ছোটমামা মুখে রহস্য ফুটিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বললেন, গোপনে তন্ত্রসাধনা করছে, বুঝলি পুঁটু? ওকে এ সময় ডিসটার্ব করাটা রিস্কি।
কিন্তু তখনই বটগাছের আড়াল থেকে মোনা-ওঝা বেরুল। তার হাতে একটা মড়ার খুলি দেখে এবার বুকটা ধড়াস করে উঠল। ছোটমামা কাচুমাচু মুখে বললেন,-কিছু মনে কোরো না মোনাদা। এই পুঁটুটার জন্য তোমার কাছে আসতে হল।
মোনা ওঝা আমার দিকে লাল চোখে তাকিয়েই ফিক করে হাসল। অমনি আমার ভয়টা কেটে গেল। ওপর পাটির দুটো দাঁত না থাকায় তার হাসিটা সত্যিই হাসিয়ে ছাড়ে। ছোটমামা আমাকে ইশারায় হাসতে বারণ করলে কী হবে?
মোনা-ওঝা বলল, ব্যস। ব্যস! পুটুবাবুর ওপর যে পেতনিটার নজর লেগেছিল, সে পালিয়ে গেল। ওই দ্যাখো, যাচ্ছে। সে মড়ার খুলিসুদ্ধ হাতটা তুলে দূরে স্কুলবাড়ির দিকটা দেখাল। পেতনিটা থাকে ইস্কুলের পেছনে ওই তালগাছের ডগায়। দ্যাখো, তালপাতাগুলো কেমন নড়ছে। দেখতে পাচ্ছ তো?
আমি তেমন কিছু দেখতে পেলুম না। কিন্তু ছোটমামা দেখে নিয়ে বললেন, হুঁ, নড়ছে বটে। তবে মোনাদা, এর একটা স্থায়ী প্রতিকার করো। পেতনিটার নজর লাগার জন্যই পুঁটু রাতবিরেতে বড্ড ভয় পায়।
মোনা-ওঝা বলল,-একটাকা দক্ষিণে লাগবে ছোটবাবু।
পকেট থেকে একটা টাকা বের করে ছোটমামা বললেন,–এই নাও। কিন্তু মোনাদা, একেবারে স্থায়ী প্রতিকার চাই। পুঁটু যেন আর রাতবিরেতে আমার সঙ্গে বেরিয়ে একটুও ভয় না পায়।
টাকাটা নিয়ে চুড়োবাঁধা জটার ভেতর খুঁজে মোনা-ওঝা বলল,–তাহলে বরঞ্চ তুমিই এই মন্তরটা শিখে নাও ছোটবাবু! ও ছোট ছেলে। ঠিকমতো মন্তরটা বলতে না পারলেই কেলেঙ্কারি। নাও, মুখস্থ করো?
ভূত-পেতনি ভুতুম
দেখাং যদি পেতুম
ধরেং ধরেং খেতুম।
ছোটমামা মরটা আওড়ালেন। বারকতক ট্রেনিংয়ের পর মোনা-ওঝা বলল, ব্যস! ব্যস্! ঠিক আছে। এবার যেখানে ইচ্ছে যত রাত্তির হোক ঘোয়রা। পুঁটুবাবু। নির্ভয়ে চলে যাও মামাবাবুর সঙ্গে। যেখানে খুশি, যখন খুশি। সন্ধে হোক কী নিশুতি, শ্মশান কী মশান, বনবাদাড় কী পাহাড়-পর্বত, মাঠ কী ঘাট, নদী কী বিল কঁহা হা মুল্লুক বুক ফুলিয়ে ঘোয়রা!
শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন বৃষ্টিবাদলা হওয়াই নাকি নিয়ম। এবারকার দিনটিতে সন্ধ্যা অবধি তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। আকাশ ছিল সাফসুতরো ঝকঝকে নীল। তাই রাসের মেলায় ভিড় জমেছিল বড় বেশি। কলকাতার যাত্রা শেষ হতে রাত নটা বেজে গেল। আকাশে তখন ঝলমলে নিখুঁত গোল চাঁদ। আমরা ঢুকলাম নররাক্ষসের তাবুতে জ্যান্ত মুরগিভক্ষণ দেখতে। কারণ সার্কাস আর ম্যাজিক দুই তাঁবুতেই নাইট শোয়ের টিকিট কাটার কিউটা বেজায় লম্বা।
কিন্তু ভয়ংকর চেহারার নররাক্ষস যেই হউ হউ মাউ মাউ বিকট গর্জন করে মুরগির খাঁচা খুলতে গেছে, অমনি কড় কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ার শব্দ কানে তালা ধরিয়ে দিল। নররাক্ষস আচমকা হকচকিয়ে গিয়েছিল হয়তো। তা না হলে ওর হাতছাড়া হয়ে মুরগিটা দর্শকের ভিড়ে এসে পড়বে কেন?
তারপর শুরু হয়ে গেল একটা হই-হট্টগোল। লোকের গায়ের ওপর জ্যান্ত মুরগি পড়াটা খুব অস্বস্তিকর ব্যাপার। সেই সঙ্গে ভাবুটাও দমকা বাতাস আর বৃষ্টির দাপটে প্রায় ছিঁড়ে পড়ার অবস্থা। সবাই প্রাণ এবং মাথা বাঁচাতে তাঁবু ফদাই করে বেরুতে থাকল। আবার বাজ পড়ার শব্দ এবং চোখ ধাঁধানো আলো। ছোটমামাকে জড়িয়ে ধরেছিলুম ভাগ্যিস। নইলে এই হুলুস্থূলের ভেতর যে তার আর পাত্তা পাওয়া যেতে না, সেটা আমি ভালোই জানি। টের পেলুম, ছোটমামা সামনে কোনও জিনিসে ঢুঁ দেওয়ার পর সেখানটা ফাঁক হল। তখন বেরিয়ে পড়লেন। আমিও ওঁর প্যান্টের বেল্ট আঁকড়ে ধরে বাইরে চলে গেলুম।
ঝোড়োহাওয়া আর বৃষ্টিতে মেলার আলোগুলো দুলছিল। হঠাৎ একসঙ্গে সবগুলো নিভে গেল। গত গাজনের মেলাতেও এমনটি হয়েছিল। প্রাকৃতিক বিদ্যুতের ঝিলিকে চারদিকে মানুষজনকে ছোটাছুটি করে বেড়াতে দেখলুম। ছোটমামা বললেন, ট্রান্সফরমারে বাজ পড়েছে মনে হচ্ছে। চল পুটু, আমরা বরং গাঁয়ের ভেতরে কোনও বাড়িতে আশ্রয় নিই। বড্ড বেশি ভিজে যাচ্ছি।
মেলা বসেছিল গাঁয়ের বাইরে খেলার মাঠে। পিচরাস্তা ডিঙিয়ে গিয়ে সামনে একটা বাড়ির বারান্দা দেখতে পেলুম। বারান্দায় উঠে এতক্ষণে ছোটমামার বেল্ট ছেড়ে দিলুম। তারপরই সেই আবছা আঁধারে কোঁক্টো শব্দ শুনে চমকে উঠলুম–ও কীসের শব্দ ছোটমামা?
ছোটমামা খিকখিক করে হেসে বললেন,–সেই নররাক্ষসের মুরগিটা। বুঝলি পুঁটু? ওটা ধরে এনেছি।
আঁতকে উঠে বললাম, ও ছোটমামা!নররাক্ষসটা যদি মুরগির খোঁজে এখানে চলে আসে?
আসবে না বলে ছোটমামা মুরগিটার পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে চুপ করাতে ব্যস্ত হলেন।
আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। বললুম, না ছোটমামা। মুরগিটা ছেড়ে দিন। একবার যখন প্রাণে বেঁচে গেছে, একে বাঁচিয়ে রাখাই উচিত।
ছোটমামা গদগদভাবে বললেন, বুঝতে চেষ্টা কর পুঁটু! মুরগিটা ডিম পাড়বে। একগাদা ছানা হবে। সেগুলো বড় হয়ে ডিম পাড়বে। এমনি করে রীতিমতো একটা পোলট্রি হয়ে যাবে। তাই না? একেই বলে বিনি ক্যাপিট্যালে বিজনেস! আমরা বিজনেসম্যান হব। বুঝলি তো?
ডবুঝলুম বটে, কিন্তু অস্বস্তিটা গেল না। খালি মনে হচ্ছিল, নররাক্ষসটা যদি মুরগির গন্ধে-গন্ধে এখানে এসে পড়ে, মোনা-ওঝার মন্তর দিয়ে কি ওকে ঠেকানো যাবে? ও তো ভূত নয়, রাক্ষস।
