দোকানদার ভদ্রলোক আরও জানিয়েছিলেন,–ঘড়িটা আমরা এবার সার্কুলার রোডে কবরখানায় ওঁর কবরের কোণা খুঁড়ে পুঁতে দিয়ে এসেছি। আপনার পাশেই কাগজের প্যাকেটে ঘড়িটা পড়েছিল। আর ঘরে ঢোকাইনি। কারণ, আপনাকে নিয়ে এই চোদ্দজন হল–প্রত্যেকে ওটার পাল্লায় পড়ে ভুগেছেন। এবার স্যার, কালীঘাটে গিয়ে পুজো-টুজো দিন।…
মুরারিবাবুর দেখা লোকটা
শ্রাবণ মাসের সন্ধ্যায় তুলকালাম বৃষ্টি। সেই সময় আড্ডাটা জমেছিল ভালো। ইতিমধ্যে গোপালবাবুর কাজের লোক কানুহরি ছাতার আড়ালে মুড়ি আর তেলেভাজা এনেছিল। বৃষ্টিতে বেচারার একেবারে কাকভেজা অবস্থা। ভিজে কাপড় বদলে নিয়ে বাড়ির ভিতর থেকে সে এবার ট্রে-ভর্তি চা আনবে। ঠিক এই সময়ে মুরারিবাবু আর জিতেনবাবুর মধ্যে কী সুত্রে তর্কটা বেধে গেল অন্যেরা খেয়াল করেননি।
জিতেনবাবু বললেন,–বোগাস! আমি বলছি নেই!
মুরারিবাবু বললেন, আমি বলছি আছে!
-সায়েন্সকে তুমি অস্বীকার করতে পারো?
–রাখো তোমার সায়েন্স! আমি স্বচক্ষে দেখেছি! আর তুমি বলছ নেই!
–তুমি ভুল দেখেছ! সাইকোলজিতে হ্যাঁলুসিনেশন বলে একটা কথা আছে জানো? দৃষ্টিবিভ্রম।
–রাখো তোমার সাইকোলজি।
গোপালবাবু গৃহকর্তা। বন্ধুদের মধ্যে কী নিয়ে তর্ক হচ্ছে, তা না জানলে কেমন করে মিটিয়ে দেবেন? তাই তিনি বললেন, আহা! ব্যাপারটা কী?
জিতেনবাবু বাঁকা হেসে বললেন, ভূত! যে যুগে মানুষ চাঁদে পাড়ি দিয়েছে, মঙ্গলগ্রহে স্পেসশিপ পাঠিয়েছে, সেই যুগে মুরারি বলছে কিনা…যত্তসব উদ্ভট কথাবার্তা!
মুরারিবাবুও আরও বাঁকা হেসে বললেন, তুমি তো কলকাতায় সারাটা জীবন কাটাচ্ছ! কখনও আমার মতো গ্রামেগঞ্জে থেকেছ? আমার মতো একলা রাত-বিরেতে নিরিবিলি জায়গায় কখনও ঘুরেছ?
নাড়ুবাবু টিপ্পনী কাটলে,–ঠিক বলেছ ভায়া। কলকাতা একটা মহানগর। সবসময় আলো, ভিড়ভাট্টা। এখানে ভূত আসবে কোন সাহসে?
কানুহরি চায়ের কাপপ্লেট ভর্তি ট্রে রেখে গেল। চা খেতে-খেতে তর্কটা ধামাচাপা পড়েছিল। কিন্তু নাড়ুবাবুই সেটা আবার খুঁচিয়ে দিলেন–জিতেন বলছে ভূত নেই। আর মুরারি বলছে আছে। বেশ তো! মুরারিই বলুক, সে কোথায় ভূত দেখেছে!
গোপালবাবু সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। বৃষ্টিটা বেশ জমে উঠেছে। মুরারি! তুমি গল্পটা বলল।
মুরারিবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–গল্প নয়। একেবারে সত্যিকার ঘটনা। বিশ্বাস করা না করা তোমাদের ইচ্ছে।
নাডুবাবু বললেন কী বলছ ভায়া? আজ অবধি তোমার মুখে একটা মিথ্যা কথা শুনিনি। তুমি বলো। শোনা যাক।
তারপর তিনি জিতেনবাবুকে বললেন,–জিতেন! তুমি কিন্তু স্পিকটি নট। চুপচাপ বসে থাকবে।
মুরারিবাবু চা শেষ করার পর বললেন,–সে প্রায় বছর পনেরো-ষোলো আগের কথা। তখন আমি সরকারি চাকরি করি। নদিয়া জেলার বাবুগঞ্জে আমার অফিস। আমার কাজ ছিল ওই অঞ্চলের গ্রামে-গ্রামে ঘুরে সরকারি সাক্ষরতা প্রকল্পে কতটা কাজ হচ্ছে, তার হিসেব নেওয়া। বাবুগঞ্জ অফিসে একটামাত্র জিপগাড়ি ছিল। সেটা ব্যবহার করতেন আমার ঊর্ধ্বতন অফিসার। আমি কখনও সাইকেলে, কখনও বাসে, আবার কখনও ট্রেনে চেপে বিভিন্ন গ্রামে যাতায়াত করতুম।
নাড়ুবাবু বললেন, আহা! ভূত দেখার ব্যাপারটা বলো!
মুরারিবাবু একটু চটে গিয়ে বললেন, আগে ব্যাকগ্রাউন্ড না বললে তো বুঝবে
–ঠিক আছে। ব্যাকগ্রাউন্ড বোঝা গেল। এবার ভূতের ব্যাপারটা শোনা যাক।
মুরারিবাবু দরজার বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন,–মে মাসের মাঝামাঝি হবে। হ্যাঁ–সেদিন ছিল বুদ্ধপূর্ণিমা। বাবুগঞ্জ থেকে ট্রেনে চেপে ঝাঁপুইহাটি নামে একটা গ্রামে গিয়েছিলুম। স্টেশনটা মাঠের মধ্যে। সেখান থেকে সাইকেলরিকশোয় গ্রামে পৌঁছলুম। তখন বেলা প্রায় বারোটা বাজে। মোটে চারটে স্টেশন দূরত্ব। ট্রেনের স্পিড কেমন তা বোঝো তাহলে! আসলে আগের বছর প্রচণ্ড বন্যা হয়েছিল। রেললাইন তখনও ঠিকমতো সারানো হয়নি।
গোপালবাবু বলে উঠলেন, কী কাণ্ড! তোমার ভূত আসতে বড্ড দেরি হচ্ছে মুরারি!
নাড়ুবাবু টিপ্পনী কাটলেন–সেই ট্রেনের স্পিডের মতো!
মুরারিবাবু বললেন, ঝাঁপুইহাটির পঞ্চায়েত-কর্তার বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া এবং বিশ্রাম করলুম। বিকেলে সাক্ষরতা প্রকল্পের কাজকর্ম খাতাকলমে দেখলুম। দু একজনকে ডেকে ব্ল্যাকবোর্ডে নাম লিখতেও বললুম। কিন্তু বুঝতে পারলুম, খাতাকলমের সঙ্গে আসল কাজের মিল নেই। কী আর করা যাবে? মুখে উপদেশ দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হল। বাবুগঞ্জ ফেরার ট্রেন সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। পঞ্চায়েত কর্তা খাতির করে আমাকে তার মোটরসাইকেলে চাপিয়ে স্টেশনে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। সাহস পেলুম না। রাস্তার যা অবস্থা!
নাডুবাবু গম্ভীরগলায় বললেন, ভূত!
–এবার সেই ঘটনায় আসছি। স্টেশনে পৌঁছে খোঁজ নিলুম। ডাউন ট্রেন সময়মতো আসার গ্যারান্টি নেই। স্টেশনে কয়েকজনমাত্র যাত্রী অপেক্ষা করছিল। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। খোলা জায়গা বলে উত্তল বাতাস বইছে। প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্তে খালি বেঞ্চে বসে সিগারেট ধরালুম।
গোপালবাবু বললেন, তুমি সিগারেট খেতে নাকি? কী করে ছাড়লে বলে তো মুরারি?
নাড়ুবাবু গম্ভীর গলায় ফের বললেন,–ভূত!
মুরারিবাবু বললেন,-বসে আছি তো আছি। সাতটা দশ বেজে গেল। ট্রেনের পাত্তা নেই। এমন সময় একটা লোক এসে বলল,-বেঞ্চিতে একটু বসতে পারি সার? লোকটার চেহারা আবছা দেখা যাচ্ছিল। পরনে খাটো ধুতি আর হাফশার্ট। পায়ে যেমন তেমন একটা স্যান্ডেল।
