ঘরের কোণায় একটা আয়না বানো টেবিল। একটা সেকেলে ঢাউস আরামকেদারা, রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে যেমন থাকে।
আর দেয়ালে একটা মস্ত ঘড়ি। ঘড়ির দোলকটা টকটক শব্দ করে দুলছে। বাজছে সাড়ে সাতটা।
এবার সব মনে পড়ল মুরারিবাবুর। রাতের সেই অত্যত দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা স্পষ্ট ভেসে উঠল চোখের সামনে। কিন্তু এখন উজ্জ্বল রোদে ভরা সকালের পৃথিবীতে তিনি অনেক সাহসী হয়ে উঠেছেন। তাই গটগট করে হেঁটে দরজা খুলে বেরোলেন। আশ্চর্য ব্যাপার এই দরজাটা ভেতর থেকেই বন্ধ ছিল। কে বন্ধ করেছিল?
বেরিয়ে বুঝলেন, রীতিমতো জঙ্গলের মধ্যিখানে এটা একটা ডাকবাংলো। একটা কাঠের ফলকে লেখা আছে–মোহনপুর ফরেস্ট বাংলো।
সর্বনাশ! মোহনপুর ফরেস্ট! কোথায় কলকাতা, কোথায় কল্যাণী, আর কোথায় তাকে আনা হয়েছে? এ একেবারে কেনগর এলাকায় এসে পড়েছেন, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি বললেও চলে।
মোহনপুর ফরেস্টের কথা কতবার শুনেছেন মুরারিবাবু। এটা নাকি সরকারি অভয়ারণ্য। হরিণ-টরিণও আছে। হরিণ থাকলে বাঘ থাকবে না, তা কি হয়? আর বাঘ যদি থাকে, ভাল্লুকই বা থাকবে না কেন? কথায় বলে না বাঘ-ভাল্লুক?
তবে মুরারিবাবু এবার তার ভুতুড়ে কালো রঙের খুদে ফোর্ড গাড়িটাও দেখতে পেয়েছেন। ঘাস আর আগাছায় ভরা লনের কোণায় একটা গাছের তলায় গাড়িটা রয়েছে। দেখেই হনহন করে এগিয়ে গেলেন কাছে।
গাড়িটা দিনের আলোয় দিব্যি ভালোমানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কোনও দুষ্টুমি বা ভূতে পাওয়া বদমাইশির বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই।
যেন ছুঁলেই ফোঁসকা পড়বে, এমন সাবধানি ভঙ্গিতে মুরারিবাবু তার গায়ে হাত ঠেকালেন। বুঝে নিলেন, স্বপ্ন না সত্যি।
জ্বলজ্যান্ত সত্যি। হ্যাঁ–দিনের বেলা গাড়িটার ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার থাকে না। অতএব চালিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধে হবে না।
মুরারিবাবু উঠে বসে স্টার্ট দিতে চেষ্টা করলেন। স্টার্ট নিল না। কয়েকবার চেষ্টার পর তেলের কাটার দিকে চোখ পড়তেই চমকালেন। একফোঁটা তেল নেই গাড়িতে। তাহলে উপায়? তাকে এই জঙ্গল থেকে পায়ে হেঁটে বেরুতে হবে ভেবে ভাবনায় পড়ে গেলেন। মনে-মনে সেই অশরীরী ড্রাইভারকে গালমন্দ করতে থাকলেন। সবটুকু তেল পুড়িয়ে খামোকা এই জঙ্গলে বাংলোয় তাকে নিয়ে আসার কোনও মানে হয়? আরে বাবা, এতই যদি গাড়ি চালানোর শখ, তাহলে সোজা কলকাতা নিয়ে গিয়ে তুললি নে কেন?
পরক্ষণে মনে পড়ে গেল, অশরীরী ড্রাইভারটা যে রীতিমতো সায়েব! তখন মুরারিবাবু মুখ ফুটে তার উদ্দেশে ইংরিজিতে বলে উঠলেন,–গো টু হেল! ইউ স্টুপিড ঘোস্ট!
অমনি বাংলোর বারান্দা থেকে আওয়াজ এল, হ্যাল্লো ব্যাবু! গুড মর্নিং। হাউ ডু য়ু ডু?
তারপর মুরারিবাবু ছানাবড়া চোখে দেখলেন, এক বুড়ো লালমুখো সায়েব বগলে টুপি আর হাতে ছড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন।
মুরারিবাবুর সব সাহস পিদিমের মতো ফস করে নিভে গেল। কাঁপাকঁপা গলায় বললেন,-গুড মর্নিং স্যা-স্যার।
–আর য়ু অলরাইট ব্যাবু?
–ই-ইয়েস স্যা-স্যার।
–দেন প্লিজ কাম। দা ব্রেকফাস্ট ইজ রেডি। য়ু আর মাই অনারেবল গেস্ট।
বলে কী! আমি ওর সম্মানিত অতিথি! সকালের খানা খেতে ডাকছে যে! মুরারিবাবু ভাবনায় পড়ে গেলেন। ওই সায়েবই যে রাতের সেই অশরীরী ড্রাইভার, তাতে কোনও ভুল নেই। তার মানে এখন মুরারিবাবু দিনদুপুরে একটি জলজ্যান্ত সায়েব ভূতকে দেখতে পাচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে তাঁর ইংরেজিতে বাক্যালাপও হচ্ছে। কিন্তু ভূতের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট খাওয়া? ওরে বাবা!
কে জানে কী খাওয়ার আয়োজন করেছে। সায়েব হোক, আর দিশি হোক, ভূত ইজ ভূত। ভূতরা ভুতুড়ে খাবারই খাবে। তাদের হজম হবে বা সুস্বাদু লাগবে বলে মানুষেরও হজম হবে বা সুস্বাদু লাগবে–এমন কথা নেই। পেটের গণ্ডগোল হওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্বাদটাও বিচ্ছিরি না হয়ে পারে না।
তার দেরি হচ্ছে দেখে সায়েব হাত নেড়ে ফের ডাকলেন কাম বাবু, কাম! প্লিজ ডোন্ট হেজিটেট।
তার মানে, চলে এসো সটান, দ্বিধা কোরো না। এভাবে যখন ডাকছেন, তখন যাওয়া যাক না। খিদেও তো পেয়েছে। সেই কাল বেলা দুটোয় রাধাকান্তবাবুর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া হয়েছে। প্রায় সতেরো ঘণ্টা যাবৎ পেটে দানাপানি পড়েনি।
আর ভয়টা কীসের? কাল রাতে নির্জন রাস্তায় ইচ্ছে করলেই তো সায়েব ভূত ঘাড় মটকাতে পারত। মটকায়নি। এই দিনের বেলা আর ঘাড় মটকাবার সাহস কি হবে ওর? অতএব যাওয়া যাক। ভূতের খাবার চেখেও দেখা যাক। এ বরং এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে জীবনে।
মুরারিবাবু গটগট করেই হেঁটে গেলেন হাসিমুখে। বারান্দায় উঠে হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেক করার জন্যে!
সায়েব কিন্তু তার ছড়িধরা বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। তখন মুরারিবাবু দেখলেন, ওঁর ডান হাতটা কাটা। কোটের শূন্য হাতাটা ঝুলছে কাঁধ থেকে। কিন্তু অদ্ভুত কায়দায় ওই হাত দিয়েই টুপিটা বগলদাবা করে রেখেছেন।
এবার ছড়িটা বগলদাবা করে হ্যান্ডশেক করলেন। মুরারিবাবুর মনে হল প্রচণ্ড ঠান্ডা এক টুকরো বরফ তাকে কিংবা তিনিই বরফের টুকরোটাকে আঁকড়ে ধরেছেন।
হাত ছাড়াছাড়ি হয়ে কিছুক্ষণ মুরারিবাবুর হাত নিঃসাড় হয়ে রইল। ঠান্ডায় রক্ত যেন জমে গেছে।
