এক কঙ্কাল বলল, নাঁ স্যাঁর! ওঁর ঘাঁড় মঁটকাবেন। নাঁ পাঁরেন তোঁ আঁমাদের হাঁতে ছেঁড়ে দেঁবেন। এঁ কাঁজটা আঁমরা ভঁলো পাঁরি।
বেলিংটন হাসতে-হাসতে বললেন,–হাঁ! টোমরা নেটিভ (দিশি) আসে। টোমরা ওভাবে মারটে পারে। হামরা ইংলিশ আসে, হামরা অন্যভাবে মারবে।
তার মানে, ঘাড় মটকানোটা দিশি ভূতের ব্যাপার। বিলিতি ভূত যখন, তখন তার ব্যাপারটা অন্যরকম হবেই। কিন্তু বেলিংটন মুরারিবাবুকে তার কবরে নিয়ে যাচ্ছেন বললেন। তাহলে কি কেষ্টনগরে যে সায়েবদের কবরখানা আছে, সেখানেই তার কবর? মুরারিবাবু এসব কথা ভেবে একটু সাহস পেলেন। কেষ্টনগরের ধারে কাছে যেতে পারলে বাঁচার একটা উপায় মিলতে পারে। লোকজন তো সেখানে প্রচুর আছে, শহর জায়গা। রোসো সায়েব, তোমায় মজা দেখিয়ে ছাড়ব। আজকালকার দিশি মানুষগুলোকে তো চেনো না। ভাবছ, তোমাদের সেই ব্রিটিশ আমলের জিনিস। সায়েব দেখলেই ভয় পাবে? তখন একটা-দুটো ক্ষুদিরাম ছিল। এখন অজস্র ক্ষুদিরাম। একালের ছেলেরা কী ডানপিটে, তা টের পাওনি কিনা!
কিন্তু বেলিংটনের কথা শুনে দিশি ভূতগুলো তখন নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে ইশারায় যেন কী পরামর্শ করে নিল। তারপর একজন বলে উঠল, স্যাঁর, আঁমাদের এঁকটা কঁথা আঁছে।
–কী কোঠা আসে?
–আঁমরা আঁমাদের দেশের লোককে নিজের হাতে মারব। আঁপনাকে মারতে বে না।
বেলিংটন হেসে বললেন,–ও! প্যাট্রয়টিজম (দেশাত্মবোধ)?
সেই সময় দুধারে মাঠ থেকে দলে দলে আরও কঙ্কালকে দৌড়ে আসতে দেখলেন মুরারিবাবু। তারা চ্যাঁচিতে-চ্যাঁচিতে আসছিল, কী রেঁ? কীঁ, কীঁ কীঁ?
তারপর তারা এসে কেউ বনেটে কেউ ছাদের ওপর বসে পড়ল। গাড়ির ওপরে কঙ্কাল, দুই পাদানিতে কঙ্কাল, ইঞ্জিনের ওপর কঙ্কাল। মুরারিবাবু এবার একটু সাহস পেয়েছেন। হাজার হলেও এরা তার দিশি ভাই। ভারতীয় ভূত। এই বিধর্মী সায়েব-ভূতের কবল থেকে এরা কি তাকে বাঁচাবে না?
অন্তত বেলিংটনের হাত থেকে উদ্ধার হতে পারলে এই দিশি ভাই-বন্ধুদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে পৈতৃক প্রাণটা রক্ষা করার একটা আশা জেগে উঠল মুরারিবাবুর মনে। ভাবলেন, গতিক বুঝলে বরং একখানা গরম-গরম বক্তৃতা দেবেন। তাতে দেশপ্রেমের কথা প্রচুর থাকবে।
হ্যাঁ, বিবেকানন্দের সেই প্রখ্যাত উক্তি জুড়ে দেবেন বক্তৃতায়। চণ্ডাল ভারতবাসী, মুখ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী আমার ভাই…..
আচমকা সেই সময় একটা তুমুল হুলুস্থুল ঘটে গেল।
মুরারিবাবুকে কঙ্কালগুলো খামচে ধরে গাড়ি থেকে বের করার জন্যে টানছে বেলিংটন স্টিয়ারিং সামলাবেন, না বন্দিকে ধরে রাখবেন ঠিক করতে পারছেন না এবং গাড়ি এদিক-ওদিক টলেটলে চলছে। তুমুল চ্যাঁচিমেচিও হচ্ছে। নাকিস্বরে স্লোগান হাঁকতে শুরু করেছে ছাদের ওপর একদল কঙ্কাল
–বেঁলিংটন! ভাঁরত ছাঁড়ো!
–আঁভি ছোঁড়ো, জঁলদি ছোঁড়ো!
–গঁলা টেঁপা…
–চঁলবে না, চঁলবে না।
–মুঁরারিবাবু!
–জিঁন্দাবাদ, জিঁন্দাবাদ!
সেই তুলকালাম হট্টগোলের মধ্যে গাড়িটা ঘুরে গেল। পাশে গভীর খাদ। এবং মুরারিবাবু ভয়ে চোখ বুজেই টের পেলেন ঠান্ডা-ঠান্ডা হাড়ের হাতে দিশি ভূতেরা তাঁকে গাড়ি থেকে বের করল।
তারপর তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে মাঠের দিকে দৌড়ে চলেছে ওরা। সেই অবস্থায় একটা প্রচণ্ড আওয়াজে বুঝলেন, বেলিংটনের গাড়ি সেই অতল খাদে পড়েছে।
মুরারিবাবু ভয়ে-ভয়ে চোখ খুললেন। খুলেই বন্ধ করলেন। শুনলেন, কে তাকে ডাকছে, মামা, মামা! ও মামা!
ফের চোখ খুলে দেখলেন–বীরু। ফিসফিস করে বললেন, আমি কোথায়?
আবার কোথায়?–বীরু বলল। সেবারকার মতো হাসপাতালে।
মুরারিবাবু ওঠার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। পাদুটো যেন বেঁধে রেখেছে। বললেন, আমার কী হয়েছিল বল তো?
বীরু বলল,-আবার কী হবে? অ্যাকসিডেন্ট করে কল্যাণীর মাঠে পড়েছিলেন। সেখান থেকে লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। ডাক্তার বলছেন, কয়েক জায়গায় হাড় ভেঙে গেছে। প্লাস্টার বেঁধে মাস চারেক পড়ে থাকতে হবে বিছানায়।
মুরারিবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,–গাড়িটা?
বীরু জানাল, গাড়িটা চুরমার হয়েছে। ভাগ্যিস মুরারিমামা গতিক বুঝে সঙ্গে-সঙ্গে লাফ দিয়ে পড়েছিলেন। গাড়িটা নয়–গাড়ির হাড়গোেড় ট্রাকে চাপিয়ে আনতে গেছেন ভোঁদা মিত্তির।
ম্যাজিশিয়ান-মামা
টুকাই তার বন্ধু কুট্টুসের কাছ থেকে একটা ভূতের গল্পের বই পড়তে নিয়েছিল। সারা বিকেল খেলার মাঠের শেষ দিকটায় নিরিবিলি ঝিলের ধারে বসে বইটা যখন শেষ করে ফেলল, তখন দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। খেলুড়েরা কখন চলে গেছে খেলা শেষ করে। ঝিলের ঘাটে যে ধোপা কাপড় কেচে শুকোতে দিয়েছিল, সেও তার গাধাটার পিঠে কাপড়ের বোঁচকা চাপিয়ে চলে যাচ্ছে। টুকাইয়ের এবার গা ছমছম করছিল। সে উঠে পড়ল।
কুট্টুসের কাছে অনেক ভূতের গল্পের বই আছে। টুকাই ভাবল বইটা ফেরত দিয়ে আরেকটা চেয়ে নেবে। কিন্তু এসব বই পড়ে এই সন্ধেবেলা বড্ড ভয় করে যে? কুট্টুসদের বাড়িটা আবার নিরালা জায়গায়, শহরের একটেরে। পেছনে একটা কবরখানাও আছে। সায়েবি আমলের। কুট্টুস সায়েব ভূতগুলোর কত গল্প না শুনিয়েছে। দোনামনা করে টুকাই এদিক-ওদিক তাকাতে-তাকাতে খেলার মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছুল। রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। লোকজন হাঁটাচলা করছে। টুকাইয়ের ভয়টা চলে গেল তাই দেখে। সে কুট্টুসদের বাড়ির দিকে চলতে লাগল।
