বলে পাঞ্জাবির ভেতর পকেট থেকে যা হাতে এল, চোখ বুজে টেবিলে রেখে দিলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আশা করি, আলমারিটা এখন আমি নিয়ে যেতে পারি।
স্বচ্ছন্দে। –বলে চীনা-ভদ্রলোক ঘণ্টার বোম টিপলেন। একজন কর্মচারী এসে ঢুকল, তখন বললেন, ইনি আলমারিটা কিনেছেন। যাও, কুলির ব্যবস্থা করো।
আলমারি তো পৌঁছে গেল। মুরারিবাবুর শোওয়ার ঘরে জায়গামতো দাঁড় করিয়ে চ্যাং চুং ফুঃ কোম্পানির কুলিরা চলে গেল। ভাড়া দিতে গেলেন, ওরা নিল না। ক্যারিং চার্জ কোম্পানির। বাড়তি পয়সা নিলে ওদের ছাঁটাই করে দেবে কোম্পানি। এমনই কড়া নিয়ম।
জটিল আর বীরু আলমারিটা দেখে খুব প্রশংসাই করল। মুরারিবার তাদের ব্যাপারটা টের পাইয়ে দিতে চাবি বের করলেন। তারপর পাল্লার হাতল ধরে টান দিলেন। অমনি মনে হল, কানের ভেতর গরম সীসে ঢুকে যাচ্ছে। বাড়িসুদ্ধ একেবারে কেঁপে উঠেছে। জটিল দুকানে হাত ঢেকে বাপ রে–বলে লাফিয়ে উঠেছে। বীরু প্রায় ভিরমি খাওয়ার দশা। সে চেঁচিয়ে উঠল,–ও মামা। এ যে সাংঘাতিক ব্যাপার।
মুরারিবাবু চমকে গিয়েছিলেন। এ-বাড়ি এসে যেন আওয়াজটা তিনগুণ বেড়ে গেল! দোকানে তো এত বেশি আওয়াজ হয়নি। কিন্তু কথাটি আর বললেন না। মুচকি হাসলেন শুধু।
বীরু বলল, মামা, অয়েলিং করা দরকার। নয়তো আর সব ফ্ল্যাটের লোক থানা-পুলিশ করে বসবে। ডিসটার্ব হবে যে!
মুরারিবাবু তাচ্ছিল্য করে বললেন,-হাতি করবে। ঘোড়া করবে। আমি কারুর ডিসটার্ব হবে বলে আলমারি খুলতে পারব না? আবদার আর কী।
বীরু আবার বলল–অয়েলিং করলেই তো হয়।
মুরারিবাবু ফাঁচ করে হেসে বললেন,–বেশ তো, অয়েলিং করে দ্যাখ না তুই। যদি আওয়াজ বন্ধ হয়, তো হোক!
বীরু দৌড়ে কিচেন থেকে নারকেল তেলের শিশি নিয়ে এল। তারপর পাল্লার কবজাগুলোতে ঢেলে দিল। পাল্লা বন্ধ করে বলল,-দেখছ? আর কোনও শব্দ নেই?
মুরারিবাবু মিটিমিটি হেসে বললেন, । এবার খোল তো দেখি।
বীরু যেই হাতল ধরে টেনেছে, অমনি যেন আবার কানে গরম সীসে ঢুকে পড়েছে। এবার আওয়াজটা আরও বেশি। আরও বাড়িকাঁপানো। যেন প্লেন ঢুকে পড়েছে ঘরের মধ্যে। ওদিকে সারা বাড়ি হুলুস্থুল। অন্য ফ্ল্যাটের লোকেরা বেরিয়ে পড়েছে। তাদের ধারণা, ওপরতলার ছাদ বুঝি ধসে পড়েছে। সে এক হইহই কাণ্ড। চ্যাঁচামেচিতে রাস্তায় ভিড় জমে গেল দেখতে-দেখতে। কারা চেঁচিয়ে বলতে থাকল, দমকল! পুলিশ!
মুরারিবাবু থ। একেবারে কাঠপুতুল। মুখে কথা নেই। হ্যাঁ, এজন্যেই চ্যাং চুং ফুঃ কোম্পানি আলমারিটা তাঁকে গছিয়ে দিয়েছে। সব রহস্য বোঝা গেল বটে।
ওদিকে লোকেরাও অবাক। কোথাও তো কিছু ভেঙে পড়েনি। অথচ আওয়াজটা ঠিকই শোনা গেছে। এক ফ্ল্যাটের লোকেরা অন্য ফ্ল্যাটের লোককে জিগ্যেস করে বেড়াচ্ছে, কীসের শব্দ হল বলুন তো? মুরারিবাবুর ফ্ল্যাটেও এল কেউ-কেউ। বুদ্ধিমান জটিল দরজা থেকে বিদায় করে বলল,-প্লেন যাচ্ছিল। আবার কী?…..
এই অদ্ভুত আলমারি কিনে মুরারিবাবু সমস্যায় পড়ে গেলেন। কোনও কাজেই লাগানো যাবে না যে! জিনিসপত্র রাখতে হলেই খুলতে হবে। এবং যা বোঝা যাচ্ছে খুললেই প্রতিবার আওয়াজ ক্রমশ বাড়তে থাকবে। প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার তিনগুণ বেড়েছে। তৃতীয়বার বেড়েছে আরও তিনগুণ যেন। চতুর্থবার খুললে না জানি কী প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড হবে। তাই বন্ধ করে রেখে দিয়েছেন। একটা কাজ অবশ্য হচ্ছে। চুল আঁচড়ানো আর দাড়ি কামানো। আয়নাটা খুব ভালো। পরিষ্কার প্রতিমূর্তি ফোটে। বরং চেহারা যেন সুন্দরতর দেখায়। মুরারিবাবু নিজের চেহারা সম্পর্কে এতকাল খুঁতখুঁতে ছিলেন। তার নাকটা বেজায় লম্বা এবং ডগাটা থ্যাবড়া। স্বাস্থ্যও লিকলিকে। কিন্তু এখন এই আয়নার সামনে দাঁড়ালে কী চমৎকার না দেখায়।
আলমারিটা ফেরত দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু শুধু আয়নাটার খাতিরেই রেখে দিলেন!
এক রাত্রে মুরারিবাবু শুতে যাওয়ার আগে অভ্যাসমতলা চুল আঁচড়াচ্ছেন। হঠাৎ চমকে উঠে দেখলেন আয়নার মধ্যে, তাঁর পিঠের কাছে একটা বেঁটে চীনা লোক দাঁড়িয়ে আছে।
মুরারিবাবু সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরলেন। কিন্তু আশ্চর্য! চীনা কেন, কোনও লোকই তাঁর পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে নেই! তাহলে কি চোখের ভুল? আয়নার দিকে আবার ঘুরলেন! আর ঘুরেই চমকে উঠলেন। হ্যাঁ, দিব্যি পিঠের কাছে চীনা লোকটা দাঁড়িয়ে আছে এবং মিটিমিটি হাসছে।
ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। এ যে মারাত্মক ভুতুড়ে কাণ্ড! মুরারিবাবু বরাবর সাহসী এবং জেদি মানুষ। কিন্তু ব্যাপারটা দেখে তাঁর গাঁয়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। তক্ষুনি দুহাতে চোখমুখ ঢেকে কাঁপতে কাঁপতে খাটে গিয়ে বসে পড়লেন।
একটু পরে ধাতস্থ হয়ে ভাবলেন, নাঃ, চোখের ভুল ছাড়া কিছু নয়। হ্যাঁলুসিনেশান নামে একটা ব্যাপার আছে। মানুষ অনেক সময় ভুল দেখে। কারুর কারুর ওই একটা স্থায়ী মানসিক ব্যাধি। তাঁর সেই ব্যাধি-ট্যাধি হয়নি তো?
তা কেন হবে? দিব্যি সুস্থ মানুষ। কোনও রোগবালাই নেই। মাথাও ধরে না। ঘুমও ভালো হয়। খিদে হয়।
মুরারিবাবু আবার সাহস করে আয়নার সামনে গেলেন। তারপর তাকালেন। ওরে বাবা! এবার যে আরও সাংঘাতিক ব্যাপার। সেই বেঁটে চীনা লোকটির গলার কাছটা কাটা এবং গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে। অথচ সে কেমন মিটিমিটি হেসে তাকিয়ে আছে। আর সহ্য করতে পারলেন না মুরারিবাবু! পরিত্রাহি আর্তনাদ করে উঠলেন, খুন! খুন! খুন!
