রাত বারোটা নাগাদ বিছানায় গড়িয়ে সবে চোখ বুজেছেন, হঠাৎ মনে হল, নিচে চাপা গরগর শব্দ হচ্ছে। তখন চোখ খুলে কান পাতলেন মুরারিবাবু।
ভাবলেন, রাস্তায় কোনও গাড়ি যাচ্ছে, তারই শব্দ।
কিন্তু শব্দটা তো দূরে সরে যাচ্ছে না।
তারপর ক্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁচ এবং ঘটঘট্টাং…গেট জোরে আচমকা খুললে যেমন শব্দ হয়।
তখন বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলেন মুরারিবাবু। গাড়িচোর নয় তো? তক্ষুনি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।
উঁকি মেরেই অবাক হলেন মুরারিবাবু।
গ্যারেজের গেট খুলে গেছে এবং তাঁর গাড়িটা বেরিয়ে উঠোনে এগিয়েছে এবং পিছিয়ে যাচ্ছে বাড়ির বড় গেটের দিকে। তারপর বড় গেটটা খুলে গেল। ঘট ঘট্টাং…ঘং ঘং ঘং…
গাড়ি সেখানে যাওয়ার পর মুরারিবাবুর মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরুল। হেঁড়ে গলায় প্রচণ্ড চেঁচিয়ে উঠলেন,–চোর! চোর! চোর!
দেখতে-দেখতে হুলুস্থুল-হইচই শুরু হয়ে গেছে। বীরু আর জটিল দৌড়ে এসেছে এবং কিছু না বুঝেও মুরারিবাবুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে চ্যাঁচিতে শুরু করেছে,–চোর! চোর! চোর!
মুরারিবাবু ততক্ষণে টের পেয়েছেন, শুধু চোর বলাটা ঠিক হচ্ছে না। অমনি চ্যাঁচিতে থাকলেন,–গাড়িচোর! গাড়িচোর! গাড়িচোর!
জটিল শুনল বাড়িচোর। সে বাজখাঁই আওয়াজে পাড়া মাথায় করে চ্যাঁচিতে শুরু করল, বাড়িচোর! বাড়ি চুরি করে পালাচ্ছে।
প্রতিবেশীরাও ঘুম ভেঙে যে যার ঘর থেকে চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন। জটিলের চিৎকার জোরে শোনা যাচ্ছে এবং বাড়িচোর শুনে তারাও বলছেন,-বাড়িচোর! বাড়ি চুরি করে পালাচ্ছে-এ-এ-এ!
আশেপাশের বাড়ি এবং ক্রমে সারা পাড়া থেকে লোকেরা বেরিয়ে পড়ল। লাঠিসোটা কাটারি বঁটি কয়লা ভাঙা হাতুড়ি–যে যা পেরেছে নিয়ে বেরিয়েছে। একজনের হাতে ক্রিকেট ব্যাটও দেখা গেল।
ততক্ষণে সাহস পেয়ে মুরারিবাবু নিচে নেমেছেন। হ্যাঁ, বড় গেট বন্ধ। গ্যারেজের গেটও বন্ধ। তালাও আটকানো আছে। আর গাড়ি?
কী মুশকিল। গাড়িটাও তো আছে। বহাল তবিয়তে আছে। যেমন রেখেছিলেন, তেমনি।
তাহলে কী দেখলেন তখন? স্বপ্ন?
অসম্ভব। মুরারিবাবু দিব্যি জেগে ছিলেন এবং ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
গতিক বুঝে চেপে গেলেন মুরারিবাবু।
সবার প্রশ্নের জবাবে বললেন,–হ্যাঁ, চোর ঢুকেছিল গেট ডিঙিয়ে। ভাগ্যিস আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই ব্যাটা পালাল।
সবাই চোরের কথা আলোচনা করতে করতে যে যার বাড়িতে ফিরে গেল। সত্যি, পাড়ায় আজকাল মাঝে-মাঝে চুরি তো হচ্ছে।
মুরারিবাবু কিন্তু ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছেন না। নিজের চোখকে অবিশ্বাস করবেন কেমন করে?
ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কখন। ঘুম ভাঙল ভোরের দিকে। টেবিলল্যাম্প জ্বেলে অভ্যাসমতো ঘড়ি দেখে নিলেন। চারটে কুড়ি বেজেছে। ঠিক পাঁচটায় বিছানা ছেড়ে ওঠা ইদানীং অভ্যেস। আর চল্লিশটে মিনিট চোখ বুজে কাটাবেন ভাবলেন।
কিন্তু সেই সময় আবার নিচে গরগর শব্দ।
গেট খোলার ক্যাঁ…অ্যাঁ…চ! ঘট…ঘট…ঘটাং! ঘঙ ঘঙ!
লাফিয়ে উঠে ব্যালকনিতে গেলেন মুরারিবাবু। তারপর সবিস্ময়ে দেখলেন, বড় গেট আপনা-আপনি খুলেছিল, সদ্য বন্ধ হচ্ছে এবং তার কালো খুদে ফোর্ড গাড়িটা পিছু হটে গ্যারেজে ঢুকছে। গ্যারেজের গেটও খুলে রয়েছে। গাড়িটা পিছু হটে ভেতরে ঢুকতেই গেট আবার সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি, না সত্যি জেগে আছি? মুরারিবাবু এই ভেবে নিজের চুল টানলেন। না, দিব্যি ব্যথা করছে।
তারপর কান টেনে দেখলেন, হুঁ, কানও ব্যথা করছে।
নিজেকে কাতুকুতু দিলেন। কাতুকুতু এমন জিনিস, না হেসে পার নেই। তাই খিকখিক করে হেসে উঠলেন।
তারপর গম্ভীর হলেন। হাসির কথা নয়। নির্ঘাত তার কোনও গুরুতর অসুখ বিসুখ হয়েছে। মানসিক ব্যাধি যাকে বলে। কোনও সাইক্রিয়াট্রিস্ট বা মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার। হ্যাঁলুখিনেশান বা ভ্রমদর্শন নামে একরকম উল্কট ব্যাধি আছে নাকি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে মানুষ বিস্তর ভুলভাল দেখতে পায়।
অস্বস্তিতে আড়ষ্ট হয়ে উঠলেন মুরারিবাবু।
কিন্তু সকালের উজ্জ্বল আলোয় সেই অস্বস্তিটা নিমেষে চলে গেছে মুরারিবাবুর। রাতের ভুতুড়ে ব্যাপারটা দিনের আলোয় স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছে। স্বপ্নটা বেয়াড়া, এই যা। ডাক্তার-টাতার দেখাতে গেলেই আজকাল হাঙ্গামা। কাড়ি কাড়ি ওষুধ গিলতে হবে। হয়তো বলবেন, হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে মুরারিবাবু!
তাও সাধারণ হাসপাতাল হলে কথা ছিল। মানসিক হাসপাতাল যে কী সাংঘাতিক, তা কি তিনি জানেন না? ওরে বাবা, সেখানে যত রাজ্যের পাগল থাকে।
মুরারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে গ্যারেজে গেলেন। বীরু ও জটিলকে বলে গেলেন, কল্যাণী যাচ্ছি। কল্যাণীতে রাধাকান্তর বাড়িও একবার যেতে পারি। বুঝলি বীরু? অনেকদিন দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। যদি দেখিস, সন্ধ্যা নাগাদ ফিরলাম না, তোরা জানবি রাত্তিরে রাধাকান্তর ওখানেই আছি।
গ্যারেজে কালো গাড়িটার মধ্যে এতটুকু ভৌতিক ব্যাপার নেই। খাঁটি একটি মোটরগাড়ি বলতে যা বোঝায়, তাই!
দিব্যি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল। মানে–মুরারিবাবুই চালাচ্ছেন। নিজে থেকে চলবে কোন আক্কেলে? ও তো যন্ত্র মাত্র। যেদিকে চালানো যাবে চলবে। দাঁড় করালে দাঁড়াবে। মানুষের হাতে তার যত জারিজুরি। মানুষ নইলে সে একেবারে অচল জড়বস্তু মাত্র।
