একটু পরে ওপরতলার ব্যালকনিতে ঝুঁকে প্রতিবেশী হারাধনবাবু ডাকলেন, মুরারিয়া! ও মুরারি! হল কী? এত চ্যাঁচামেচি কীসের?
কলিং বেল বাজল। অগত্যা মুরারিবাবু গিয়ে দরজা খুললেন। দেখলেন ওপরতলার হারাধনবাবু, পাশের দুটো ফ্ল্যাটের গোবিন্দবাবু মানিকবাবু আর মানিকবাবুর স্ত্রী ঘুমভাঙাচোখে হাজির হয়েছেন। দরজা খুলতেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, কী হয়েছে? এত হইচই হচ্ছে কেন?
এক কথায় মুরারিবাবু বললেন, রাঁচি যাব।
–রাঁচি। –হ্যারাধনবাবু খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলেন। হাসবারই কথা।
রাঁচিতে পাগলাগারদ আছে। কাজেই রাঁচি যাওয়া মানেই পাগল হয়ে যাওয়া।
গোবিন্দবাবু বললেন,-রাতদুপুরে রাঁচি যাবে মানে? মাথার গোলমাল হল নাকি? সর্বনাশ! অ্যাদ্দিন বলেনি কেন? আমার পিসেমশায়ের ছেলের ছোট খুড় শ্বশুরের জামাই তার ভাগ্নের কাকা বড় ডাক্তার!
মুরারিবাবু বিরক্ত হয়েছেন প্রতিবেশীদের এমন অবাঞ্ছিত কৌতূহলে। বললেন, বড়দার মেয়ের বিয়ে। বুঝলে? তাই ছটার ট্রেনে রাঁচি যাব।
তাই বলো! হারাধন হাসতে-হাসতে বললেন, কিন্তু তার জন্যে এই রাতদুপরে এমন ভূমিকম্প সৃষ্টি করছ কেন ভায়া? সবে শুয়ে ঘুমোব-ঘুমোব করছি, আর তোমার এই ডাকাতপড়া হুলুস্থুল!
–কোনও মানে হয়? গোবিন্দবাবু বললেন। আমরা ভাবলুম, আবার একটা ভুতুড়ে আলমারি এনেছ বুঝি! রাতদুপুরে আবার গণ্ডগোল বাধিয়েছ। হয়তো আবার দেখব, ভিরমি খেয়ে পড়ে আছে। তাই দৌড়ে এলাম।
হ্যাঁ–একবার চীনে পাড়ার দোকান থেকে একটা আলমারি কিনে এনে সে এক হাঙ্গামা হয়েছিল বটে। কিন্তু এঁরা রাতদুপুর-রাতদুপুর করছেন, এতেই মুরারিবাবুর রাগ হয়েছে। বললেন,-রাতদুপুর মানে কী? প্রায় এক ঘণ্টা আগে চারটে বেজে গেছে। এখন প্রায় পাঁচটা বেজে এল!
পাঁচটা! হারাধনবাবু খুব সময়সচেতন মানুষ। সবসময় হাতে ঘড়িটি বাঁধা থাকে। বিদেশি সওদাগরি আপিসের কেরানি। সায়েবদের সংসর্গে থেকে ঘড়ির কাটা ধরে চলেন সব কিছুতে। হাতের ঘড়িটি দেখে নিয়ে বললেন, তোমার মাথা খারাপ? মোটে বারোটা পঁয়ত্রিশ বাজছে।
মুরারিবাবু বললেন–অসম্ভব! আমার টেবিলঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া ছিল কাঁটায়-কাঁটায় চারটেয়। অ্যালার্ম শুনেই তো ঘুম ভেঙেছে। তারপর ঘণ্টাটাক ওদের ডাকাডাকি করছি।
ইতিমধ্যে অন্যান্য ফ্ল্যাটের কর্তগিন্নিরাও এসে ভিড় জমিয়েছেন। ব্যাপার জেনে কেউ-কেউ বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছেন। কেউ কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গজপতিবাবু একটু হেসে বললেন,–মুরারি, টেবিলঘড়ি কিনেছ বুঝি? হুঁ, বুঝেছি।
মুরারিবাবু বললেন, কী বুঝেছ শুনি?
ভায়া, টেবিলঘড়ির কথা আর বোলো না। বিশেষ করে অ্যালার্ম ঘড়িগুলো বড় গোলমেলে জিনিস, গজপতি বললেন,–অ্যালার্ম দেবে নটায়, বাজবে এগারোটায়। আজ অবধি একটাও অ্যালার্ম ঘড়ি দেখলাম না, যে সঠিক সময়ে বাজে।
সুরসিক হারাধনবাবু বললেন, বরং নিজে রাঁচি না গিয়ে তোমার ঘড়িটাকেই পাঠিয়ে দাও।
প্রতিবেশীরা হো-হো হি-হি খাক-খ্যাক করে হাসতে থাকলেন।
এই শুনে মুরারিবাবুর এত রাগ হল যে সবার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর সটান নিজের ঘরে চলে এলেন।
এসে টেবিলঘড়িটার দিকে তাকিয়ে অবাক। যখন অ্যালার্ম বেজেছিল, তখন ঘড়ির দিকে তাকাননি। কে-ই বা তাকায়?
ঘড়িতে বাজছে–সত্যি বাজছে বারোটা ছত্রিশ!
অথচ অ্যালার্মের কাঁটা দেওয়া আছে চারটেয়। তাহলে ঘড়ির অ্যালার্মে গণ্ডগোল আছে। মুরারিবাবু হতাশ হয়ে বসে পড়লেন। এই ঘড়িটা গতকাল বিকেলে কিনে এনেছেন পার্ক স্ট্রিটের একটা দোকান থেকে। বেশ বড় দোকান। হালফ্যাশানি জিনিস মুরারিবাবুর চক্ষুশূল। আজকাল সবকিছুতেই তো ভেজাল। তাই যে যুগে ভেজাল কেউ দিত না এবং ভেজাল দেওয়া পাপ মনে করত, সেই যুগের তৈরি জিনিস কিনতে মুরারিবাবুর আগ্রহ বেশি।
এই টেবিলঘড়িটা একশো বছর আগের তৈরি বিলিতি জিনিস। শো-কেসে সাজানো ছিল। দোকানদার কিছুতেই বেচবে না। জেদ করে অনেক চড়া দামে কিনে এনেছেন মুরারিবাবু। রাঁচি যাওয়ার জন্য ভোরে ওঠার দরকার ছিল।
কিন্তু বিলিতি অ্যালার্ম ঘড়ি যে এমন অদ্ভুত কাণ্ড করবে ভাবতেও পারেননি।
অবশ্য মুনিনাঞ্চ মতিভ্রম বলে শাস্ত্রবাক্য আছে। মুনিদেরই ভুল হয়। তো, এ একটা ঘড়ি। অতএব মুরারিবাবু অ্যালার্মের কাটা চারটেতে রেখেই অ্যালার্মের চাবি ঘুরিয়ে ভালোমতো দম দিলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন।
পাশের ঘরে বীরু আবার বালিশের দিকে ঠ্যাং করে শুয়ে পড়েছে কখন। অকাতরে ঘুমোচ্ছে। দেরি ছিল মুরারিবাবুর।
সেই ভোরে অ্যালার্ম কিন্তু আর বাজেইনি। মুরারিবাবুর রাঁচি যাওয়া হয়নি ছটার ট্রেনে। গিয়েছিলেন পরের ট্রেনে বিকেলবেলা।
ফিরে এলেন দিন তিনেক পরে। হাওড়া পৌঁছতে রাত নটা বেজে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরতে দশটা হল। ট্রেন জার্নিতে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন এগারোটা নাগাদ। সবে ঘুমের আমেজ এসেছে, আচমকা অ্যালার্ম বেজে উঠল। অ্যালার্মের দম তো দেওয়া ছিল না।
ঘড়িতে তখন ঠিক এগারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ।
বিরক্ত হলেন মুরারিবাবু। কিন্তু কী আর করবেন তখন? ঘড়ির দোকানে দেখাতে হবে। সকাল হোক।
পরদিন ঘড়ি মেরামতের দোকানে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনলেন। কিন্তু কোনও ত্রুটি ধরা পড়ল না। যন্তর ঠিক আছে। এতটুকু গণ্ডগোল নেই। বরং ঘড়িটার খুব তারিফই শুনে এলেন মিস্ত্রি ভদ্রলোকের কাছে।
