বললুম,–নিশ্চয় বসতে পারো। বেঞ্চটা তো খালি আছে। লোকটা বেঞ্চের শেষপ্রান্তে বসল। তারপর বলল, এখন যদি আমি একটা বিড়ি খাই, কিছু মনে করবেন না তো সার! এ তো দেখছি বিনয়ের অবতার। বললুম,–তুমি বিড়ি খাবে, তাতে আমার মনে করার কী আছে?
লোকটা পকেট থেকে দেশলাই বের করে আগুন জ্বেলে বিড়ি ধরাল। ওই একটুখানি আলোয় দেখলুম, লোকটার মুখে খোঁচা-খোঁচা গোঁফদাড়ি আর বাঁদিকের গাল থেকে গলা অবধি ক্ষতচিহ্ন। তার মুখটা দেখে কেন যেন একটু অস্বস্তি জাগল। তার গায়ের রঙও কুচকুচে কালো। কেউ নিশ্চয় লোকটার গাল ও গলায় চপারের কোপ মেরেছিল।
গোপালবাবু বললেন, তাহলে লোকটা খুনখারাপিতে মরে যাওয়ার পর ভূত হয়েছিল?
মুরারিবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন,–আহা, পুরোটা বলতে দাও!
নাডুবাবু বললেন, হ্যাঁ, বলো।
মুরারিবাবু বললেন,–লোকটা বিড়ি টানতে-টানতে বলল,–সারের যাওয়া হবে কোথা? বিরক্ত হয়ে বললুম,-বাবুগঞ্জ। লোকটা কেমন অদ্ভুত শব্দ করে হাসল। তারপর বলল,-বাবুগঞ্জ? এ লাইনে এই এক বিচ্ছিরি ব্যাপার। বাবুগঞ্জ থেকে আসবার ট্রেন পাওয়া যত সোজা, ফিরে যাওয়ার ট্রেন পাওয়া তত কঠিন। দেখুন
ট্রেন কখন আসে। এমন হতে পারে এ রাত্তিরে ট্রেন আর এলই না। অবাক হয়ে বললুম,–সে কী! সে আবার সেইরকম বিদঘুঁটে হেসে বলল,–এই যে আমাকে দেখছেন। রোজ ঠিক সন্ধেবেলা বাবুগঞ্জ যাব বলে স্টেশনে এসে বসে থাকি। ট্রেন আর আসে না। রেলের ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে সার! এতক্ষণে সন্দেহ হল, লোকটা নিশ্চয় পাগল। তাই চুপচাপ বসে রইলুম। লোকটা বকবক করে যাচ্ছিল। ইচ্ছে হল, তাকে ধমক দিয়ে উঠে যেতে বলি। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। বলা যায় না, কোনও গুণ্ডাবদমাশ হতে পারে। আমার হাতে একটা অ্যাটাচি কে। টাকা আছে ভেবে হয়তো সে এটা কেড়ে নিয়ে পালানোর ফিকিরে এখানে এসেছে। প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্তে বসা আমার উচিত হয়নি। এই ভেবে উঠে যাব ভাবছি, স্টেশনে ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বাজল। অমনি লোকটা বলল,–দেখছেন তো? বাবুগঞ্জের দিক থেকে ট্রেন আসছে। ওই দেখুন সিগন্যালবাতি নীল হল। লক্ষ করে দেখলুম, সত্যি তাই। লোকটা বলল,–এইজন্যে জীবনে ঘেন্না ধরে গেছে সার! বাঁচতে ইচ্ছে করে না। এ কী অবস্থা হয়েছে দেখুন। একটু পরে স্টেশনের কাছে কজন যাত্রীকে প্ল্যাটফর্মের সামনে যেতে দেখলুম। তারপর সত্যিই ডাউনের দিক থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল। তারপর ট্রেনটা হুইসল দিতে-দিতে স্টেশনে ঢুকছিল। এই সময় দেখলুম, বেঞ্চ থেকে লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে। তারপরই ঘটে গেল ভয়ংকর ঘটনা। ট্রেনটা এসে আমার সামনে দিয়ে খানিকটা এগিয়ে থামবার আগেই লোকটা ইঞ্জিনের সামনে লাইনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মুরারিবাবু চুপ করলে নাডুবাবু বললেন,–এ তো সুইসাইড কেস। তোমার ভূত কোথায়?
জিতেনবাবু এতক্ষণে সকৌতুকে বলে উঠলেন, সবে তো লোকটা মারা পড়ল। ভূত হতে একটু সময় লাগবে না?
মুরারিবাবু তার কথা গ্রাহ্য করলেন না। তাকে এবার কেমন নিস্তেজ দেখাচ্ছিল। আবার একটা শাস ছেড়ে তিনি বললেন, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! অমন একটা ঘটনা ঘটে গেল। ড্রাইভারের তো চোখে পড়ার কথা। কিন্তু কোনও হইহল্লা শুনলুম না। ট্রেনটা হুইসল দিয়ে দিব্যি চলে গেল। তখন আমি আতঙ্কে, উত্তেজনায় বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। লোকটার রক্তাক্ত হাড়গোড়ভাঙা লাশ নিশ্চয় নিচে লাইনে পড়ে আছে। সেই বীভৎস দৃশ্য দেখতেও ভয় করছে। এমন সময় রেলের একচোখো লণ্ঠন হাতে একজন খালাসিকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলুম। সে ভেবেছিল আমি বিনা টিকিটের যাত্রী। আমার কাছে এসে সে টিকিট দাবি করতেই বললুম,–আমি যাব বাবুগঞ্জ। আমার টিকিট আছে। কিন্তু এক্ষুনি একটা লোক ওইখানে ইঞ্জিনের সামনে লাফিয়ে পড়ে সুইসাইড করেছে।
সে অবাক হয়ে বলল,–সে কী? কখন?
বললুম, গিয়ে দেখো। লাইনে তার লাশ পড়ে আছে।
খালাসিটি লণ্ঠন হাতে প্ল্যাটফর্মের নিচে লাইনে আলো ফেলে এদিক-ওদিক দেখার পর বলল,–কোথায় লাশ? আপনি টিকিট কাটেননি। তাই আজেবাজে কথা বলে কেটে পড়ার তালে আছেন! খাপ্পা হয়ে তাকে আমার টিকিট দেখালুম।
তখন সে হাসতে-হাসতে বলল, আপনি ভুল দেখেছেন সার। মাথায় জেদ চেপে গেছে আমার। তাকে বললুম, লাশটা ইঞ্জিনের চাকার ধাক্কায় হয়তো দূরে ছিটকে গেছে। চলো। খুঁজে তোমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি।
গোপালবাবু বললেন, লাশ দেখতে পেলে?
–নাঃ! অনেক খোঁজাখুঁজি করে লাশ তো দূরের কথা রেললাইনে রক্তের চিহ্ন পর্যন্ত দেখতে পেলুম না। আতঙ্ক আর অস্বস্তিতে আমার শরীর তখন অবশ। খালাসি বলল, ডাউন ট্রেন আসতে আজ একটু দেরি হবে সার। আপের স্টেশনে মালগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এবার মালগাড়ি পাস হবে। তারপর ডাউন ট্রেন আসবে।
যাই হোক, সে স্টেশনের দিকে চলে যাওয়ার পর সেখানে দাঁড়াতে আর সাহস হল না। স্টেশনের কাছাকাছি একটা বেঞ্চের উপর গাছের ছায়া পড়েছিল। সেই বেঞ্চে গিয়ে বসলুম। তারপর দেখলুম, বেঞ্চের অন্য প্রান্তে কেউ বসে আছে।
নাড়ুবাবু বলে উঠলেন,–সেই লোকটা নয় তো?
মুরারিবাবু বললেন, তাঁঃ! সেই ব্যাটাচ্ছেলে! আমি যেই বসেছি, অমনি সে সেইরকম বিদঘুঁটে হেসে বলল, খালাসির সঙ্গে রেললাইনে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন সার? তখন আর ভয়-টয় নেই আমার। রাগে মাথায় আগুন ধরে গেছে। বললুম, তুমি দেখছি এক্কেবারে ম্যাজিশিয়ান! আমাকে ম্যাজিক দেখিয়ে ছাড়লে!
