সাহস করে ঘুঘুডাঙার বাড়িতে থাকতে পারলে সেই ভূতেরাও পালাবে একদিন। মুরারিবাবু রামনগর থেকে শেষপর্যন্ত আশা নিয়েই ফিরলেন। অভিজ্ঞতা হল। ভূতের খাদ্য কী, তাও জানতে পারলেন। অতএব বাড়ির ত্রিসীমানা থেকে শুকনো গোবর, হাড়গোড়, সাপ, ব্যাঙ, টিকটিকি, আরশোলা ইত্যাদি হটাতে পারলে খাদ্যের অভাবে ভূতেরাও অন্যখানে চলে যাবে। ওঝার দরকারটা কী?
রাত-বিরেতে
মুরারিবাবু খুব বিপদে পড়েছেন! রাতদুপুরে বাড়ির উঠোনে টুপ-টুপ করে ঢিল পড়ে। কারা ছাদে হেঁটে বেড়ায় ধুপধুপ, ধুপ-ধুপ। বেরিয়ে কিন্তু কাউকে দেখতে পান না। টর্চ জ্বেলে বাড়ির চারপাশটা বৃথা খোঁজাখুঁজি করেন। নিরিবিলি জায়গায় বাড়িটা। পাড়ার মধ্যেও নয় যে ছেলেরা দুষ্টুমি করবে। তা ছাড়া, তাজ্জব ব্যাপার, ঢিল পড়ার শব্দ পান এবং দু-একটা তার টাকেও পড়ে, অথচ ঢিল দেখতে পান না।
তাহলে? এ নিশ্চয় অশরীরীদের কাজ। মুরারিবাবুর বন্ধু ফৈজুদ্দিন এ শহরের নামকরা উকিল। তিনি এসে সব শুনে বললেন, দেখ মুরারি! আমার মনে হচ্ছে, তুমি জিনের পাল্লায় পড়েছ।
মুরারিবাবু বললেন,–জিন? সে আবার কী? সবাই তো বলছে, ভূতেরই কাণ্ড।
–উঁহু। ভূত থাকে বনবাদাড়ে, জলার ধারে, নিরিবিলি জায়গায়। পারতপক্ষে তারা মানুষের কাছে ঘেঁষে না। কারণ, মানুষ মরেই তো ভূত হয়। বেঁচে থাকার ঝক্কি কতটা, মানুষ মরার আগে হাড়ে-হাড়ে জানে। ঘেন্না ধরে যায় মনুষ্যজীবনে। কাজেই মরে ভূত হওয়ার পর কোন পাগল আর মনুষ্যজীবনের আনাচে-কানাচে আসতে চাইবে বলো।
মুরারিবাবুর মনে ধরল কথাটা। ফৈজুদ্দিন-উকিলের যুক্তির পঁাচে কত বাঘা বাঘা হাকিম হার মানে। মুরারিবাবু বললেন, হুঁ, তোমার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু জিন কী?
ফৈজুদ্দিন খুশি হয়ে বললেন,–জিনদের ব্যাপারস্যাপার অবিকল ভূতদেরই মতো। তবে তারা একরকম প্রাণী বলতে পারো। তারা মানুষের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়। এঁটোকাটা, আবর্জনা, গোবর, হাড় এইসব নোংরা জিনিস তাদের খাদ্য। ইচ্ছে করলেই তারা অদৃশ্য হতে পারে। আবার ইচ্ছে করলেই নানারকম রূপ ধরতে পারে!
–তারা থাকে কোথায়?
পোড়াবাড়িতে। চিলেকোঠায়। ছাদে। কখনও বাথরুমের ঘুলঘুলিতে। –ফৈজুদ্দিন চাপা গলায় বললেন! আমার বাথরুমের ঘুলঘুলিতে একটা জিন ছিল। বুঝলে? রোজ চান করতে ঢুকতুম, আর ব্যাটা মুখ বাড়িয়ে আমায় ভেংচি কাটত। দুটো জুলজুলে নীল চোখ। বাপ! এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
মুরারি আঁতকে উঠে বললেন,–দেখতে কেমন জিনটা! খুব ভয়ঙ্কর চেহারা নিশ্চয়?
তত কিছু না, ফৈজদ্দিন কড়ে আঙুল দেখালেন!–এইটুকুন। একটা টিকটিকির মতো বিদঘুঁটে।
–তারপর? তারপর? কীভাবে সেটা তাড়ালে?
–কালা-ফরিককে ডেকে আনলুম, সে ব্যাটাকে আতরের শিশিতে পুরে পুকুরে ফেলে দিয়ে এল। তুমি কালাফকিরের কেরামতি তো জানো না! তাকে দেখলে জিনেরা লেজ ফেলে রেখে পালায়!
মুরারির একটু খটকা লাগল। বললেন,–পালায় যদি শিশিতে পোরে কীভাবে?
ফৈজুদ্দিন ফাঁচ্ করে হাসলেন।–সেটাই তো কালা-ফকিরের কেরামতি, তুমি এক্ষুনি ওর কাছে যাও। দেখবে ফকিরসাহেব এসে তোমার বাড়ির জিনগুলোকে বস্তায় পুরে সমুদুরে ফেলে দিয়ে আসবে।
মুরারি লাফিয়ে উঠলেন। কিন্তু ফের খটকা লাগল মনে। বললেন, বস্তা কেন? ওই যে বললে আতরের শিশির কথা?
–বুঝলে না? তোমার বাড়ির জিন তো ঘুলঘুলির খুদে জিন নয়। একটা দুটোও নয়–একেবারে একগাদা। তা ছাড়া, তারা ভেংচি কাটে না, ঢিল ছোড়ে। ছাদ কাঁপয়ে হেঁটে বেড়ায়। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, তাদের সাইজ বড়। যাকগে, আদালতে যাওয়ার সময় হল। তুমি এক্ষুনি কালা-ফকিরের কাছে যাও।
ফৈজুদ্দিন ব্যস্তভাবে চলে গেলেন। একটু পরে মুরারিবাবুও বেরিয়ে পড়লেন। কালা-ফকির থাকে শহরের বাইরে এক নির্জন দরগায়। নিঝুম জায়গা। কোনও পিরসাহেবের কবর আছে। ফকির সেই কবরে আগরবাতি আর সজবাতি জ্বালে। কদাচিৎ ভক্তরা এসে সিন্নি আর দশ-বিশ পয়সা মানত দিয়ে যায়।
মুরারিবাবুকে দেখে কালা-ফকির চোখ পাকিয়ে বলল, কী? জিনের পাল্লায় পড়েছ বুঝি? ভাগো, এখন আমার যাওয়ার সময় নেই।
কালো আলখেল্লাপরা পাগলাটে চেহারার ফকিরকে দেখে মুরারিবাবু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তার ওপর এই কড়া ধমক। কিন্তু উপায় নেই। খুব ভক্তি দেখিয়ে একটা টাকা ফকিরের পায়ের কাছে রেখে বিনীতভাবে বললেন, দয়া করে একবার যেতেই হবে বাবা। রাতে ওদের অত্যাচারে ঘুম হয় না। বড় বিপদে পড়ে এসেছি আপনার কাছে।
ফকির টাকাটা ভালো করে দেখে নিয়ে আলখাল্লার ভেতরে চালান করে দিল। তারপর বলল, ঠিক আছে। বাড়ি গিয়ে একটা বস্তা জোগাড় করে রাখো। সব নিশুতি হলে রেতের বেলা যাবখন।
কালা-ফকির সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত করে এল। বস্তাটা ভালো করে দেখে নিল ফুটো আছে নাকি। তারপর সেটা নিয়ে একটা অষ্টাবক্র লাঠি নাচাতে নাচাতে সে অন্ধকার বাড়ির চারদিকে চক্কর দিতে থাকল। বিড়বিড় করে কী সব আওড়াচ্ছিল। এদিকে মুরারিবাবু, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সে ঘরের ভেতর থাকতে বলেছে। খবরদার, কেউ যেন না বেরোয়। বেরুলে বিপদ।
কতক্ষণ পরে ফকির চেঁচিয়ে ডাকল,-বেরিয়ে এসো সব। কেল্লা ফতে। সবকো পাকাড় লিয়া।
সবাই বেরিয়ে গিয়ে দেখল, কালা-ফকির বস্তার মুখটা দড়ি দিয়ে বেঁধে তার ওপর সেই বাঁকাচোরা লাঠিটা দমাদ্দম চালাচ্ছে। বল! আর জ্বালাবি বল, কখনও ঢিল ছুড়বি?
