এই সুন্দর পৃথিবীর কত কিছু সেরা জিনিস দেখার সুযোগ পেতেন না, যদি ওভাবে দৈবাৎ মারা পড়তেন। তাই মানুষ বুদ্ধি করে এমন রঙিন হালকা বল বানিয়েছে মুরারিবাবুর মোটরগাড়িচ খোকা-খুকুদের জন্যে। এ তো গেলা যাবে না। কোনও রিস্ক নেই। তোফা! আজকাল মানুষের কত বুদ্ধি!
বিগলিত এবং আনন্দিত মুরারিবাবুর সামনে এই সময় এসে পড়ল একটা বাস। ভিড় ছিল, নাকি ছিল না, অত লক্ষ না করে যেই চাপতে গেছেন, হুড়মুড় করে লোকেরা নেমে এল কিংবা চাপতে গেল, মুরারিবাবু ছিটকে পড়ে রাস্তায় চিৎপাত হলেন এবং হায়, হায়, সেই সুন্দর রঙিন বলের ওপর প্রকাণ্ড একটা উঁড়িওলা লোকও মুরারিবাবুর মতো রোগাপটকা লোকের ধাক্কায় সশব্দে পড়ল। ব্যস!
পট-পট-পটাৎ! কিংবা ফটফটফটাস! এই রকম একটা শব্দ হল। তারপর মুরারিবাবু মাথা তুলে দেখলেন, বাসটা চলে গেছে এবং তার মাথার দুহাত দূরে পড়ে আছে কয়েক টুকরো রঙিন রবারের ছিবড়ে!
আর্তনাদ করতে গিয়ে করলেন না। শান্ত-মাথায় উঠে জামার ধুলো ঝাড়লেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন আর কখনও বাসে-ট্রামে চাপবেন না।
সেদিন সন্ধ্যায় আর সেই অন্নপ্রাশনের নেমন্তনে গেলেন না। ভাগ্নে বীরুকে পাঠিয়ে দিলেন। খোকার জন্যে কেনা বাকি খেলনাগুলো তো পৌঁছে দেওয়া দরকার।
মুরারিবাবুর গাড়ি কেনার কারণ হল এই।…
হ্যাঁ, মুরারিবাবু ঝোঁকের মাথায় তারপর একটা মোটরগাড়িই কিনে ফেললেন। মল্লিকবাজারে পুরোনো মোটরগাড়ি কেনা-বেচার দালালি করেন ভোঁদা মিত্তির। মুরারিবাবুর সহপাঠী ছিলেন কলেজজীবনে। পুরোনোমোটর পার্টসের একটা দোকানও আছে ভেঁদা মিত্তিরের। তিনিই পরামর্শ দিয়েছিলেন, নতুন গাড়ি কেনার অনেক হাঙ্গামা আজকাল। পারমিটের জন্য লাইন দিয়ে হাপিত্যেস করতে হয়। তুমি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনো। দামও কম পড়বে। পারমিটেরও হাঙ্গামা হবে না।
যে গাড়িটা কিনলেন, সেটা একটা ল্যান্ডমাস্টার, বেশ জব্বর গাড়ি। ড্রাইভার রাখতে হল। তার নাম ছিল মুকুন্দলাল। খুব পাকা ড্রাইভার।
মুরারিবাবু দিনকতক ভাগ্নে বীরু আর রাঁধুনি জটিলকে নিয়ে হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে জি. টি. রোড, কখনও বোম্বে রোড হয়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকলেন। মুকুন্দ অবাক হয়ে ভাবল, বাবুর কি মাথা খারাপ? আপিস নেই, ব্যবসাপাতি নেই অথচ খামোকা তেল খরচ করে সেই বর্ধমান, নয়তো ওদিকে কোলাঘাট অবধি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন।
কখনও মুরারিবাবু পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদেরও হাওয়া খেতে নিয়ে যেতেন। প্রতিবেশীরা আর তার আড়ালে নিন্দামন্দ করতেন না। প্রায়ই মুরারিবাবুকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছিলেন। মুরারিবাবুর পাড়াজুড়েও সুনাম। এরপর ক্রমশ পাড়ায় যখন যার গাড়ি দরকার, মুরারিবাবুর কাছে এসে ধরনা দিয়েছে।
কিন্তু পেট্রোলের যা দাম আজকাল! কাহাতক আর এ উপকার করা যায়? মুরারিবাবু শেষটায় খুব ব্রিবত বোধ করছিলেন। ড্রাইভারের মাইনে আর তেলের খরচে ব্যাঙ্কে জমানো টাকাকড়ি ফুরিয়ে ফতুর হয়ে যাবেন যে!
তখন একদিন ভাগ্নে বীরু আর রাঁধুনি জটিলকে নিয়ে পরামর্শ করতে বসলেন। বীরু বলল,–এক কাজ করুন মামা। আমি নিজেই ড্রাইভিং শিখে নিই। তাহলে খামোকা মুকুন্দকে আর রাখার দরকার হবে না। আমিই আপনার ড্রাইভার হব।
মুরারিবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, তুই গাড়ি চালাবি? রক্ষে কর বাবা! কবে কোথায় অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে…আঁতকে উঠে কথা বন্ধ করে তিনি আধমিনিট চোখ বুজে বসে সম্ভবত দুর্গানাম জপ করে নিলেন।
জটিল বলল, বরং এক কাজ করুন বাবুমশাই! আপনিই নিজে গাড়ি চালানো শিখুন। আপনি বিচক্ষণ মানুষ। ঠান্ডা মাথা। আপনি নিজে গাড়ি চালানো শিখলে
কোনও বিপদের ভয় থাকবে না।
পরামশটা মনঃপূত হল মুরারিবাবুর। বীরু বিরসমুখে চলে গেল নিজের ঘরে। মুরারিবাবু ভাবলেন, ঠিকই তো। বীরু ছেলেমানুষ। গোঁয়ার্তুমি করাটা ওর পক্ষে স্বাভাবিক। তার চেয়ে আমি প্রবীণ মানুষ। আমি হুঁশিয়ার হয়ে গাড়ি চালাতে পারব।
মুরারিবাবু মুকুলের কাছে গাড়ি চালানো শিখতে শুরু করলেন। মুকুন্দ টের পাচ্ছিল, এবার তার চাকরি যাবে। তা যাক। ড্রাইভারের চাকরি পেতে অসুবিধে নেই। তাছাড়া এই বাবুমশাইটি যা খামখেয়ালি! রোজ খামোকা বর্ধমান-কোলাঘাট করে তাকে নাকাল করে ছাড়ছেন। এবার নিজে গাড়ি চালানো শিখে বুঝবেন ঠ্যালাটা। মুকুন্দ নেহাত লজ্জায় চাকরি ছেড়ে যেতে পারছিল না।
রোজ ভোরবেলা গড়ের মাঠে গিয়ে চালানোর তালিম নিতে থাকলেন মুরারিবাবু।
মাস তিনেক পরে রাস্তায় ভিড়েও মুরারিবাবু গাড়ি চালাতে চেষ্টা করেন। তাঁর পাশ ঘেঁষে বসে থাকে মুকুন্দ। দরকার বুঝলে সে হাত লাগাবে।
এই করে শেষপর্যন্ত মুরারিবাবু দিব্যি গাড়ি চালানো শিখে নিলেন। লাইসেন্সও জোগাড় করে ফেললেন। তার ক্রিমরঙের ল্যান্ডমাস্টারের সামনে ইংরেজি হরফে লাল রঙের এল অর্থাৎ নতুন লাইসেন্স মার্কা ঝুলিয়ে পাইকপাড়া থেকে কক্সবা, কসবা থেকে ক্যানিং করে ঘুরে বেড়ালেন।
তারপর যথারীতি মুকুন্দকে জবাব দিলেন। এবার থেকে একা গাড়ি চালাতে আর কোনও অসুবিধে হল না।
কিন্তু তাঁর বিচক্ষণ ড্রাইভিং-হাত হলে হবে কী? ওই যেসব কল্পিত যমের মতো প্রকাণ্ড লরিগুলো হরদম আনাগোনা করছে রাস্তায়! তাদের সঙ্গে টক্কর বাঁচিয়ে চলা কি সহজ কাজ?
