মুরারিবাবু মনের সুখে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
কল্যাণী পৌঁছতে ঘণ্টা দেড়েকও লাগল না।
প্রথমে কিছুক্ষণ বিশাল এলাকায় অজস্র রাস্তা দিয়ে চক্কর মেরে বেড়ালেন। কখনও কোনও গাছতলায় থেমে উদাসমনে দিগন্ত দেখতে থাকলেন। গুনগুন করে গান গাইতেও ছাড়লেন না।
দুপুর নাগাদ খিদে পেলে তখন রাধাকান্তবাবুর বাড়ি চললেন।
বাড়িটা তার চেনা। পিছনে ফাঁকা বিশাল মাঠের ওপাশে গঙ্গা! একটেরে ভারি সুন্দর জায়গায় বাড়ি করেছেন রাধাকান্তবাবু। মুরারিবাবুর অফিসের সহকর্মী ছিলেন ভদ্রলোক। একই সঙ্গে অবসর নিয়েছেন চাকরি থেকে। গোলমাল হইচই পছন্দ করেন না বলে এবং কম দামে জমি পেয়ে এতদূরে বাড়ি করেছেন।
দুই বন্ধুতে প্রচুর সুখদুঃখের কথা হল। আহারাদিও হল ভালোরকমের। তারপর বিকেলে গাড়ি চাপিয়ে রাধাকান্তবাবু এবং তার বাড়ির সবাইকে সারা এলাকা ঘোরালেন।
রাধাকান্তাবাবু তাঁকে রাতে থেকে যেতে বলবেন, সে তো জানা। কিন্তু মুরারিবাবু খেয়ালি এবং গোধরা মানুষ বরাবর।
হঠাৎ মাথায় ঝোঁক চেপে গেল, কলকাতা ফিরবেন।
তখন সন্ধে হয়ে আসছে। সাড়ে ছটা বাজে। রাধাকান্তবাবু পথে ডাকাতের ভয় দেখিয়েও কাবু করতে পারলেন না মুরারিবাবুকে।
মুরারিবাবু বেরিয়ে পড়লেন।
কাঁচরাপাড়া পৌঁছতে বড়জোর আধঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলেন, সম্ভবত রাস্তা ভুল করে ফেলেছেন। দুধারে বিরাট সব গাছ! ফাঁকা মাঠের মধ্যে দূরে-দূরে কোনও বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা কী?
আন্দাজ করে এগিয়ে এক জায়গায় বাঁ-দিকে মোড় নিলেন।
কিন্তু চলেছেন তো চলেছেন। সেই দুধারে বড়-বড় গাছ, ফাঁকা মাঠ এবং আলোজুলা বাড়িগুলো এবার অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে।
আবার ডাইনে ঘুরলেন। এ-রাস্তার ধারে কোনও ল্যাম্পপোস্টই নেই। ঘন অন্ধকার জমেছে ততক্ষণে। হেডলাইটের আলোয় শুধু ঝোঁপঝাড় আর মাঝে-মাঝে ইটখোলা ভেসে উঠছে। কিন্তু কোথাও জনপ্রাণীর দেখা নেই। ঘড়ি দেখলেন, আটটা বাজছে।
এবার একটু অস্বস্তি হল মুরারিবাবুর। দূরে একটা আলো-জ্বলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। সেদিকেই এগিয়ে চললেন। বাড়িটা ওই রাস্তার ধারে বলেই মনে হচ্ছিল।
কিন্তু যত যাচ্ছেন, বাড়িটার দূরত্ব যেন একই থেকে যাচ্ছে। স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছেন গাড়ির। মনে হচ্ছে, ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইলেরও বেশি গতি, এ গাড়ির পক্ষে এই গতিই চরম! ইঞ্জিন গরম হয়ে উঠেছে। হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে গেলে বিপদে পড়তে পারেন। তাই একটু সংযত হলেন মুরারিবাবু।
তারপর হঠাৎ একসময় একটা ব্যাপার তিনি টের পেয়ে শিউরে উঠলেন।
গাড়িটা আর যেন তার আয়ত্তে নেই। আপনা-আপনি চলছে। স্পিড কমাতে গিয়ে টের পেলেন, কমল না।
ব্রেক কষলেন ভয় পেয়ে। আশ্চর্য, ব্রেক কষা গেল না।
স্টিয়ারিংটাও যেন অন্য কেউ ধরে আছে। কারণ, সামনে বাঁক দেখে তিনি ঘোরাবার জন্য তৈরি হতে না হতে স্টিয়ারিং নিজে থেকে ঘুরতে শুরু করল। তখন আঁতকে উঠে হাত সরিয়ে নিলেন।
আশ্চর্য এবং আশ্চর্য! পরমাশ্চর্য! স্টিয়ারিং যেখানে যেমন ঘোরার ঘুরছে। কোথাও গাড়িটা ধাক্কা খাচ্ছে না।
তারপরই ঘটল আরও অদ্ভুত ব্যাপার। আচমকা একটা ব্রিজের আগে ভাঙাচোরা জায়গায় গাড়িটার ব্রেক আপনা-আপনি শব্দ তুলে গতি সামলানো হল এবং জায়গাটা পেরিয়ে ব্রিজে ওঠার পর ঘ্যাঁচ করে গিয়ার টানার শব্দ উঠল। মুরারিবাবু গিয়ারেও হাতটা ঠেকাননি। অথচ…।
মুরারিবাবুর শরীর হিম হয়ে গেল।
তবু মাথা ঠান্ডা রেখে বসে রইলেন। স্টিয়ারিং, ব্রেক, গিয়ার আয়ত্তে আনার শেষ চেষ্টা করলেন। পারলেন না। যেন কোনও অদৃশ্য ড্রাইভার তাঁরই জায়গায় বসে গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এমনি ভয় পেয়ে বাঁদিকে সরে গিয়ে বসলেন। ড্রাইভারের জায়গা ফাঁকা রইল।
আর অশরীরী সেই ড্রাইভার স্টিয়ারিং দরকারমতো ঘুরিয়ে এবং গিয়ারে মাঝে মাঝে শব্দ তুলে গাড়িটাকে নিয়ে চলল কোথায়?
মুরারিবাবুর মাথা ঝিমঝিম করছিল। হঠাৎ দেখলেন, সামনে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে এতক্ষণে। তারপর দেখলেন, এটা একটা লরি। প্রচণ্ড বেগে আসছে। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তার আলোয় মুরারিবাবু দেখতে পেলেন, স্পষ্ট দেখলেন–স্টিয়ারিংয়ের সামনে তাঁর পাশে মাত্র এক ফুট তফাতে কে যেন বসে আছে। তার মুখে দাড়িগোঁফ আছে যেন। আর পোশাকটা বিলিতি বলেই মনে হল। মুখটা লালচে রঙের। এবং সেই অশরীরী ড্রাইভার যে একজন সায়েব, তাতে কোনও ভুল নেই।
মুরারিবাবুর আর মাথার ঠিক রইল না। গোঁ-গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
মুরারিবাবু যখন চোখ মেলে তাকালেন, তখন সকাল হয়েছে। অভ্যাসমতো তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসলেন।
তারপর অবাক হয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন, নিজের ঘরেই ঘুমোচ্ছিলেন আজ উঠতে বেলা হয়ে গেছে, এই যা। ঘুম থেকে তুলে দেয়নি বলে জটিলকে একচোট নেবেন ভেবে পা বাড়াতেও যাচ্ছিলেন।
কিন্তু, ও হরি! এ তো তাঁর নিজের ঘর নয়। জানলা দিয়ে বাইরের যতখানি নজরে আসছে, মনে হচ্ছে খুব জঙ্গুলে জায়গা। পাখপাখালি ডাকছে। গাছপালাও দেখা যাচ্ছে খুব ঘন। আর ঘরের ভেতর কেমন একটা পুরোনো-পুরোনো ভাব। প্রকাণ্ড লোহার খাটের ওপর পুরু নারকেল ছোবড়ার গদি, তার ওপর ছেঁড়াখোঁড়া তোক এবং তার ওপর পাতা চাদরটাও ময়লা। মুরারিবাবু উল্টে-পাল্টে দেখে নিলেন। বিকৃত মুখে বসে রইলেন। ছ্যা-ছ্যা!
