চেহারাও সুবিধের নয়। তার ওপর মাথায় বিদঘুঁটে টাক। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, রাতদুপুরে নির্জন পথে এমন করে প্যাকেটে ঘড়ি লুকিয়ে এদিক-ওদিক তাকানো!
থানায় যেতেই হল। তারপর রাতের মতো হাজতেও থাকতে হল। সেখানে বিছানা, না পাখা। মশার কামড়ে শরীর লাল হল। এক দঙ্গল চোর-ডাকাত ছিনতাইকারীর সঙ্গে লকআপে কাটাতে মুরারিমোহন চাকলাদার রাতারাতি বুড়িয়ে গেলেন।
বীরু হারাধনবাবু, গোবিন্দবাবুদের থানায় নিয়ে গিয়ে সেবারকার মতো উদ্ধার করেছিল আমাকে। মুরারিবাবু নাক কান মলে বললেন,–আর অ্যালার্ম ঘড়ি কিনবই না। তাতে যতবার ট্রেন ফেল হয় তোক।
আর সেই ঘড়িটা? থানায় মহাফেজখানায় থেকে গেল অন্যসব আটক করা জিনিসপত্রের সঙ্গে। বলা বাহুল্য, মুরারিবাবু আর ওটা দাবি করেননি।
কদিন পরে হঠাৎ কলিং বেল বাজল সকালবেলা। দরজা খুলে আঁতকে উঠলেন মুরারিবাবু। সেই থানার ওসি, ভদ্রলোক এসে হাজির। ভয়েভয়ে মুরারিবাবু বললেন, কী কী কী স্যা-স্যার?
ও.সি. ভদ্রলোক একগাল হেসে করজোড়ে নমস্কার করে বললেন, আপনার সঙ্গে কথা আছে মুরারিবাবু। বিরক্ত করলাম বলে অনুগ্রহ করে রাগ করবেন না।
মুরারিবাবু তখন বিগলিত হয়ে ভেতরে এনে বসালেন। ও.সি. ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম ক্ষেত্রমোহন সেনাপতি। আমি পুলিশ হয়ে আসিনি আপনার এখানে। একটা বিশেষ কথা আছে। আপনি আমাকে ক্ষেত্রবাবু বলেই ডাকবেন।
বলুন ক্ষেত্রবাবু! বলে মুরারিবাবু জটিলকে ডাক দিলেন। চায়ের জোগাড় করতে বললেন ইশারায়।
ক্ষেত্র দারোগা বললেন, কথা আপনার সেই ঘড়ি সম্পর্কে।
মুরারিবাবু মনে-মনে হেসে বললেন, হুঁ, বুঝেছি। খুব জ্বালাচ্ছে বুঝি!
জ্বালাচ্ছে মানে?–ক্ষেত্র দারোগা বললেন,-মহাফেজখানা থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম বাসায়। আপনি দাবি করেননি–আর কেউই দাবি করেননি। কাজেই কী করা যায়? নিয়ে গেলাম। সারাতে দেব ভেবে রেখে দিলাম। কিন্তু ও হরি, রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশে
মুরারিবাবু খিকখিক করে হেসে বললেন,–অ্যালার্ম বাজছে তো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, বাজছে। রোজ রাতে বেজে উঠছে। সারাতে দেব কী, ব্যাপারটা যে ভুতুড়ে!
–তা কী করবেন ভাবছেন?
দয়া করে আপনার জিনিস আপনি নিয়ে আমায় নিষ্কৃতি দিন।বলে ক্ষেত্র দারোগা একটা কাগজে জড়ানো ঘড়িটা রেখে দিলেন মুরারিবাবুর কোলে। তারপর তক্ষুনি উঠে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।
বেরিয়ে যাওয়া নয়, যেন কেটে পড়া। চা খেতেও আর বসলেন না। ঘড়িটা হাতে নিয়ে মুরারিবাবু স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন।
কিন্তু একটা বিহিত তো করতে হবে। সেবার চীনে আলমারিটা দোকানে ফেরত দিয়ে বেঁচেছিলেন। এবারও তাই করা যাক।
অতএব তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লেন। ট্যাক্সি চেপে সোজা পার্ক স্ট্রিটের সেই দোকানে। দোকান খুলতে দেরি ছিল। তাই ফুটপাতে অপেক্ষা করতে থাকলেন।
কতক্ষণ পরে এক বুড়ো ভদ্রলোক, চেহারায় সায়েব বলে মনে হল, এসে প্যান্টের পকেট থেকে চাবি বের করে দোকান খুললেন। ইনি যে মালিক ভদ্রলোক নন, তা ঠিক। হয়তো কোনও পার্টনারই হবেন।
দোকান খুলে তিনি ঢুকলে মুরারিবাবুও পেছন-পেছন ঢুকলেন। ঘরের ভেতরটা তখন আবছা অন্ধকার। মুরারিবাবু ইংরিজিতে বললেন, হ্যালো মিস্টার…মিস্টার…
ঘুরে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। চোখ দুটো কী নীল! খাঁটি সায়েব বলেই মনে হচ্ছে। ঠোঁটের কোণায় হাসি। বললেন, আই অ্যাম মিঃ হেনরি কোলব্রুক! হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ব্যাবু?
মুরারিবাবুর ইংরিজি তেমন আসে না। ভেবেচিন্তে বললেন,–আই ওয়ান্ট টু রিটার্ন দিস অ্যালার্ম ক্লক স্যার!
–হোয়াই ব্যাবু?
–ভেরি ব্যাড ব্লক স্যার! রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশে বাজে স্যার–মানে, …মুরারিবাবু টের পেলেন মাতৃভাষা বেরিয়ে পড়েছে। তখন টাক চুলকে বললেন,–এ হন্টেড ক্লক স্যার!
অদ্ভুত হেসে বুড়ো সায়েব হাত বাড়ালেন, দ্যাট ওয়াজ মাই অ্যালার্ম ক্লক ব্যাবু। থ্যাংক ইউ। কিন্তু এ কী! তার হাতটা কোটের হাতা দিয়ে যতটুকু– ছে, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে হাড়ের হাত। তার মানে কঙ্কালের!
মুরারিবাবুর হাত থেকে ঘড়িটা পড়ে গেল। তক্ষুনি গোঁ-গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।…
জ্ঞান হল যখন, চোখ খুলে মুরারিমোহন অতি কষ্টে বললেন, আমি কোথায়?
বীরুর গলা পাওয়া গেল, মামা! আপনি হাসপাতালে।
মুরারিবাবু উঠে বসলেন। হ্যাঁ, হাসপাতালই বটে। বললেন, কী হয়েছিল রে?
বীরু বলল, আর কী হবে? পার্ক স্ট্রিটে একটা ঘড়ির দোকানের সামনে ফুটপাতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন আপনি। লোকেরা আপনাকে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে এখানে পাঠিয়ে দেয়। আপনার পকেটে একটা চিঠি ছিল বড়মামার। আপনার নাম ঠিকানা পেয়ে এঁরা খবর দিয়েছিলেন।
মুরারিবাবু ফিসফিস করে জিগ্যেস করলেন,–সেই ঘড়িটার কী হল বল তো বাবা?
–ঘড়ি? ঘড়ির কথা তো কেউ বলল না মামা!
–না বলুক। চুলোয় যাক। এতদিনে আপদ গেছে। কিন্তু সেই হেনরি কোলক কে?
মুরারিবাবু পরে সেই দোকানে গিয়ে খোঁজ নিয়েছিলেন। কোলব্রুক সায়েব একশো বছর আগে রাত এগোরোটা পঁয়ত্রিশে আত্মহত্যা করে মারা যান। এই দোকানের মালিক ছিলেন তিনি। দুরারোগ্য অসুখে ভুগে প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। খুব যন্ত্রণা হতো। সারাক্ষণ ছটফট করতেন। তার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো ছিল।
হ্যাঁ, আত্মহত্যার আগে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলেন এগারোটা পঁয়ত্রিশের ঘরে। বোঝা যায়, হেনরি কোলব্রুক নাটকীয়ভাবে মরতে চেয়েছিলেন।
