সে-রাতেও খুব হইহই কাণ্ড হয়েছিল। বীরু ও জটিল ভেবেছিল, মুরারিবাবুকে ডাকাতে বুঝি খুন করেছে। পাড়াসুদ্ধ লোক জড়ো হয়েছিল। পুলিশও এসেছিল। কিন্তু কোথায় খুন–ডাকাতই বা কোথায়! মুরারিবাবু অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন আলমারিটার সামনে। ডাক্তারবাবু এসে ওষুধ দিলে জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলেই বললেন,–আলমারি হটাও।
পরের দিন টেম্পো ভাড়া করে আলমারিটা নিয়ে গেলেন চ্যাং চুং ফুঃ কোম্পানির দোকানে। সেই চীনা কর্মচারীটি একগাল হেসে বলল, আসুন বাবু! এত দেরি হল যে?
মুরারিবাবু তেতো হয়ে বললেন…কীসের দেরি?
–এর আগে যারা নিয়ে গেছেন পরদিনই ফেরত এনেছেন। আপনি বাবুজি পাঁচদিন পরে আনলেন যে?
আমার খুশি! বলে মুরারিবাবু আলমারিটা আগের জায়গায় রাখবার ব্যবস্থা করে চলে আসছেন–চীনা কর্মচারী তার সঙ্গে সঙ্গে দরজা অবধি এল, ফিসফিস করে জানাল,–জিনিস ভালো। তবে বড্ড গোলমাল করে। হো হো হুয়া সাহেবের আলমারি। ডাকাতেরা ওঁকে খুন করে ওর মধ্যে ভরে রেখে গিয়েছিল। একবছর পরে তালা ভেঙে তবে ব্যাপারটা জানা যায়। মরচে ধরে গিয়ে খুব আওয়াজ হয়েছিল খোলার সময়। পালিশ করে সব ঠিকঠাক হয়েছে। শুধু আওয়াজটা বন্ধ করা যায়নি। আচ্ছা বাবু, আবার আসবেন। নমস্কার!…
মুরারিবাবুর টেবিলঘড়ি
ক্রিরর র র ং…
মুরারিবাবু তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলেন বিছানা থেকে। তারপর আলো জ্বেলে দিলেন। ভোর চারটেয় অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলেন টেবিলঘড়িতে। ঠিক ছটায় হাওড়া স্টেশনে ট্রেন। প্ল্যাটফর্ম নম্বরও মুখস্থ করে রেখেছেন। রাস্তার মোড়ে ট্যাক্সি পেতে অসুবিধে হবে না। সাড়ে পাঁচটায় বেরুলেই চলবে।
রাঁধুনি-কাম-ভৃত্য জটিলকে এবার ঘুম থেকে ওঠাতে হবে। অন্তত এককাপ চা না খেলে ঘুমের আড়ষ্টতা কাটবে না। তবে জটিলের ঘুমটা পাতলা। সমস্যা হবে ভাগ্নে বীরুকে নিয়ে। সে একটি কুম্ভকর্ণ। হাতের এই দেড়ঘণ্টা সময়ের আধঘণ্টা তাকে ঘুম থেকে ওঠানোর কাজে বরাদ্দ করে রেখেছেন মুরারিমোহন। জিনিসপত্র রাতে শুতে যাওয়ার আগে গোছানো হয়েছে। কাজেই ব্যস্ততার দরকার ছিল না।
কিন্তু মুরারিবাবুর স্বভাব হচ্ছে এই। সব ব্যাপারেই হিসেব করে চলেন, যাতে পরে পস্তাতে না হয়। তাই একটু ব্যস্তবাগীশ হয়ে পড়েন।
অ্যালার্ম থামতে-থামতে তার বাথরুমে ঢোকা হয়ে গেছে। প্রাতঃকৃত্য সেরে সোজা চলে গেলেন কিচেনের সামনেকার খোলা বারান্দায়। খাঁটিয়া পেতে জটিলেশ্বর ঘুমোচ্ছে। ঘড়র-ঘড়র নাক ডাকছে। মুরারিবাবু ডাকলেন,–জটে! জটিল রে। ওঠ, ওঠ।
জটিলের নাক ডাকা থামল। মুরারিবাবু ফের সস্নেহে ডাকলে সে চোখ বুজে থেকেই জড়ানো গলায় বলল,–দেরি আছে।
মুরারিবাবু বললেন,–দেরি নেই। চারটের অ্যালার্ম বেজে গেছে। উঠে পড় বাবা!
জটিল একইভাবে চোখ বুজে এবং পাশ ফিরে বলল,–দেরি আছে।
মুরারিবাবু রেগে গেলেন। তার গায়ে হাত রেখে একটু ঠেলে বললেন, কী দেরি আছে বলছিস! ওঠ, ওঠ। চায়ের জল চাপা। আমি বীরুকে ওঠাই।
জটিল শুধু বলল, ঠিক আছে।
তখন আশ্বস্ত হয়ে মুরারিবাবু পাশের ঘরে গিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। বীরু বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমোচ্ছ। এইবার আধঘণ্টা সময় তার পিছনে জোঁকের মতো লাগতে হবে। আজ তো না লেগেও উপায় নেই। যার ঘুম আটটার আগে ভাঙে না, তাকে ভোর চারটেয় ওঠানো সহজ নয়।
মুরারিবাবু ভাগ্নেকে প্রথমে গুতোগুতি, পরে ঠেলাঠেলি, শেষে তার কানে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করলেন। তাতেও বীরুর কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। তখন মুরারিবাবু তার লম্বা চুল টানাটানি করতে থাকলেন। এবার বীরু বলল, কী করিস মাইরি! ভাল্লাগে না!
মুরারিবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, আমি রে, আমি। ওঠ বাবা। ট্রেন ফেল হয়ে যাবো। উঠে পড়।
বীরুর আর সাড়া নেই।
তখন মুরারিবাবু বিরক্ত হয়ে ওর দুকাঁধ ধরে টেনে ওঠালেন এবং বিছানায় বসিয়ে দিলেন। চোখ বন্ধ আছে বীরুর। সে বসে এদিক-ওদিক টলতে থাকল। তারপর গড়িয়ে পড়ল ফের।
মুরারি ভাগ্নেকে আবার অমনি করে ওঠালেন। আবার বসে থেকে চোখ বুজে টলতে টলতে বীরু বিছানায় গড়াল।
আর সহ্য করতে পারলেন না মুরারিবাবু। মেঘের মতো গর্জে ডাকতে শুরু করলেন, বীরু, অ্যাই বীরে! অ্যাই হতচ্ছাড়া। অ্যাই পাজি! ওরে কুম্ভকর্ণ! ওরে ভূত!
কিন্তু কাঁহাতক ডাকা যায়! আর কী বলেই বা ডাকা যায়? ডাকাডাকির সঙ্গে ঠেলাঠেলি, গুঁতোগুতি, সুড়সুড়ি, কাতুকুতু সমানে চালিয়ে যাচ্ছেন। আধঘণ্টা সময় বরাদ্দ করা আছে। কাজেই মুরারিবাবু নিজের কর্মসূচিই রূপায়িত করছেন বলা যায়।
কতক্ষণ পরে শ্রীমান বীরুর সাড়া পাওয়া গেল। চোখ খুলে পাতা পিটপিট করে বলল,-কী হয়েছে?
–ওঠ। উঠে পড়। কখন চারটে বেজে গেছে। তোর দেখছি সবদিনই সমান ঘুম!
দিন না রাত? –বলে বীরু উঠে বসল। বিরক্তমুখে বলল ফের, আমি কি দিনে ঘুমোই?
মুরারিবাবু হাসতে-হাসতে কিচেনের অবস্থা দেখতে গেলেন। গিয়েই অবাক হলেন। জটিল তেমনি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।
খাপ্পা হয়ে মুরারিবাবু তার কান ধরে গর্জালেন, জটে! তুলে ফেলে দেব রাস্তায়। হতচ্ছাড়াকে চায়ের জল চাপাতে বললাম। আর কিনাফের নাক ডাকাতে
শুরু করেছে? আই বাঁদর! ওঠ!
জটিল আগের মতো জড়ানোগলায় বলল,–দেরি আছে।
তখন মুরারিবাবুর রাগ চড়ে গেল মাথায়। ওর খাঁটিয়াটা খটাখট নাড়া দিয়ে এবং চ্যাঁচিমেচি করে হুলুস্থুল বাধিয়ে ফেললেন। ওপরতলায় এবং পাশের ফ্ল্যাটে নড়াচড়া ও কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
