মুরারিবাবুর স্ত্রী নরম মনের মানুষ! কাঁদকদ মুখে বললেন,–ওগো! ফকিরসায়েবকে বারণ করো! আহা অত করে বেচারাদের মারে না! মরে যাবে যে!
ফকির একগাল হেসে বলল, ঠিক আছে। মাঠাকরুন বলছে যখন। তোকই রাহাখরচ দাও! সমুদুরে ফেলতে যাব। সমুদ্র কি এখানে? তেরো নদীর পারে। ট্রেনে বাসে জাহাজে কতবার চাপতে হবে, তবে না।
রাহাখরচ নিয়ে ফকির চলে গেল। বস্তা কাঁধে নিয়েই গেল। মুরারিবাবুর বড় মেয়ে বিলু চোখ বড় করে বলল,-বাবা, বাবা! বস্তার ভেতর কেমন একটা শব্দ হচ্ছিল শুনেছ।
তার মা বললেন, চুপ, চুপ। বলতে নেই।
আজ সবাই নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে। খাওয়া-দাওয়া সেরে নিথে আরও রাত হল। বাড়ি নিরাপদ। তাই উঠোনে মুরারিবাবু মহানন্দে পায়চারি করতে থাকলেন। গল্পগুজবও করলেন নানারকম। সব নিশুতি নিঝুম হয়ে গেছে। ঝিঁঝি ডাকছে। জোনাকি জ্বলছে গাছপালায়। সেই সময় রাত বারোটা পাঁচের ডাউন ট্রেন শিস দিতে-দিতে আসছ। রেল লাইন বাড়ির ওপাশ দিয়ে গেছে। বাড়ি থেকে উঁচুতে রেললাইন। ট্রেন গেলে উঠোন থেকেও দেখা যায়। ট্রেনের আলো ঝলসে দিয়ে যায় বাড়িটাকে। বিলুর ভাই অমু বলল, বাবা, ফকির এই ট্রেনেই যাচ্ছে।
মুরারিবাবু বললেন, হ্যাঁ। বে অফ বেঙ্গল যেতে হলে…
হঠাৎ তার কথা থেমে গেল। লাফিয়ে উঠলেন। এ কী? ফের তার মাথায় ঢিল পড়ল যে? শুধু তাই নয়, কালোকালো আরও ঢিল উঠোনে তাঁর আশেপাশে টুপ-টুপ করে পড়ছে। ট্রেনের আলোটা সোজা এসে পড়ছে তাঁর গায়ে। মুরারিবাবু আতঙ্কে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন। মুখে কথা নেই। ট্রেন চলে গেলে ঝলসানো আলোটাও সরল। তখন মুরারির মুখে কথা এল। ঘরে ঢোক! ঘরে ঢোক! বলে উঠোন থেকে বারান্দায় উঠলেন।
তারপর রাগে দুঃখে আতঙ্কে অস্থির হয়ে বললেন, ব্যাটা ভণ্ড ফকির স্রেফ ঠকিয়ে গেল। ওঃ কী ভুল না করেছি!
বিলুর মা বললেন,–সে কী। কেন, কেন, ওকথা বলছ?
এইমাত্র ঢিল পড়ল দেখলে না? আমার মাথাতেও পড়ল।–মুরারি টাকে হাত বুলোতে বুলোতে গিয়ে ফের লাফিয়ে উঠলেন। ওরে বাবা। আমার কানের পাশে কী যেন রয়েছে। ঢিল! ভূতুড়ে ঢিল আটকে রয়েছে।
অমু বাবার কানের পাশ থেকে কালো কী একটা খপ করে ধরে ফেলল। তারপর বলল,-ও বাবা। এটা তো চামচিকে!
অ্যাঁ।–মুরারি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। অমু চামচিকেটা ছেড়ে দিতেই থামের গায়ে আটকে গেল। কিন্তু বলা যায় না, জিনেরা কতরকম রূপ ধরে! তাই তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন,–মার-মার! জুতোপেটা কর।
সেই সময় অমু বলে উঠল, বাবা, ইউরেকা!
–ইউরেকা মানে?
অমু রহস্যভেদী গোয়েন্দার মতো ভারিক্কি চালে বলল, মাত্র চামচিকে। স্রেফ চামচিকে বাবা! বুঝলে না? ট্রেনের আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উড়ন্ত চামচিকেগুলোর চোখ ধাঁধিয়ে যায় আর টুপ টুপ করে পড়তে থাকে। আমরা ভাবি ঢিল পড়েছে।
মুরারিবাবু সন্দিগ্ধভাবে বললেন, কিন্তু ছাদের ধুপধাপ শব্দ?
অমু তেমনি গম্ভীর হয়ে বলল, শব্দ হোক না, আমি ছাদে যাব।
তার মা বললেন, ওরে না-না। যাসনে অমু! ওই শোন কারা হেঁটে বেড়াচ্ছে। ওগো কাল বরং ওঝা ডেকে আনো। মনে হচ্ছে, ওরা জিনটিন নয়, অন্য কিছু।
মুরারি সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। ভূতই বটে। কালই হরিপদ ওঝার বাড়ি যাব।
ওদিকে তক্ষুনি অমু ছাদে চলে গেছে টর্চ নিয়ে। ছাদ থেকে তার গলা শোনা গেল। বাবা-মা। ইউরেকা, এগেন ইউরেকা!
এবার সবাই উঠোনে নামলেন ভয়ে-ভয়ে! কী দস্যি ছেলেরে বাবা! মুরারি বললেন, কী রে?
–ছুঁচো বাবা!
–আঁ!
–হ্যাঁ বাবা! আর কিছু না–স্রেফ ছুঁচো ডন টেনে বেড়াচ্ছে। দেখবে এসো।
মুরারি নিশ্বাস ফেলে বললেন,–। নেমে আয়।
ছাদে রাজ্যের আবর্জনা জমে আছে। পুরোনো বাড়ি। ছুঁচোর আজ্ঞা হতেই পারে। রাতবিরেতে একদঙ্গল ছুঁচো ছাদে ডন টানে। গানও গায় নেচে-নেচে। তাই শব্দ হয়। বাড়িটা এবার মেরামত করে কলি ফেরানো দরকার। চামচিকে, ছুঁচো, ইঁদুর, আরশোলা টিকটিকির আড্ডা হয়ে গেছে।
রাতদুপুরে অন্ধকারে
কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। তারপর টের পেলাম সারা পাড়াজুড়ে লোডশেডিং। কারণ, জানলা খোলা আছে, অথচ ঘরের ভেতর ঘুরঘুট্টে অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরম।
কিন্তু শব্দটা অস্বস্তিকর এবং সেটা হচ্ছে আমার খাটেরই তলায়। সেখানে থাকার মধ্যে আছে কিছু পুরোনো খবরের কাগজ। একটা সুটকেস। তার মধ্যে কেউ যেন নড়াচড়া করছে। সেই সঙ্গে অদ্ভুত ফোঁস-ফোঁস শব্দ।
প্রথমে ভাবলাম, সাপ নয় তো? পরে মনে হল, তিনতলার এই ঘরে সাপ কোথা থেকে আসবে? ধেড়ে ইঁদুর বা ছুঁচো হলেও হতে পারে। কিন্তু ওরা কি ফেস-ফোঁস শব্দ করে? নড়াচড়াটাও যেন কোনও ওজনদার প্রাণীর। প্রাণীটা সম্ভবত লম্বাটে গড়নের। নাহ। কখনওই বিড়াল নয়। অস্বস্তি বেড়েই গেল। টেবিলে একটা দেশলাই আছে। মোমবাতি আছে। হাত বাড়ালেই পেয়ে যাব। কিন্তু সাহস পাচ্ছি না, যদি চোর হয়? আজকাল চোরদের সঙ্গে ছোরা-ভোজালি-পিস্তল থাকে শুনেছি। একটা টর্চ আছে অবশ্য। কিন্তু সেটা বিগড়ে যাওয়ার আর সময় পায়নি, আজ সন্ধ্যাবেলাতেই বিগড়ে গেছে। খুব অসহায় বোধ করলাম। এদিকে নড়াচড়া আর স্বাসপ্রশ্বাসের মতো ফোঁস-ফোঁস শব্দটা বেড়েই চলেছে।
কিছুক্ষণ পরে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। মরিয়া হয়ে করুণস্বরে বলে উঠলাম, দেখুন সার (কেন যে মুখ দিয়ে সার বেরিয়ে গেল কে জানে!) আমার খাটের তলায় সোনাদানা বা টাকাকড়ি কিছু নেই! টেবিলের ড্রয়ারে আমার মানিব্যাগ আছে। তাতেও বেশি টাকাকড়ি নেই। তবে ওটা আপনি স্বচ্ছন্দে নিয়ে চলে যেতে পারেন। আমার রিস্ট ওয়াচটা দাবি করলে সেটাও আপনার হাতে তুলে দিয়ে ধন্য হব। কিন্তু দয়া করে আমাকে যেন মারবেন না সার।
