অতএব এক রোববার সকাল নটায় গিয়ে হাজির হলেন চ্যাং চুং ফুঃ কোম্পানির দোকানে। বিশাল দোকান। হরেকরকম বনেদি আসবাবে ভর্তি। তার মধ্যে খুঁজে খুঁজে কোণার দিকে একটা ছাইরঙা স্টিলের আলমারি পছন্দ হল। বেশ বড় আলমারি। একটা আয়নাও লাগানো রয়েছে। দোকানের চীনা কর্মচারী মুরারিবাবুর আগ্রহ দেখে বলল,–পছন্দ যখন হয়েছে, এক কাম করুন বাবু। বড়সাকে গিয়ে বোলেন, দু দশ রুপেয়া জাস্তি দিলেই আপনার হয়ে যাবে।
মুরারিবাবু অবাক হয়ে বললেন,–কেন? এটা বুঝি নিলামে বেচা হবে না?
না বাবু। কর্মচারীটি জানাল। এটা বাড়তি মাল আছে। দেখছেন না, সেজন্যেই এটা একধারে তফাত করে রাখা হয়েছে?
মুরারিবাবু ভাবলেন, তাই বটে। আলমারিটা সেজন্যই আলাদা রাখা আছে এবং এটার ধারেকাছে কেউ আসছে না। কিন্তু নিলামি জিনিস না হলে যে দাম বেশি পড়ে যাবে। তাহলে নতুন কেনাই তো ভালো। বললেন, তাহলে এটার দরকার নেই। নিলামি জিনিস কোথায় আছে দেখা যাক।
চীনা কর্মচারী এবার ওঁর কানে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, আমার কথা শুনুন বাবু। এ বহুত ভালো মাল আছে। আজকাল এমন আলমারি পাবেন না কোথাও। বড়াসাবকে গিয়ে ধরুন, কম দামে মিলে যাবে।
মুরারিবাবু অবাক হলেন। ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক। বললেন, কই, খুলে দেখাও তো, দেখি ভেতরটা কেমন?
কর্মচারীটি পকেট থেকে চাবি বের করে আলমারিটা খুলতেই ঘ্যাঁ-অ্যা-চ করে মারাত্মক আওয়াজ হল। এমন বিতিকিচ্ছিরি আওয়াজ যে, ঘরসুদ্ধ লোক চমকে উঠল। মুরারিবাবুরও পিলে চমকে ওঠার দাখিল। কর্মচারীটি একগাল হেসে বলল, মাত ঘাবড়াইয়ে বাবু। ভালো আলমারির এটাই তো গুণ। চোর-ডাকু খুললেই আপনি জানতে পারবেন। ধরা পড়ে যাবে সঙ্গে-সঙ্গে। হাঃ-হাঃ-হাঃ।
আলমারিটা ওয়াড্রোবিও বটে। কাপড়জামা টাঙানোর ব্যবস্থা আছে। টাকাপয়সা, সোনাদানা রাখার লকার আছে। দলিলপত্র, ফাইল রাখার তাক আছে। ভেতরে কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। যেন নেশা ধরে যায়। দেখেশুনে মুরারিবাবু যেন বড্ড মায়ায় পড়ে গেলেন আলমারিটার। ঝোঁক চেপে গেল, এটা কিনতেই হবে।
চীনা কর্মচারীটি বলল,–পসন্দ হল তো হবেই তা জানা কথা! এখন চলেন, বড়সাহেবের কাছে নিয়ে যাই আপনাকে।
আলমারির পাল্লা বন্ধ করতে কিন্তু একটুও শব্দ হল না। এ তো ভারি অবাক আলমারি! মুরারিবাবু খুশি হলেন। খুললে বিকট আওয়াজ হচ্ছে! হোক না। ক্ষতি কী? যখনই অন্য কেউ তার অজান্তে খুলতে যাবে, তিনি টের পাবেন। তার ওপর আসল কথা, তিনি একা মানুষ। বাড়িতে থাকবার মধ্যে এক ওই গুণধর ভাগ্নে বীরু, আর ঠাকুর কাম-ভৃত্য জটিল ওরফে জটা। দুটিই মহা ধড়িবাজ চোর। সেজন্যেই তো এই আলমারি কেনার কথা মাথায় এসেছিল। কিন্তু এবার? এবার তোরা কীভাবে চুরি-চামারি করবি দেখা যাবে। মুরারিবাবু যত একথা ভাবলেন, তত জেদ চড়ে গেল মাথায়। যত টাকা লাগুক কিনতেই হবে আলমারিটা।
পার্টিশনের আড়ালে একটা চেম্বারে তাঁকে নিয়ে গেল কর্মচারীটি। মুরারিবাবু দেখলেন, ইয়া হোঁতকা মোটা গোলগাল প্রকাণ্ড আর একজন চীনা-ভদ্রলোক বসে আছেন। একটু হেসে খুব খাতির দেখিয়ে ইংরাজিতে বললেন, বসুন স্যার। বলুন, কী করতে পারি?
মুরারিবাবু বললেন,–ওই আলমারিটা…
কথা কেড়ে ভদ্রলোক বললেন,–বুঝেছি, বুঝেছি। বেশ তত নিয়ে যান।
বলে কী! বিনিদামে দেবে নাকি–এমনভাবে বলছে কথাটা?
মুরারিবাবু বললেন, কিন্তু দাম-টাম কীরকম লাগবে যদি বলেন!
চীনা-ভদ্রলোক কুমড়োর মতো রাঙা ও বৃহৎ মুখে বিরাট হাসি ফুটিয়ে বললেন, আপনার যা খুশি দেবেন! ব্যস! আমি কিছু বলব না!
সে কী!–ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন মুরারিবাবু। ঠাট্টা করছে নাকি?
–হ্যাঁ স্যার। পছন্দ যখন হয়েছে, নিয়ে যান।
তার মানেটা কী বুঝিয়ে বলবেন?–মুরারিবাবু জিগ্যেস করলেন।
এবার চীনা-ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে বললেন,–ওই আলমারির মালিক ছিলেন হো হো হুয়া নামে আমার এক বন্ধু। এখন তিনি হংকংবাসী। যাওয়ার আগে ওটা আমাকে দিয়ে বলে গেছেন যেন জিনিসটার দাম নিয়ে কারও সঙ্গে দরাদরি না করি। কেউ যদি খুব পছন্দ করে কিনতে চায়, সে হাতে তুলে যা দেবে, আমাকে নিতে হবে।
মুরারিবাবু অবাক হয়ে বললেন, তা আমি ছাড়া আর কারুর পছন্দ হয়নি বুঝি?
ঘাড় নাড়লেন ভদ্রলোক, হয়নি।
কেন পছন্দ হয়নি? জিনিসটা তো ভালোই মনে হল। মুরারিবাবু বললেন।
চীনা-ভদ্রলোক বললেন,–এই বিশ্রী আওয়াজটার জন্যে। বুঝলেন কিনা? আজকাল লোকের যেন ভারি অদ্ভুত মনোভাব। আলমারি হোক, আর মোটরগাড়ি হোক আওয়াজ বরদাস্ত করতে পারে না। সাইলেন্সর লাগায় গাড়ির ইঞ্জিনে। বুঝলেন কিনা?
মুরারিবাবু বুঝলেন আবার বুঝতেও পারলেন না। আওয়াজের কথা বলছে কিন্তু পাড়ায় যে অষ্টপ্রহর মাইকে হিন্দি গান বাজে, তার বেলা? তখন তো দিব্যি সয় সবার। বললেন,–একটু তেল-টেল দিলেই তো আওয়াজটা বন্ধ হয়ে যায়। এটা কারুর মাথায় আসেনি?
ভদ্রলোক আবার হাসলেন, না স্যার। ও আওয়াজ দু-চার কুইন্টাল তেল ঢেলেও বন্ধ হওয়ার নয়! ওটাই তো ওর মজা। কিন্তু কে কাকে বোঝায়? তাছাড়া আলমারির এরকম আওয়াজ থাকা তো ভালোই। চোর-ডাকাত যদি…
বাধা দিয়ে মুরারিবাবু বললেন,–দেখুন। আমার যখন পছন্দ হয়েছে, জিনিসটা আমি নেব। ন্যায্য দাম দিয়েই নেব।
