছেন! লোডশেডিং আর একটু চললে আমাকে ওরা সিলিংফ্যান থেকে ঝুলিয়ে ছাড়ত!
রামবাবু জিভ কেটে বললেন, না, না! আমি আছি কী করতে? আপনি ওদের কারও সাড়া পেলেই আমার নাম ধরে ডাকবেন। আমার নাম শুনেই ওরা পালিয়ে যাবে। কেন বুঝলেন তো? আমার নামে রাম শব্দটা আছে। রামনাম শুনেই ওরা– বুঝলেন তো?
বুঝলাম এবং সাহসও পেলাম যথেষ্ট। কিন্তু কথা হচ্ছে, খাটের তলায় শিশিটা পেয়ে গেলে ওরা আমাকে জোর করে খাওয়াতই। আর আমি–
বাপস!–ভাবতেই হৃৎকম্প হচ্ছিল। ভাগ্যিস একটা কালো বেড়ালের ওপর দিয়েই ফাড়াটা গেছে। তবে এখনই গিয়ে লাল রঙের নাইলনের দড়িটা পুড়িয়ে ফেলতেই হবে। কিছু না জেনে পরের জিনিস ব্যবহার করা আমার মোটেই উচিত হয়নি।…
রাতের আলাপ
রাত দশটা বাজলেই আমাদের পাড়ায় লোডশেডিং হবেই হবে। কাজেই রাতের সাখাওয়া শেষ করে মাদুর আর বালিশ নিয়ে খোলা ছাদে গিয়ে শুই। ঘুমটা আরামেই হয়।
এ রাতে ছাদে শুতে গিয়ে চমকে উঠলুম। ছাদের কার্নিশের কাছে কালো এক মূর্তি। সারা পাড়া আঁধারকালো। নিশুতি রাতে শুনশান নিরিবিলি ছাদে কালো হয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকাটা কাজের কথা নয়, বাড়ির মালিক যখন আমি তখন এ ছাদও আইনত আমার।
অতএব চোর না হয়ে যায় না।
কিন্তু আজকালকার চোর আর সে গোবেচারা চোর নয়। তাদের কাছে নাকি ছুরি-বোমা-পিস্তলও থাকে। চাচামেচিতে বিপদ। তাই ভয়ে-ভয়ে বললুম,–কে?
আমি। –চোর জবাব দিল মিনমিন গলায়। তারপর ফেঁত-ফোঁত করে দুবার নাক ঝাড়ল।
এইতে আমার একটু সাহস হল! বললুম, আমিটা কে?
–সেটাই তো বুঝতে পারছি না স্যার?
–তার মানে?
–আমার নামধাম কিছু মনে পড়ছে না!
আরও সাহস পেয়ে ধমক দিয়ে বললুম,–চালাকি হচ্ছে? অন্যের বাড়ির ছাদে উঠে–
–দয়া করে কথাটা শুনুন আমার।
–কোনও কথা শুনতে চাইনে। তুমি ছাদে উঠলে কী মতলবে?
–আজ্ঞে বিশ্বাস করুন–
চো-ও-প–চোরের হালচাল দেখে তখন আমার জোর বেড়ে গেছে। বললুম, নিশ্চয় তুমি পাইপ বেয়ে ছাদে উঠেছ চুরির মতলবে। দাঁড়াও, আমি চ্যাঁচামেচি করে
লোক জড়ো করছি!
স্যার! স্যার!–সে ভাঙাগলায় প্রায় কেঁদেই ফেলল। বিশ্বাস করুন, আমি চুরি করতে আসিনি। আমি কস্মিনকালে চোর নই, চোরের মাসতুতো ভাইও নই। আমি একটা গণ্ডগোলে পড়ে গেছি স্যার!
কান্নাকাটি শুনে বললুম, সত্যি বলছ, তুমি চোর নও?
–না স্যার!
–তাহলে ছাদে উঠেছ কেন? কী ভাবে উঠেছ?
ন্যাকা! বলে কী, নামধাম মনে পড়ছে না–অন্যের বাড়ির ছাদে কীভাবে উঠে এলে, সেটাও নাকি মনে নড়ছে না। ওকে আঙুল তুলে শাসালুম। এক মিনিট সময় দিচ্ছি–আসল কথাটা ফস না করলে এইসা রামচ্যাঁচিনি চ্যাঁচিব যে পাড়াসুদু লোক লাঠিসোটা নিয়ে এসে তোমায় রামঠেঙানি ঠেঙাবে।
লোকটা বেজায় ঘাবড়ে গেল এবার। ভা-া করে কেঁদে বলল, ওরে বাবা! তাহলে যে আমি আবার মারা পড়ব!
