একদিন বাধল টক্কর। হাওড়া ব্রিজের মুখে একটা লরি পেছন থেকে মুরারিবাবুর গাড়িকে ধাক্কা মারল। গাড়ি গিয়ে থামে লাগল। ইঞ্জিন প্রায় হাড়গোড় ভেঙে অক্কা পেল।
কিন্তু মুরারিবাবুর বরাত। ব্রেক কষেছিলেন সঙ্গেসঙ্গে, কিংবা লরির ড্রাইভারই ব্রেক কষেছিল, অল্পের জন্য মুরারিবাবু রক্ষা পেলেন। কাঁচের টুকরোয় কপাল ও কান কেটে গেল। স্টিয়ারিং-এর ধাক্কা বুকে লাগলেও আশ্চর্য, মুরারিবাবুর ফুসফুস আর কলজের জোর আছে বলতে হয়, খুব একটা জখম হলেন না। হাসপাতালে ফাস্ট এড দিয়েই ছেড়ে দিলেন ডাক্তার! খবর পেয়ে বীরু ছুটে গিয়েছিল। রিকশো চাপিয়ে মামাকে বাড়ি নিয়ে এল।
সবাই ভেবেছিল, মুরারিবাবু আর গাড়ির কাছ মাড়াবেন না। কিন্তু কোথায় কী? একবার অ্যাকসিডেন্ট ঘটে তাঁর সাহস বরং বেড়ে গেল বুঝি। আরে বাবা, গাড়ি থাকলেই অ্যাকসিডেন্ট হয়। বড় থাকলে যেমন মাথা থাকে। তেমনি।
ভোঁদা মিত্তিরের একটা গ্যারেজও ছিল। ল্যান্ডমাস্টারটা সারাতে গেলে ভোঁদাবাবু বললেন,–শোনো মুরারি, তোমার এই গাড়ির যা অবস্থা হয়েছে, অনেক খরচ পড়ে যাবে। বরং এটা যা হোক দামে ঝেড়ে দাও। তোমাকে আমি আরও সস্তায় এর চেয়ে মজবুত এবং হালকা একটা গাড়ি দিচ্ছি। গাড়িটা পুরোনো মডেলের। আকারেও ছোট। ছোট বলেই সুবিধে। ফঁক গলিয়ে নিয়ে যাওয়া সোজা হবে। গলিটলিতেও ঢোকা যাবে।
মুরারিবাবু ভেবেচিন্তে রাজি হলেন।
গাড়িটা কালো রঙের একটা পুরোনো মডেলের ফোর্ড। পাদানি আছে। তেলখরচ কমে। লম্বা-চওড়ায় যা আকার, খেলনা গাড়ি বলে মনে হবে।
তা হোক। অত প্রকাণ্ড ল্যান্ডমাস্টারের চেয়ে এই জিনিসই ভালো। যেমন পক্ষী, তেমন বাস্য।
মুরারিবাবু আরও খুশি হলেন ভেঁদা মিত্তির মাত্র সাড়ে তিনহাজার টাকায় গাড়িটা বেচতে চান শুনে।
গাড়িটা গ্যারেজের কোণার দিকে রাখা ছিল। ঝুল জমেছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। গ্যারেজের মিস্ত্রিরা ঝেড়ে-ছে চকচকে করে দিল। মুরারিবাবু স্টার্ট দিয়েও দেখে নিলেন. হ্যাঁ, এ যেন বাঘের বাচ্চা। চাপা গরগর আওয়াজ তুলে গুলতির মতো ছুটতে চায়।
মুরারিবাবু গ্যারেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সস্নেহে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মিস্ত্রিরা আবার একদফা কলকবজা পরীক্ষা করছে, এমন সময় কালিঝুলি মাখা প্যান্টশার্ট পরা অন্য একজন মিস্ত্রি তাঁর কাছে এল।
সে চাপা গলায় বলল,-বাবু কি ওই গাড়িটা তাহলে কিনছেন?
কিনছি মানে? মুরারিবাবু অবাক হয়ে বললেন। কিনে ফেলেছি। কেন বলো তো?
–বাবু, গাড়িটার সব ভালো। কিন্তু একটা দোষ আছে।
–দোষ! কী দোষ?
–মাঝে-মাঝে গাড়িটার মাথায় যেন ভূত চাপে।
মুরারিবাবু চমকে উঠে বললেন, ভূত চাপে? তার মানে?
সে ফিসফিস করে বলল,–মাঝে-মাঝে দেখেছি, রাতের বেলা গাড়িটা গ্যারেজে থাকে না। চুপিচুপি বেরিয়ে যায়। তারপর ভোরবেলা ফিরে আসে। আমি এই ঘরটায় থাকি না। ঘুম-টুম বিশেষ হয় না আমার। তাই গরগর চাপা আওয়াজ এলেই সব টের পাই!
মুরারিবাবু সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন,-বলো কী? তাহলে নিশ্চয় কেউ চালিয়ে নিয়ে কোনও কাজে বেরিয়ে যায়।
না বাবু। তা নয়। বলে মিস্ত্রি জোরে মাথা নাড়ল।
মুরারিবাবু বললেন,–অসম্ভব। নিশ্চয়ই কেউ নিয়ে যায়। আজকাল গাড়ি চুরি করে ডাকাতরা ডাকাতি করতে যায়। তেমনি কোনও ব্যাপার দেখে থাকবে। এক্ষেত্রে ডাকাতরা গাড়িটা ফেরত দিয়ে যায়, এই যা।
মিস্ত্রি বলল, না বাবু। গেট তো তালাবন্ধ থাকে। তা ছাড়া, আমি স্বচক্ষে দেখেছি, গাড়িতে ড্রাইভার থাকে না। আর গেটটাও আপনা-আপনি খুলে যায়। গাড়িটা চলে গেলে আবার গেট যেমন ছিল তেমনি বন্ধ।
মুরারিবাবু এবার হো-হো করে হেসে উঠলেন। এই মিস্ত্রিটার নিশ্চয় রাগ আছে মালিক ভোঁদা মিত্তিরের ওপর। হয়তো মাইনেকড়ি বেশি চায়।
কিংবা, নির্ঘাত আফিম বা গাঁজা খায়। নেশার ঘোরে ওই আজগুবি ব্যাপার দেখে।
মিস্ত্রি বলল,-হাসছেন বাবু? পরে কিন্তু কাঁদতে হবে। যাই হোক, মিত্তিরবাবুকে দয়া করে বলবেন না। আপনার ভালোর জন্য বললাম।
তার করুণ মুখ দেখে অগত্যা মুরারিবাবু ঠিক করলেন, কথাটা বলবেন না ভোঁদাবাবুকে। মিস্ত্রিটা নিশ্চয় গরিব। চাকরি খেয়ে লাভ কি? নেশার ঘোরে যা দেখেছে, সরল মনে বলতে এসেছে।
কিছুক্ষণ পরে মুরারিবাবু গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। চমৎকার গাড়ি। মাঝে মাঝে এর মাথায় ভূত চাপার কোনও লক্ষণই দেখলেন না।
নিচের তলায় একটা গ্যারেজ বানিয়ে দিয়েছিলেন বাড়িওলা। সেই গ্যারেজে গাড়িটা ঢুকিয়ে তালা আটকালেন। সন্ধে হয়ে এসেছে। এখন আর কোথাও বেরিয়ে লাভ নেই। সকাল হোক, তখন বেরুবেন। কল্যাণী অবধি ঘুরে আসা যাবে। বেশ গরম পড়েছে শহরে। তার ওপর ভিড়। কল্যাণীর মাঠে গিয়ে হাওয়া খেয়ে আসবেন। নিরিবিলি কোথাও একটু বসবেন। ভাবতেও খুশিতে রোমাঞ্চ জাগছিল।
সেই খুশিতে চোখে আর ঘুমই আসে না সে রাতে।
পুবের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নিচের উঠানমতো জায়গায় একপাশে গ্যারেজটা দেখা যায়। সিঁড়ির মাথায় বালটা মোটে চল্লিশ ওয়াটের। আলো সামান্যই। তেরচা হয়ে একটুখানি আবছা আলো গ্যারেজের কিনারা অবধি পৌঁছয়। মাঝে-মাঝে ব্যালকনি থেকে তিনি নিচের গ্যারেজটা দেখছিলেন।
কখন সকাল হবে, সেই প্রতীক্ষায় অস্থির। ঘুম আসতেই চায় না।
