কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে আবার পূর্ণিমার জ্যোৎস্না ফুটল। আমরা বাড়ির পথ ধরলুম। খোয়া-বিছানো পথ বলে কাদা নেই। ছোটমামা মুরগিটা বুকের কাছে যত্ন করে ধরে গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে চলেছেন। খোলামেলা মাঠের মাঝামাঝি একটা খালপোল। সেখানে কালো হয়ে কে দাঁড়িয়ে আছে দেখে চাপাস্বরে বললুম,–ও ছোটমামা! সেই নররাক্ষসটা নয়তো?
ছোটমামা থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে বললেন, কে ওখানে?
পাল্টা চ্যালেঞ্জ শোনা গেল,–তোমরাই বা কে হে?
ছোটমামা খাপ্পা হয়ে বললেন,–আমরা যেই হই। তুমি ভূতের মতো ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছ?
–কী বললে? কী বললে? ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছি?
–হ্যাঁ। তাই তো আছে।
–আমি ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছি? মানে, তুমি মতো বলছ?
–মতো বলছি ভদ্রতা করে। নইলে—
কালো মূর্তিটা ছোটমামার কথার ওপর বলে উঠল, নইলে?
–নইলে ভূতই বলতুম।
–যাকগে! ভদ্রতার দরকার নেই। তুমি তা-ই বলো। মতো শুনে-শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। মতো কেন বলবে? মানুষকে মানুষের মতো বলাটা অপমান নয়? যে যা, তাকে তাই বলা উচিত।
ছোটমামা হেসে ফেললেন। বাব্বা! তুমি কি ভূত নাকি যে ভূত বলব?
–একশোবার বলবে।
–কী আশ্চর্য! তুমি ভূত?
–সেন্ট পারসেন্ট। একেবারে বিশুদ্ধ খাঁটি ভূত।
ছোটমামার মেজাজ এই ভালো, এই খারাপ। ফের রেগে গিয়ে বললেন, তুমি যদি খাঁটি ভূত, তাহলে প্রমাণ দাও।
–কী প্রমাণ চাও বলো!
–তুমি অদৃশ্য হও।
সেটাই তো হয়েছে প্রবলেম রে ভাই!–ভূতের দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
ছোটমামা বললেন, কী প্রবলেম?
–অদৃশ্য হতে পারছি না। মাঝে-মাঝে এটা হয়, বুঝেছ? আসলে টাটকা ভূত তো। তাই অনেক কষ্ট করে যদি বা রূপ ধরতে পারি, ঝটপট অদৃশ্য হতে পারিনে। ট্রেনিংয়ের জন্য টিচার খুঁজে বেড়াচ্ছি। পাচ্ছিনে। শুনেছিলুম, এই খালপোলে এক মামদো থাকে। সে নাকি উইকের জ্বাশকোর্সে ঝটপট ভ্যানিশ হওয়া শেখায়। কিন্তু কোথায় সে? তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি।
ছোটমামার গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে ছিলুম। ফিসফিস করে বললুম,–সেই মন্তরটা, ছোটমামা!
ছোটমামা নিশ্চয় ভুলে গিয়েছিলেন। বললেন,-হ্যাঁ, শোনো হে ভূতচন্দর! তোমাকে এক্ষুনি ভ্যানিশ করে দিচ্ছি।
ভূত পেতনি ভুতুম
দেখাং যদি পেতুম।
ধরেং ধরেং খেতুম।
ভূতটা অমনি ডিগবাজি খেতে-খেতে অদৃশ্য হয়ে গেল। ছোটমামা খিকখিক করে খুব হেসে বললেন,–আয় পুঁটু! বলেছিলুম না মোনাদার ক্ষমতার তুলনা হয় না?
সেই সময় খালপোলের নিচের দিক থেকে কেউ হেঁড়ে গলায় বলে উঠল, কী হে ছোকরা, আমার হবু-ট্রেনিকে ভাগিয়ে দিলে? কবরখানায় ট্রেনিং দিয়ে এসে সবে দুমুঠো খেতে আসছি, আর তুমি কিনা–রোসো! দেখাচ্ছি মজা!
খালপোলের ও-মাথায় আবার একটা কালো মূর্তি দেখা গেল। এই মূর্তিটা বেশ মোটাসোটা। ছোটমামা সেই মন্তরটা পড়তে যাচ্ছেন, সে খ্যাখ্যা করে অদ্ভুত হেসে বলল,–মোনা-বুজরুকের মন্তরে কাজ হবে না হে ছোকরা। আমি যে-সে ভূত নই, মামদো!
ছোটমামা খুব হাঁকডাক করে মন্তরটা আওড়ালেন। কিন্তু মামদোর কিছু হল না। সে তেমনি খ্যাখ্যা করে হাসতে থাকল! তখন ফিসফিস করে বললুম,–ছোটমামা! ওকে বরং মুরগিটা দিয়ে দিন।
ছোটমামা চটে গিয়ে বললেন,–দিচ্ছি মুরগি!
মামদোর কানে যেতেই সে কয়েক পা এগিয়ে এল! মুরগি দিচ্ছ তুমি? বাঃ। তুমি তো তাহলে বড় ভালো। দাও, দাও! আহা কতদিন মুরগি খাইনি!
ছোটমামা চ্যাঁচামেচি করে বললেন,–দেব না!
মামদো এক-পা এগিয়ে এল। তারপর লম্ফঝম্প নাচের সঙ্গে ঘ্যানঘেনে গলায় বলতে লাগল,
কেতন রোজ বাদ মুরগা খায়েগা হাম
সুরুয়া পিয়েগা হাম
হাড্ডি খায়েগা হাম।।
কুড়মুড়াকে মুড়মুড়াকে
হাড্ডি খায়েগা হাম!!
নাচের চোটে কাঠের পোল মচমচ করে কাঁপতে থাকল। সে নাচতে নাচতে কাছে আসতেই ছোটমামা মুরগিটা খালের দিকে ছুঁড়ে ফেললেন। কিন্তু কী আশ্চর্য, মুরগিটা কোঁ-কোঁ করতে করতে ডানা মেলে উড়ে গেল।
আমার মামদোও জ্যোত্সাভরা মাঠে মুরগি ধরতে দৌ। ছোটমামা পা বাড়িয়ে বললেন,–পালিয়ে আয়, পুঁটু!
দুজনে দৌড়তে শুরু করলুম। অনেকটা দৌড়নোর পর থেমে গিয়ে ছোটমামা বললেন,–মামদো যতই চেষ্টা করুক, নররাক্ষসের মুরগি ধরতে পারবে না। তবে বলা যায় না, এতক্ষণ হয়তো নররাক্ষসও তার মুরগির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। তা যদি পড়ে, বুঝলি পুঁটু? একখানা দেখবার মতো ডুয়েল হবে বটে। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে মুরগিটা ধরে এনেছিলুম। নইলে মামদো আজ কেলেঙ্কারি করে ছাড়ত।
ছোটমামা খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। বললুম, আর এখানে নয় ছোটমামা! শিগগির বাড়ি চলুন।–
মুরারিবাবুর আলমারি
মুরারিবাবুর একটা আলমারি কেনার দরকার ছিল। কাঠের আলমারি আজকাল কেউ পছন্দ করে না। স্টিলের আলমারির রেওয়াজ বেড়েছে। ওঁর বন্ধুরা পরামর্শ দিয়েছিলেন-ভালো কোম্পানির নতুন স্টিলের আলমারির যা দাম, তার চেয়ে বরং টেরেট্টি বাজার কিংবা চীনাবাজারে গিয়ে নিলামি জিনিস খুঁজে কেনো। দাম কম পড়বে। জিনিসও পাবে খাঁটি। আজকাল ভেজাল জিনিসে বাজার ছেয়ে গেছে।
মুরারিবাবুর মনে ধরেছিল কথাটা। খোঁজ নিয়ে জানলেন, ওই এলাকায় চ্যাং চুং ফুঃ কোম্পানির নিলামি কারবার আছে। ফিরোববার সেকেলে নায়েবি আমলের আসবাবপত্র নিলাম হয়।
