নড়াচড়া আর ফোঁস-ফোঁস থেমে গিয়েছিল। আমার কথা শেষ হওয়ার পর খাটের তলা থেকে কেউ খ্যানখেনে গলায় বলল,–মলোচ্ছাই! এ যে দেখছি আমার চেয়েও ভীতু! এই একটুতেই ভ্যা করে কেঁদে ফেলবে যেন। আবার আমাকে সারসার করা হচ্ছে। খবরদার! আমাকে সার বলবে না বলে দিচ্ছি!
–আজ্ঞে, বলব না। কিন্তু রাতদুপুরে আপনি আমার খাটের তলায় কী করছেন? কে আপনি?
–আমি যে-ই হই, তা নিয়ে তোমার মাথাব্যথা কীসের? আমি একটা জিনিস খুঁজছি। পাচ্ছি না।
–খাটের তলায় আপনার জিনিস আছে বুঝি?
–থাকার কথা। কিন্তু গেল কোথায়? তুমি ফেলে দিয়েছ নাকি?
–কী জিনিস বলুন তো?
–একটা ছোট্ট শিশি।
–আজ্ঞে আমি তো তেমন কোনও শিশি দেখিনি।
–তুমি কবে থেকে এই ঘর ভাড়া নিয়েছ?
–প্রায় এক মাস হয়ে এল।
–বুঝেছি। তাহলে হারাধনেরই কাজ। বাকিটুকু অন্য কাকেও খাইয়ে দিয়েছে। ব্যাটাছেলে মহা ধড়িবাজ।
ক্রমে-ক্রমে আমার সাহস বেড়ে যাচ্ছিল। তাই জিগ্যেস করলাম, হারাধন কে বলুন তো?
–হুঁ। তোমাকে তার পরিচয় দিই আর তুমি তাকে পুলিশে ধরিয়ে দাও। বাহ! আমাকে অত বোকা ভেবো না হে ছোকরা।
–আজ্ঞে, জাস্ট একটা কৌতূহল! তা ঠিক আছে। শিশিতে কী ছিল বলতে আপত্তি আছে?
–নেই। শিশিটা পেয়ে গেলে তোমাকেই একটুখানি খাইয়ে দিতাম। আমার একজন সঙ্গীর দরকার বলেই তো ওটা খুঁজতে এসেছি। হারাধনকে জিগ্যেস করতে হবে, আর কাকে সাপ্লাই করেছে।
–প্লিজ দাদা! আপনার সঙ্গী হতে আপত্তি নেই। কিন্তু জিনিসটা কী, যা খেলে আপনার সঙ্গী হতে পারতাম?
–বলব! আগে হারাধনটাকে জিগ্যেস করে আসি আর একটু-আধটু ওর কাছে আছে কি না।
এই সময় আমার মাথার দিকে জানালার পাশ থেকে কেউ চাপাগলায় বলে উঠল,–কেষ্টদা আছেন নাকি?
খাটের তলার লোকটি খাপ্পা হয়ে বলল, তুমি কে হে ছোকরা, আমাকে এখানে ডাকতে এসেছ?
সাবধানে মাথা একটু ঘুরিয়ে দেখলাম, জানালার ওধারে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুল হবে, ভেসে আছে। কারণ এটা তিনতলার একটা ঘর। ওদিকে খাড়া দেয়াল নেমে গেছে। বুকটা ধড়াস করে উঠল।
ছায়ামূর্তিটা কেমন অদ্ভুত খিখি শব্দে হেসে বলল, আমি হারাধন কেষ্টাদা!
কেষ্টবাবু বললে,–এই এক্ষুনি তোমার নাম করছিলাম। এসো, কথা আছে।
কেষ্টাদা! আমরা তোমাকে খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়ে শেষে এখানে এলাম। পানুবাবু বললেন, কেষ্টবাবু হয়তো শিশিটার খোঁজে গেছেন!
–পানুবাবু কোথায়?
–ওই চিলকোঠায় ছাদে বসে আছেন।
–তাকে ডেকে আনো! তিনজনে বসে একটু আলোচনা করব।
চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম ছায়ামূর্তিটা উধাও হয়ে গেল। এবার ডাকলুম,–কেষ্টাদা!
–মলোচ্ছাই! আগেই কেষ্টাদা বলে ডাকছ কেন হে? ডাকার কাজ করো। তবে তো কোদা বলে ডাকবে!
–কী কাজ বলুন তো?
–একটু ওয়েট করো। ওরা দুজনে আসুক। শিশিটার খোঁজখবর নিই। তবে?
–শিশির ভেতর যা আছে, তা খেলে পরেই আপনি আমার কেষ্টাদা হয়ে যাবেন?
–বাহ! তোমার মাথা আছে হে ছোকরা!
–কিন্তু শিশিটা যদি না পাওয়া যায়, তাহলে?
–দেখো ভায়া, যদি সত্যি তুমি আমাদের দলে ভিড়তে চাও, শিশির দরকার অবশ্য হবে না। আরও কত উপায় আছে। তবে শিশির জিনিসটা বেস্ট। তুমি টেরও পাবে না কী ঘটে গেল!
–সে কী দাদা! টেরও পাব না? কিন্তু ঘটবেটা কী?
–চুপ! বকবক কোরো না। খাটের তলায় যা বিচ্ছিরি গরম!
এই সময় মনে হল, এবার দেশলাই জ্বেলে মোমবাতিটা ধরিয়ে ফেলি। লোডশেডিং দু-ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টাও চলতে পারে। কিন্তু টেবিলের দিকে হাত বাড়াতে সাহস হল না।
একটু পরেই আমার মাথার দিকে জানালায় কেউ বলে উঠল,-কেষ্টবাবু! আছেন না কেটে পড়েছেন।
কেষ্টবাবু সাড়া দিলেন –আসুন পানুবাবু! কেটে পড়ার মতো অবস্থা হয়নি এখনও। হারাধন চলে এসো।
–পানুবাবু বললেন,–আরে! এখানে কে শুয়ে আছে দেখছি!
–ওর ব্যাপারেই একটু আলোচনা আছে।
–খাটের তলায় ঢুকে আলোচনা চলে না। বেরিয়ে আসুন।
–বিচ্ছিরি গরম লাগছে বটে, কিন্তু বেরুতে ইচ্ছে করছে না।
–কেন?
–কোথাও এমন নিরুপদ্রব জায়গা নেই মনে হচ্ছে। আজকাল সবখানেই লোকের ভিড়। আপনারা দুজনেও এখানে থাকতে পারেন। পুরোনো জায়গায় পুরোনো কথা মনে পড়ে আনন্দ পাওয়া যাবে।
–ধুর মশাই! একজন জলজ্যান্ত লোক মাথার ওপর শুয়ে থাকবে। অস্বস্তি হবে না বুঝি?
–মোটেও না পানুবাবু! এ ছোকরা খুব নিরীহ আর শান্ত। দেখছেন না কেমন চুপচাপ শুয়ে আছে।
–জেগে নেই, তা-ই।
–নাহ। দিব্যি জেগে আছে।
–সে কী! ও হারাধন! কেষ্টবাবু কী বলছেন শুনলে?
হারাধন বলল, কই দেখি, দেখি!
খাটের তলা থেকে কেষ্টবাবু বললেন,-খামোকা ওকে ভয় পাইয়ে দিয়ো না। বরং ওকে আমাদের সঙ্গী করে নিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। পানুবাবু! আসুন এখানে। হারাধন এসো হে!
পানুবাবু বললেন,-হারাধন যায় তো যাক। আমি যাচ্ছি না! খাটের ছোকরাকে বিশ্বাস করা যায় না। আজকাল ছেলে-ছোকরাদের মতিগতি বোঝা কঠিন।
হারাধন বলল,–ঠিক বলেছেন পানুবাবু!
কেষ্টবাবু চটে গেলেন। বেশ। আসতে হবে না, কিন্তু শিশিটা কোথায় গেল?
হারাধন বলল,–তুমি খাওয়ার পর যেটুকু ছিল, তার খানিকটা পানুবাবু খেয়েছিলেন। বাকিটুকু কী হল পানুবাবু বলুন।
পানুবাবু বললেন, আমি চায়ের কাপে একটুখানি মিশিয়ে দিয়ে শিশিটা ছুঁড়ে ফেলেছিলাম। পরে দেখেছি, নর্দমার ধারে একটা বেড়াল দাঁত বার করে পড়ে আছে। বাকিটুকু সে-ই সাবাড় করেছিল।
