অথচ সেদিনও অ্যালার্মের দম না দেওয়া সত্ত্বেও আবার ঠিক রাত এগারোটা পঁয়ত্রিশে অ্যালার্ম বাজল।
এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন মুরারিবাবু। ঠিক ঘুম আসার সময় এ কী জ্বালাতন!
পরের রাতেও ঠিক একই ব্যাপার হল এবং তার পরের রাতেও সময় ওই এগারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট।
নিশ্চয় কোনও রহস্য আছে এর মধ্যে। মুরারিবাবু ভেবে কূল পেলেন না কিছু। সেই পার্ক স্ট্রিটের দোকানে গিয়ে মালিককে ব্যাপারটা খুলে বললেন। মালিক ভদ্রলোক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। সব শুনে বললেন,–এক কাজ করুন স্যার। অ্যালার্মটা নষ্ট করে দিন। ইচ্ছে করলে আমাদের এখানেও দিতে পারেন। আমরা অ্যালার্ম যন্ত্রটা খুলে দেব। তাহলেই আর ঝামেলা হবে না।
তাই করা হল। মহানন্দে ঘড়ি নিয়ে এলেন মুরারিবাবু। নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লেন আজ। প্রথম ঘুমটা ভেঙে গেলে ফের ঘুম আসতে চায় না। এবার আর ব্যাঘাত ঘটবে না।
কিন্তু ও হরি, এ কী কাণ্ড! সবে চোখ বুজে এসেছে, অমনি ক্রিররররং–
লাফিয়ে উঠে বসলেন মুরারিবাবু। অ্যালার্ম কাটা নেই, অ্যালার্ম যন্ত্র অর্থাৎ ভেতরের ঘণ্টা নেই–বড় কাটা ছোট কাটার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই, অথচ ঠিক অ্যালার্ম বাজছে সেই এগারোটা পঁয়ত্রিশে।
খুব ভয়ের চোখে ঘড়িটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন মুরারিবাবু। আবার কি তাহলে সেই চীনে আলমারির মতো কোনও ভুতুড়ে ঘড়ি কিনে ফেলেছেন?
যাকগে, কিনেছেন তো আর কী করবেন? ঘড়িটাকে রেখে এলেন কিচেনের পাশে স্টোররুমে।
পরদিন রাতে জটিল এল দৌড়ে, বাবু, বাবু! অ্যালারাম বাজছে কেন?
মুরারিবাবু খিকখিক করে হেসে বললেন, বাজুক না, তোর কী? তুই ঘুমো নাক ডাকিয়ে।
ব্যাজার মুখে জটিল বলল,–প্রথমে ঘুমটা চটে গেলে আর কি সহজে ঘুম আসবে বাবু?
তারপর রোজ রাতে এগারোটা পঁয়ত্রিশে অ্যালার্ম বাজে ভঁড়ার ঘরে এবং বেচারা জটিলের টাটকা ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘুম আসতেই চায় না। কয়েক রাত এইভাবে ঘুম ভালো না হওয়ার ফলে জটিলের চোখ গর্তে বসে গেল।
আর তার দুর্ভোগ ভুগতে হল মুরারিমোহনকেই। সে রাঁধতে-রাঁধতে দিনের বেলা ঘুমোয়। ডাল তরকারি ভাত পুড়ে যায়।
বাইরে কোনও জিনিস আনতে গিয়ে বড্ড দেরি করে। ব্যাপার কী? না– ফুটপাতে বা রোয়াকে ঘুমোচ্ছিল।
এরপর মুরারিবাবুর রাগ হলনা, বেচারি জটিলের ওপর নয়, ঘড়িটার ওপর। রাগের মাথায় ঘড়িটাকে এক আছাড় মারলেন।
এক আছাড়েও রাগ মিটল না। পরপর তিন আছাড় মারলেন। তারপর কানের কাছে রেখে শুনলেন, বন্ধ হয়ে গেছে ঘড়ি। টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
এবার নিশ্চিন্ত হয়ে ভাঙা ঘড়িটা জুতোর খালি বাক্সে ভরে পুরোনো জিনিসপত্রের সঙ্গে আলমারির মাথায় রেখে দিলেন।
সেদিন রাতে খুব তৃপ্তির সঙ্গে শুয়ে পড়লেন মুরারিবাবু। হাতঘড়িতে বাজছে তখন সাড়ে দশটা।
চোখের পাতা বুজে এসেছে, কী যেন স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছেন–সেই সময় আচমকা ক্রিররররং!…
লাফিয়ে উঠে বসলেন মুরারিবাবু। হা, আলমারির মাথায় রাখা পুরোনো জিনিসপত্রের ভেতর থেকেই আসছে আওয়াজ।
কিন্তু এ তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তক্ষুনি জুতোর প্যাকেট বের করে ঘড়িটা কানের কাছে রাখলেন। কোনও আওয়াজ নেই।
আওয়াজ নেই। অথচ কাটা চলছে। ঘড়িতে বাজছে এগারোটা পঁয়ত্রিশ! ভুতুড়ে ঘড়ি তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মুরারিবাবুর হাত কাঁপতে থাকল। বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। ঘড়িটা প্যাকেটে ঢুকিয়ে আবার শক্তভাবে বাঁধাছাদা করে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে।
রাস্তাঘাট তখন জনশূন্য। ল্যাম্পপোস্টের আলো হলদে হয়ে পড়ে আছে। মাঝে মাঝে দু-একটা গাড়ি যাতায়াত করছে। মুরারিবাবু পাশের বিরাট ডাস্টবিনে ঘড়িটা ফেলবেন ভেবে পা বাড়িয়েছেন, আচমকা তার গায়ে জোরালো আলো পড়ল। অমনি দাঁড়িয়ে গেলেন।
গাড়িটা পুলিশের। দ্রুত কাছে এসে পড়ল। তারপর ঘঁাচ করে ব্রেক কষে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে একজন পুলিশ অফিসার নেমে বললেন,-কে আপনি?
মুরারিবাবু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আমি মুমু-মুরারিমোহন চাকলাদার।
–কোথায় থাকেন?
–ওই যে হলদে বাড়িটা দেখছেন স্যার, ওর দোতলায় স্যার।
–হুম! আপনার হাতে ওটা কী?
–ঘ-ঘ-ঘড়ি স্যার!
ঘড়ি! রাতদুপুরে ঘড়ি নিয়ে এখানে কী করছেন? কই, দেখি!–বলে পুলিশ অফিসার খপ করে ওঁর হাত থেকে প্যাকেটটা কেড়ে নিলেন। তারপর দড়ির বাঁধন খুলতে খুলতে বললেন,–এমন করে বেঁধে প্যাকেটে ভরেছেন কেন? আঁ? কী ব্যাপার?
মুরারিবাবু বললেন, স্যার! এটা একটা ভুতুড়ে ঘড়ি! তাই ফেলে দিচ্ছিলাম ডাস্টবিনে।
ভুতুড়ে ঘড়ি! পুলিশ অফিসার বাঁকা হেসে বললেন,–হুঁ– কী বলছেন? ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছিলেন! ভালো। গিরিধারী!
একজন কনস্টেবল লাফ দিয়ে নামল গাড়ি থেকে। তার পেল্লায় চেহারা দেখে মুরারিবাবুর প্রাণ প্রায় খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম। সে এসে তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াল।
পুলিশ অফিসার বললেন,–পাকড়ো! কার ঘড়ি চুরি করে পালাচ্ছে ব্যাটা!
গিরিধারী তার বিশাল থাবা মুরারিবাবুর রোগা হাড্ডিসার কাঁধে ফেলতেই তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন।
আসলে মুশকিল করেছে তার চেহারা আর পোশাক। বীরু তো সাধে বলে, না,–ও মামা, একটু ফিটফাট সেজেশুনে ভদ্রলোকের মতো থাকলে কী ক্ষতি হয়। আপনার?
মুরারিবাবু সাদাসিধে থাকেন।
