বেলিংটন বললেন,–আর বেড়াতেও অসুবিধে নেই। মোটরগাড়ি চাও? তাও পাচ্ছ। তবে মোটরগাড়িটিরও মরে ভূত হওয়া চাই। বুঝেছ তো? আমার ওই ফোর্ড গাড়িটা ভাগ্যিস সেই দুর্ঘটনায় আমার সঙ্গেই মারা পড়েছিল। তাই ওটা পেতে অসুবিধে হয়নি।
রসগোল্লার সরা সাবাড় করতে করতে মুরারিবাবু বললেন, কিন্তু স্যার, গাড়িটা ভোঁদা মিত্তিরের গ্যারেজে গেল কীভাবে?
–আরে, সে এক কাণ্ড! গাড়ির ভাঙাচোরা যন্তর আর বডিটা কুড়িয়ে মল্লিকবাজারে কারা বেচে দিয়ে এসেছিল। তোমাদের ভোঁদা মিত্তির তাকে মাত্র পঁচিশ টাকায় কিনে জোড়াতাড়া দিয়ে আগের মতো গড়ে ফেলেছিল। লোটার প্রশংসা করতে হয়। অবিকল আগের চেহারা ফিরিয়ে দিল।
মুরারিবাবুর রসগোল্লা খাওয়া শেষ। এবার বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানার কথাটা তুলবেন। কাচুমাচু মুখে বললেন, স্যার, এবার…
তাঁকে বাধা দিয়ে বেলিংটন বললেন, সব হবে, সব হবে। কিন্তু এবারে তাহলে স্বীকার করেছ তো বাবু, মরে ভূত হওয়ার মতো আনন্দ আর নেই?
মুরারিবাবু উৎসাহে সায় দিয়ে বললেন, আলবত স্যার! তা আর বলতে? বেঁচে থাকার কোনও মানেই হয় না।
অমনি সায়েব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–তাহলে এসো।
অবাক হয়ে মুরারিবাবু বললেন,–কোথায় স্যার?
–কেন? মরতে!
মরতে! –মুরারিবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন।
–হ্যাঁ, না মরলে ভূত হবে কী করে? চলে এসো বাবু। দেরি কোরো না। আরে, শুনতে যতটা লাগে, তত কিছু নয়। টেরই পাবে না। এসো, উঠে এসো।
অ্যাঁ! মুরারিবাবু আঁতকে উঠলেন। এবার বুঝতে পেরেছেন, ঝোঁকের বশে কী বলে ফেলেছেন! হায়, হায়, খাওয়ার লোভেই এই বিপদ!
বেলিংটন টেবিলের ওপর দিয়ে বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে খপ করে মুরারিবাবুর একটা হাত ধরে ফেললেন। তারপর হ্যাঁচকা টান মেরে ওঠালেন তাকে। চেয়ারগুলো দুমদাম ছিটকে পড়ল।
বেলিংটন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা একটা হাতে তাঁকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে বাংলো থেকে বেরোলেন।
এবার মুরারিবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন, ওরে বাবা রে! মেরে ফেললে রে! বাঁচাও, বাঁচাও!
কিন্তু বেলিংটন তখন নিজমূর্তি ধরেছেন। কোটপ্যান্ট পরা আস্ত কঙ্কাল হয়ে উঠেছেন। কঙ্কালটার একটা হাত নেই, এই যা।
এবং সেই কঙ্কালের মুন্ডুটা দাঁত কিড়মিড় করে হাসছে আর বরফের চেয়ে ঠান্ডা হাড়ের আঙুলে মুরারিবাবুর লিকলিকে কবজি ধরে আছে। টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।
এই বিজন অরণ্যে কেই বা তাকে বাঁচাবার জন্য আসবে? একেই তো বলে অরণ্যে রোদন। মুরারিবাবুর গলা ভেঙে গেল চ্যাঁচিতে-চ্যাঁচিতে। তখন চুপ করলেন।
বেলিংটন তাকে সেই ফোর্ড গাড়িতে ঢুকিয়ে কালিহাস্য হেসে বললেন, এত ভয় পাচ্ছ কেন বাবু? টেরই পাবে না কিছু। মরার চেয়ে সোজা কাজ আর নেই। তবে তোমার মারা পড়াটা যাতে আরও ঝটপট হয়, সেই ব্যবস্থা করতেই তোমায় গাড়িতে ওঠালাম। চুপ করে বসে থাকো।
বাঁ-হাত মানে হাড়ের হাত কোটের হাতায় ঢাকা রয়েছে এবং হাতের আঙুলগুলো এবার মুরারিবাবুর পিঠ বেড় দিয়ে স্টিয়ারিং ধরেছে। অর্থাৎ মুরারিবাবু বেলিংটনের শরীরের তলায় বন্দি। গাড়ি চলতে শুরু করল।
জঙ্গলের মধ্যে এবড়ো-খেবড়ো কাঁচারাস্তায় ধুলো উড়িয়ে গাড়ি চলেছে। মুরারিবাবু প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়ে অগত্যা চুপচাপ বসে আছেন কুঁজো হয়ে। বড় বেকায়দায় বসে থাকা। দম আটকে যাওয়ার দশা।
কিছুদূর চলার পর জঙ্গল শেষ হল। একটা নদীর ব্রিজ দেখা গেল। কিন্তু কোথাও কোনও লোক নেই। মুরারিবাবু রাগে, দুঃখে ভাবছেন, জেলেরাই বা নদীতে মাছ ধরতে আসেনি কেন আজ? নদীতে কি মাছের অভাব আছে? ওরা এলে মুরারিবাবু চেঁচিয়ে ডাকতেন!
জেলেদের মুণ্ডুপাত করতে থাকলেন মুরারিবাবু।
এবারে দুধারে ধুধু ফাঁকা মাঠ। কোনও রাখালও গরু-উরু চরাচ্ছে না। মুরারিবাবু এবার রাখালদেরও মনে-মনে গালমন্দ করলেন।
এ যেন রূপকথার সেই তেপান্তর। সেকেলে কালো ফোর্ড গাড়িটা চলেছে তো চলেছে। ধুলোর মেঘ জমেছে দুপাশে। ঠা-ঠা রোদ্দুর তেপান্তরে ছড়িয়ে রয়েছে উজ্জ্বল সোনার মতো। নাকি কসর-ঘণ্টার মতো। যেন ছুঁলেই ঢং করে বেজে উঠবে। নীল আকাশটা দেখাচ্ছে তপ্ত কড়ার মতো গনগনে।
হঠাং মুরারিবাবু দেখলেন, কখন দুপাশের পাদানিতে কারা এসে দাঁড়িয়েছে। ওরে বাবা! এরাও যে কঙ্কাল! কিন্তু বেলিংটনের মতো পোশাক পরা নয়। তার মানে এরা দিশি ভূত। পাদানিতে দাঁড়িয়ে দিব্যি গাড়ি চড়ার সুখ মিটিয়ে নিচ্ছে বুঝি! নির্ঘাত এরা কলকাতার ট্রাম-বাসে চড়ে আপিস যেত ইহকালে। তারা জানালায় মুন্ডু বাড়িয়ে হি-হি করে হাসছে আর মুরারিবাবুকে দেখছে। মুরারিবাবু কাঠ হয়ে বসে আছেন। দিনদুপুরে এ কী দুঃসাহস ব্যাটাদের!
দিশি ভূতের কঙ্কালগুলো এবার সায়েবকে বলতে শুরু করল,–এঁ কেঁ স্যাঁর? কাঁকে নিঁয়ে যাঁচ্ছেন স্যাঁর?
বেলিংটন হেসে ভাঙা বাংলায় জবাব দিলেন, ব্যাবু টোমাডের একজন সঙ্গী হবে। আইস, টোমরাও আইস। মজা ডেকিবে।
এই শুনে ওরা আরও হিঁ হিঁ করে হাসতে থাকল। কেউ-কেউ বলল,–খুঁব ভাঁলো হঁবে। খুঁব ভাঁলো হঁবে।
একজন বলল,–দেঁরি কঁরছেন কেঁন স্যাঁর?
আরেকজন বলল,–ওঁকে কোঁথায় নিঁয়ে গিঁয়ে ঘাঁড় মঁটকাবেন স্যাঁর?
বেলিংটন বললেন, সবুর, সবুর। এট্রো টাড়া কেন আসে? (এত তাড়া কেন আছে?) হামি ব্যাবুকে হামার কোবোরে নিয়ে যাসসে। সেখানে নিয়ে যাবে। টারপর ইহার গোলা টিপে মারবে।
