তারপর সে মসস করে জমিতে ঢুকে ঝান্ডা ওপড়াল। কঞ্চিটা দুমড়ে-মুচড়ে এবং কাপড়ের ফালিটা ফালাকাটা করে ছুঁড়ে ফেলল জমির বাইরে। আগের মতো কাটার বেড়ার ওপড়ানো অংশটা কোনওরকমে আটকে সে তেঁতুলতলায় উঠে এল। রাগী চোখে তাকিয়ে রইল জমিটার দিকে।
ঠিক এই সময়ে তেঁতুলগাছের ওপর থেকে কেউ ডাকল,–হন্না নাকি রে! ও ন্না!
হরেন ভীষণ চমকে উঠেছিল। মাথার ওপরকার ঘন ডালপালার ভেতর থেকে চেনা–খুবই চেনা গলায় কেউ তাকে ডাকছে। হরেন মুখ তুলতেই আবছা আঁধারে একটা মূর্তিও দেখল, একটু ওপরে মোটা একটা ডালে বসে দুটো ঠ্যাং দোলাচ্ছে। হরেন কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল,–ক্কে-ক্কে?
বটকেষ্ট দুটো ঠ্যাং দোলাতে-দোলাতে বলল, ন্যাকা, চিনেও চিনতে পারছিল–কে-কে করছিস? সোজা ঝাঁপ দিয়ে পড়ব। তারপর ঘাড়টি মটকে দেব। আর কখনও যদি এই জমির তল্লাটে দেখেছি তো–
হরেন বনবাদাড় ভেঙে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
একটু পরে বটকেষ্ট চাপাগলায় ডাকল,–বউমা! মইটা নিয়ে এসো। নামি।
আলোরানি একটু তফাতে হাল্কা একটা মই নিয়ে আড়ালে বসে ছিল। এসে শ্বশুরকে গাছ থেকে নামাল। বটকেষ্ট খি-খি করে হেসে বলল,–খুব জব্দ হয়ে গেছে হন্না। চলো, এখনই এখান থেকে কেটে পড়া ভালো।…
.
একটু রাত করে ঘনশ্যাম ফিরল। মুখটা গম্ভীর। বউকে দেখে বলল, বাবা কী যে ঝামেলা করে মাইরি! সন্ধেবেলা হন্নাদা তেঁতুলগাছে নাকি বাবাকে দেখেছিল। বাড়ি ফিরে অজ্ঞান হয়ে যায়। শেষে একদঙ্গল লোক লাটিসোটা টর্চ হ্যাঁজাক নিয়ে তেঁতুলতলায় খুব খোঁজাখুঁজি করেছে। খবর শুনেই লুকিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। আমি তো ভয়ে সারা। একটা কিছু সন্দ করে আমাদের বাড়ি এলেই কেলেঙ্কারি হতো।
আলোরানি নির্বিকার মুখে বলল, হতো না।
হতো না মানে? –ঘনশ্যাম কুঁসে উঠল, এসেই বাবাকে দেখতে পেত। তারপর–
-বাবা তখনই চলে গেছেন।
ঘনশ্যাম অবাক হয়ে বলল,–সে কী!
-রায়পুরে রাত্তিরে থাকবেন। সকালে ওখান থেকে সাথে চলে যাবেন।
আলোরানি মুখ টিপে হাসছিল। ঘনশ্যাম একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,-মা যদি ছোটমামার বাড়ি গিয়ে থাকে আর বাবা সেখানে হাজির হয়, আবার এক ঝামেলা।
আলোরানি বলল, কীসের ঝামেলা।
ধুস! বোঝো না কিছু। –ঘনশ্যাম বিরক্ত হয়ে বলল, মা তো বিধবা হয়ে আছে এখনও।
আলোরানি হাসতে লাগল,–সে তুমি ভেবো না। তোমার মা সব শাড়ি-গয়না গুছিয়ে নিয়েই গেছেন। কিছু খুঁজে পাইনি ওঁর ঘরে। আর শাঁখা-সিঁদুর? বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।…
মুরগিখেকো মামদো
টিমামার সঙ্গে কোথাও গিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রাত্তির হলেই ভূতের পাল্লায় হাপড়াটা যেন অনিবার্য। তাই সেবার পাশের গায়ে ঝুলনপুর্ণিমার রাসের মেলায় যাওয়ার জন্য ছোটমামা আমাকে খুব সাধাসাধি করলেও বেঁকে দাঁড়ালুম।
ছোটমামা আমাকে কলকাতায় যাত্রা, সার্কাসের বাঘ, সিংহ, প্রোফেসর ফুং চু র ম্যাজিক আর নররাক্ষসের আস্ত মুরগিভক্ষণের অনেক সব রোমাঞ্চকর গল্প শোনালেন। তবু আমি গো ধরে রইলুম। বললুম, আমি কিছুতেই যাচ্ছি না ছোটমামা! আপনার যদি অত ইচ্ছে, আপনি একাই যান।
ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ছোটমামা বললেন, প্রবলেম কী জানিস পুঁটু? কথায় বলে, একা না থোক। একা হলেই মানুষ কেন যেন বোকা মনে যায়। কিন্তু তুই কেন যেতে চাচ্ছিস না খুলে বল্ তো শুনি?
অগত্যা বললুম,–আমার ভয় করে।
–ভয়? কীসের ভয়?
–ভূতের।
ছোটমামা খুব অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,-তুই কী বলছিস পুঁটু? ভূতকে তুই ভয় পাস? তুই এত বোকা তা তো জানতুম না। ছ-ছা। ভূতকে তুই ভয় পাবি কী, ভূতই তো তোকে ভয় পাবে। ওরে বোকা! ভূতেরা মানুষকে ভয় পায় বলেই তো নিরিবিলি জায়গায় লুকিয়ে থাকে। তুই কি ভেবে দেখেছিস, কেন ভূতেরা পারতপক্ষে দিনের বেলা বেরোয় না? বেরুলেই যে মানুষের সামনে পড়ে যাবে। তাই ওরা রাতবিরেতে বেরোয়। হ্যাঁ, ঠিক দুকুরবেলা, ভূতে মারে ঢেলা। তার মানে, দুপুরবেলায় ভূতেরা টুপটুপ করে ঢিল ছোড়ে বটে, কিন্তু সামনে আসে না। গাছপালার আড়াল থেকেই ঢিলগুলো ছোড়ে। তাহলে ভেবে দ্যাখ–
ছোটমামার কথার ওপর বলে দিলুম,–ও আপনি যতই বলুন, আমি যাচ্ছি না।
হঠাৎ ছোটমামা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ঠিক আছে! আয় আমরা মোনাদার বাড়ি যাই।
এতে অবিশ্যি আপত্তি করলুম না। ছোটমামার মোনাদা হল মোনা-ওঝা। কেউ-কেউ তাকে মোনা বুজরুকও বলে। সে থাকে আমাদের গাঁয়ের শেষদিকটায় গঙ্গার ধারে পুরোনো শিবমন্দিরের কাছে। মাথায় সাধুবাবাদের মতো চুড়োবাঁধা জটা। মুখভর্তি গোঁফ-দাড়ি। কপালে লাল তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। বাঁ-হাতের কবজিতে একটা তামার বালাও দেখেছি। সবসময় গাঁজা-ভাঙের নেশায় তার চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে থাকে।
কিন্তু চেহারা যতই ভয় জাগানো হোক, স্বভাব বেশ অমায়িক আর হাসিখুশি মানুষ মোনা। ওপর পাটির দুটো দাঁত নেই বলেই যেন তার হাসি দেখলে হাসি পায়।
মোনা-ওঝা থাকে মন্দিরের পেছনে একটা ভাঙাচোরা ঘরে। সেখানে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ আছে। নিরিবিলি সুনসান জায়গা। নেহাত সময়টা বিকেল। তা না হলে ছোটমামার সঙ্গে এমন জায়গায় কিছুতেই আসতুম না।
ছোটমামা ডাকলেন,–মোনাদা আছে নাকি? ও মোনাদা!
মোনা ওঝা বটগাছের দিক থেকে সাড়া দিল,–কে ডাকে গো এমন অবেলায়?
