নাকি সায়েবরা শীতপ্রধান বরফ পড়া দেশের লোক বলেই তাদের শরীর এমন ঠান্ডা হয়? মুরারিবাবু জীবনে কোনও সায়েবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেননি।
সায়েবের পিছু-পিছু বাংলোর অন্য ঘরটায় ঢুকে দেখেন, টেবিলে পুরোনো ছেঁড়া একটা ঢাকনা। তার ওপর চমৎকার লোভনীয় খাবার সাজানো আছে। স্যান্ডউইচ, ডিমের অমলেট, কলা, আপেল, আঙুর পর্যন্ত! একটা প্লেটে সন্দেশ দেখে অবাক হলেন মুরারিবাবু। তাহলে সায়েবরাও সন্দেশ খায়! পটে সম্বত কফি রয়েছে। আঃ, মুরারিবাবুর নোলায় জল এসে গেল।
নাঃ, সায়েব ভূত হতে পারে এবং তোক না ভূত, কী ক্ষতি। কিন্তু খাবারগুলো মোটেও ভুতুড়ে নয়। রীতিমতো সুস্বাদু। জটিলের হাতের সেঁকা আর পচা মাখন মাখানো টোস্ট, বাদুড়চোষা কলা আর কুকুরের কানের মতো শক্ত অমলেট খেয়ে মুরারিবাবুর ঘেন্না ধরে গেছে। আর আঙুর, এমন মিঠে রসে টইটম্বুর আঙুর খেতে পাওয়া কি সহজ কথা?
হুঁ, কফিই বটে। তারিয়ে-তারিয়ে খাচ্ছেন মুরারিবাবু। আর যতটা সাধ্য, ইংরিজিতে দেশের হালচাল নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। সায়েব কিন্তু কোনও জবাবই দিচ্ছেন না। শুধু ঠোঁটের কোণায় হাসি রয়েছে, এই যা!
একসময় মুরারিবাবু বললেন, স্যার! আই থিংক, দ্যাট কার ইজ ইওর্স?
সায়েব মাথাটা দুলিয়ে বললেন,–ও, ইয়েস ব্যাবু।
এবার মুরারিবাবু গাড়িটা কীভাবে ভোঁদা মিত্তিরের কাছে কিনেছেন, কীভাবে ওটার যত্নআত্যি করেন–তা বললেন। তারপর ফের জানতে চাইলেন, রোজ রাতে গাড়ি চেপে সায়েব কোথায় যান এবং ফিরে আসেন?
সায়েব একটু হেসে জবাব দিলেন, আই কাম হিয়ার এভরি নাইট।
–হোয়াই স্যার?
–ও ব্যাবু, দ্যাটস এ লং স্টোরি।
লম্বা কাহিনি! ঠিক আছে। মুরারিবাবু না শুনে ছাড়বেন না। সাগ্রহে বললেন, প্লিজ টেল মি, স্যার।
এরপর সায়েব বা সায়েব-ভূত যা বললেন, তা সংক্ষিপ্তভাবে এই রকম,
সায়েবের নাম রবার্ট বেলিংটন। এই বাংলোটা ছিল তাঁরই। পিছনে নদী আছে। আজ থেকে ষাট বছর আগে এর চেয়ে বেশি জঙ্গল ছিল এখানে। কেউ আসতে সাহস করত না এই এলাকায়। শিকার করার নেশা ছিল বেলিংটন সায়েবের। তাই এখানে বাংলোটা বানিয়েছিলেন। মাঝে-মাঝে এসে থাকতেন। বিয়ে-টিয়ে করেননি। ওই ফোর্ড গাড়িটা চেপেই আসতেন বাংলোয়। একবার কলকাতা ফেরার পথে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। রাস্তা কাঁচা ছিল তখন। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। চাকা পিছলে গাড়িটা পাশের খাদে কাত হয়ে পড়ে। সায়েব বেঁচে যান। কিন্তু ডান হাতটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর বাঁ-হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালাতেন। কোনও অসুবিধে হতো না। বাংলোয় এসে রাত কাটাতেন আগের মতো।
একবার হল কী, অভ্যাসমতো কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়েছেন বেলিংটন। অন্ধকার রাত। কেষ্টনগরের কাছাকাছি এসে চাঁদ উঠল। সেই চাঁদের আলোেই গণ্ডগোলটা বাধিয়ে ফেলল। চকচকে রাস্তা ভেবে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছেন জোরে আর ব্যস! ফের পড়েছেন গভীর খাদে। কিন্তু এবার আর শুধু একটা হাতের ওপর দিয়ে গেল না। পুরো শরীরের ওপর দিয়েই গেল।
তার মানে? তার মানে বেলিংটন মারা পড়লেন।
হ্যাঁ, মারা না পড়লে ভূত হলেন কেমন করে? মুরারিবাবু এবার কিছু প্রশ্ন ইংরিজিতে জিগ্যেস না করে পারলেন না। তার প্রশ্ন এবং সায়েবের জবাব বাংলায় এই রকম,–
–আচ্ছা স্যার, ভূত তো হলেন। কিন্তু কেমন লাগে-টাগে একটু বলবেন?
–কেমন লাগে মানে? দারুণ ভালো লাগে। যা খুশি খেতে ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়। বাবু, খাওয়ার মতো সুখ কি পৃথিবীতে আছে? যদি ইচ্ছে করে, এখনই তাজিকিস্তানের আঙুরকুঞ্জের টাটকা আঙুর খাব, সঙ্গে-সঙ্গে এসে যাবে। দেখবে নাকি?
বলে বেলিংটন চোখ বুজে কী বিড়বিড় করলেন, অমনি সবিস্ময়ে মুরারিবাবু দেখলেন টেবিলে ঝুপ করে সদ্য ডালভাঙা একগুচ্ছ আঙুর এসে পড়ল। সায়েব টুক টুক করে ভেঙে খেতে-খেতে বললেন,–ইট ব্যাবু, ইট। খাও বাবু, খাও।
সাহস করে হাত বাড়িয়ে মুরারিবাবুও গালে পুরতে থাকলেন। আহা! কী অপূর্ব স্বাদ! চাঁদনি বা নিউ মার্কেটের আঙুর তো খেয়ে দেখেছেন। টক ভাবটা থাকবেই,
সে তুমি যত দাম দিয়ে কেননা আর এ আঙুর কী মিঠে, কী রসালো!
আঙুর খেতে-খেতে সায়েব বললেন,–দেখলে তো, মরে ভূত হওয়ার কত সুখ?
মুরারিবাবু রিফ করে বললেন,–আচ্ছা স্যার, যদি বাগবাজারের রসগোঙ্গা খেতে চাই?
–তুমি চাইলে তো হবে না বাবু। তুমি জ্যান্ত মানুষ। আমি চাইলেই পেয়ে যাব। ইচ্ছে করলেই হল।
নোলায় জল নিয়ে মুরারিবাবু বললেন, ইচ্ছে করুন না স্যার।
সায়েব চোখ বুজে ফের বিড়বিড় করা মাত্র কে যেন অদৃশ্যহাতে মুখে শালপাতা আঁটা একটা মাটির সরা সাবধানে টেবিলে রাখল। মুরারিবাবু শালপাতা ছিঁড়ে ফেলতে দেরি করলেন না। আঃ, অপূর্ব! খাসা! ডাগর-ডাগর শ্বেতশুভ্র রসালো রসগোল্লা ভরা রয়েছে সরাটায়। সায়েবের মুখের দিকে তাকিয়ে মুরারিবাবু বললেন, খাব স্যার?
–আলবত খাবে। খেলে তবেই তো বুঝবে মরে ভূত হওয়ার কী আনন্দ!
মুরারিবাবু গালে পুরলেন। মহানন্দে মুখ নেড়ে চিবুতে থাকলেন। মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। এবার সায়েবকে বলেকয়ে বর্ধমানের সীতাভোগ আর মিহিদানা আনাতে পারলে জীবন ধন্য হয়। বললেন, সত্যি বটে স্যার। স্বীকার করছি, মরে ভূত হওয়ার বড় আনন্দ। কোনও দায় নেই, ঝক্তি নেই, আপিস দৌড়াদৌড়ি, ট্রাম-বাসে ঝুলোঝুলি ঠেলাঠেলি-গুঁতোগুতি নেই, রোজগারের ধান্দায় মুখ চুন করে ঘুরে বেড়ানো নেই শুধু খাও আর খাও। খেয়েদেয়ে ঘুমাও। আবার উঠে খাও। খেয়ে বেড়াতে বেরোও।
