লোকটা বলল, না সার! ম্যাজিক জানলে তো কত টাকা রোজগার করে বড়লোক হয়ে যেতুম। আসলে কী জানেন সার? বাঁচতে আমার আর একটুও ইচ্ছে নেই। তাকে থামিয়ে দিয়ে বললুম,–তোমার নাম কী? বাড়ি কোথায়?
লোকটা বলল, কিছু মনে নেই। সব ভুলে গেছি। এবার মনে হল, লোকটা সত্যিই পাগল। আর তাকে যে আপ ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছিলাম, সেটা নিশ্চয় আমার চোখের ভুল। প্রচণ্ড শব্দ করে ট্রেনটা আসছিল। এ সময় ট্রেনের দিকেই আমার মনোযোগ থাকা স্বাভাবিক। লোকটার কথা শুনে আর হঠাৎ উঠে যাওয়া দেখে ব্যাপারটা আমি কল্পনাই করেছিলুম।
জিতেনবাবু হোহো করে হেসে উঠলেন। তাহলে কী দাঁড়াল? বলছিলুম না ভূতের ব্যাপারটা সাইকোলজিকাল। হ্যাঁলুসিনেশন!
মুরারিবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, আমার কথা এখনও শেষ হয়নি।
নাড়ুবাবু বললেন, তাহলে তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলল। বৃষ্টি থেমে গেছে মনে হচ্ছে। বাড়ি ফিরতে হবে।
মুরারিবাবু বললেন, লোকটা আবার বকবক করতে থাকল। কান দিলুম না। একটু পরে দেখলুম, আপের সিগন্যাল নীল হল। স্টেশনমাস্টার বেরিয়ে এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে একচোখো লণ্ঠনে নীল রঙের আলোটা নাড়তে থাকলেন। তারপর মালগাড়ির ইঞ্জিনের আলো দেখা গেল। আলোর দিকে তাকিয়ে আছি। তারপর ইঞ্জিনটা যেই কাছাকাছি এসেছে, অমনই বেঞ্চ থেকে লোকটা আগের মতো উঠে দৌড়ে গিয়ে রেললাইনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
গোপালবাবু বললেন, তারপর? তারপর?
–নাঃ! আমার চোখের ভুল নয়। মালগাড়িটা ধীরে-সুস্থে স্টেশন পেরিয়ে গেল। আমি তার আগেই বেঞ্চ থেকে উঠে স্টেশনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। স্টেশনের বারান্দায় কয়েকজন যাত্রী বিরক্ত হয়ে স্টেশনমাস্টারকে ঘিরে ধরে ডাউন ট্রেনের কথা জিগ্যেস করছে আর রেলদফতরের মুন্ডুপাত করছে।
নাড়ুবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন,–এই তোমার ভূত?
মুরারিবাবু বললেন, না। শেষটুকু শোনো। তবে না বুঝবে?
–বেশ। বলো।
বাবুগঞ্জ ফেরার ডাউন ট্রেন এল রাত প্রায় সাড়ে আটটায়। ট্রেনে ভিড় ছিল। তবে যে কম্পার্টমেন্টে উঠেছিলুম, একটা সিট পেয়ে গেলুম। ট্রেন ছাড়ল। একটা করে স্টেশন আসছে আর ভিড় একটু করে কঁকা হচ্ছে। বাবুগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছনোর আগে হঠাৎ দৃষ্টি গেল আমার বাঁ-দিকে একটু তফাতে। বেঞ্চের কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে সেই লোকটা! হাসে-ই বটে। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ। গায়ে ছাইরঙা হাফশার্ট। পরনে খাটো ধুতি। বাঁদিকের গাল থেকে গলা পর্যন্ত দাগড়া-দাগড়া ক্ষতচিহ্ন। সে আমার দিকে এবার তাকাল। হিংস্র দৃষ্টি। চোখদুটো নিষ্পলক। আতঙ্কে আমার শরীর তখন প্রায় অবশ। দৃষ্টি সরিয়ে নিলুম। একটু পরে বাবুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ানোমাত্র আমার পিছনের দিকের দরজা দিয়ে নেমে গেলুম।
গোপালবাবু বললেন,–হ্যাঁ। তাহলে লোকটাকে ভূতই বলতে হবে।
নাড়ুবাবু গম্ভীরমুখে বললেন, ভূত! হান্ড্রেড পারসেন্ট ভূত!
জিতেনবাবু বাঁকা হেসে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–ওহে গোপাল! আমি একবার বাথরুমে যাব।
গোপালবাবুর বাড়িটা পুরোনো আমলের। এই বসার ঘরের সংলগ্ন বাথরুম নেই। পিছনের দিকে এক টুকরো কঁকা জায়গায় ফল-ফুলের গাছ আর ঝোঁপঝাড় আছে। বাউন্ডারি পাঁচিল ঘেঁষে একটা বাথরুম আছে। সেদিকের দরজা খুলে বেরুলেন জিতেনবাবু। গোপালবাবু বললেন,–ওই সুইচ টিপে আলো জ্বেলে নাও জিতেন।
জিতেনবাবু বললেন, আমার আলোর দরকার নেই। তবে বৃষ্টিতে জায়গাটা পিছল হয়ে আছে। বলে তিনি ঘুরে এসে সুইচ টিপে দিলেন। তারপরই তার চিৎকার শোনা গেল। কে রে? কে ওখানে? কানুহরি? আঁ! এ কী! এ আবার কে? ওরে বাবা! কী সাংঘাতিক! গোপাল! গোপাল! গো-গো-গো-ও-ও!
সবাই সেই দরজা দিয়ে ছুটে গেলেন। জিতেনবাবু সিঁড়ির নিচে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি জলে-কাদায় নোংরা। ধরাধরি করে তাকে ঘরে এনে চোখেমুখে জল ছেটানোর পর তার জ্ঞান ফিরে এল। তিনি অতিকষ্টে বললেন, হ্যাঁলুসিনেশন। মানে–মুরারির দেখা অবিকল সেই লোকটা ঝোঁপের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।…
মুরারিবাবুর মোটরগাড়ি
মুরারিবাবুর গাড়ি কেনার পিছনে একটা জব্বর না হলেও ছোটখাট কারণ ছিল। আজকাল বাসে-ট্রামে ওঠা বড় সহজ কথা নয়। মুরারিবাবুর মতো বয়স্ক লোকের পক্ষে তো নয়ই।
সেদিন কসবা যাবেন মাসতুতো এক দাদার নাতির অন্নপ্রাশনে। নিউ মার্কেট থেকে কয়েকটা খেলনা কিনে এনেছেন। তার মধ্যে আছে একটা রঙিন ইয়া মোটা বল। ফুটবলেরই সাইজ প্রায়। পাতলা রবারের তৈরি। সেই বলটা মাঝে-মাঝে মাথার ওপর তুলে খোকা-খুকুরা যেমন করে তাকিয়ে দেখে, তেমনি করে দেখতে-দেখতে এসেছেন। হেসেছেন প্রচুর। খোকনের খুব পছন্দ হবে এটা। আহা, দোলনার মাথার ওপর এমন রাঙা বল ঝুলিয়ে রাখলে তিনি এখনই থোকা হতে রাজি আছেন।
হায় রে সেকাল! ছ্যা, ছ্যা, তখন এমন সব ছেলেভুলানো সেরা জিনিস ছিল কোথায়? মুরারিবাবু যে-আমলে খোকা, তখন তাঁর মাথার ওপর বড়জোর রঙিন কাগজের ফুল ঝুলিয়ে দেওয়া হতো।
আর কিছু না, কাগজের ফুল! কোনও মানে হয়? খোকা-মুরারিবাৰু দৈবাৎ খুদে হাত বাড়িয়ে ওটা ছিঁড়ে নিতে পারতেন কত সহজে। এবং সঙ্গে সঙ্গে মুখে পুরে দিতেন নিশ্চয়। তার ফলটা মারাত্মক হতো না? গলায় লেগে দম আটকে ওই বয়সেই মারা পড়তেন। রাস্তার ভিড়ের মধ্যেই তিনি আঁতকে উঠলেন।
