পুঁটি নয় বাবা! আলোরানি শ্বশুরকে হাত তুলে মাছের সাইজ দেখাল। এত-এত বড় পোনা।
বটকেষ্ট গলার ভেতর বলল,–এক আনার শরিক আমি। আচ্ছা দেখছি। ফিরে যখন এসেছি, একটা এসপার-ওসপার না করে ছাড়ছি না।
আলোরানি শশুরের সায় পেয়ে উৎসাহে বলল, জানেন বাবা? হাসপাতালের ব্যাপারটাতেও আমার সন্দেহ হয়েছিল। যত বলি, কাকে দেখতে কাকে দেখেছ, তত বলে, আমাকে বাবা চেনাচ্ছ?
বটকেষ্ট অভিমানী শ্বাস ফেলে বলল, আমাকে যদি চিনবে, তাহলে এ অবস্থা হয়? যাকগে। বউমা তোমাকে একটা কাজের ভার দিতে চাই। ঘনার দ্বারা কি হবে না।
আলোরানি ঝটপট বলল, ঝান্ডা পুঁততে হবে তো? পুঁতে আসব। আমি সব পারি–আপনি কিছু ভাববেন না।
ঘনশ্যাম নড়ে উঠল,–মারা পড়বে বলে দিচ্ছি। মেয়েছেলের এত সাহস ভালো নয়। শালা হন্নাদাটা বড্ড ঢ্যামনা!
খপ করে তার কান ধরে বটকেষ্ট ঝাঁকুনি দিল,–চো-ও-প! কাল রাত্তির থেকে শুনছি আমার মুখের সামনে খালি শালা-টালা মুখখিস্তি। এক মাস আমি ছিলাম না, তাতেই এই? সত্যিসত্যি মলে মুখ থেকে নাদি বেরুবে হতচ্ছাড়ার।
ঘনশ্যামের পিতৃভক্তির মূল কারণ, ছোটবেলা থেকেই তার কাছে বাবা একটা বিপজ্জনক সাংঘাতিক জিনিস। তাছাড়া বটকেষ্টর একসময় গাঁয়ে প্রচণ্ড দাপটও ছিল। বউয়ের সামনে কান ধরায় অপমানের চোটে ঘনশ্যাম শেষপর্যন্ত কী আর করে, খি খি করে হাসতে লাগল।
আলোরানি একটু লজ্জা পেয়েছিল অবশ্য। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘনশ্যাম বলল, খুব হয়েছে। কান ছাড়ো, বেরুব।
কান ছাড়ার সময় শেষ কঁকুনি দিয়ে বটকেষ্ট বলল,–যেখানে যাবি যা। তোর আশা কখনও করিনি, করবও না। কিন্তু সাবধান, আমার কথা চেপে রাখবি। চাউর করলেই কী হবে, জানিস?
উঠে দাঁড়িয়ে ঘনশ্যাম বলল,–বাড়ি থেকে বের করে দেবে তো? দিও।
না,–বটকেষ্ট শক্তমুখে বলল।–তাহলে সত্যি সত্যি মরব।
ঘনশ্যাম একটু অবাক হয়ে বলল,–তার মানে?
মাথার ওপরকার কড়িকাঠ দেখিয়ে বটকেষ্ট বলল,–ওখান থেকে ঝুলব, বুঝতে পারছিস তো? এতহাত জিভ বের করে ঝুলে থাকব।
ঘনশ্যাম ভয় পেয়ে জিভ কেটে বলল, ধুস! খালি, আজেবাজে কথা।…
বটকেষ্টর মরার খবর পেয়ে হরেন নিশ্চিন্ত হয়েছিল। টুকরো জমিটা নিয়ে জ্ঞাতি বটকেষ্টর সঙ্গে তিন বছর মামলা চলছিল। জমিটার তিনদিকে আগাছার জঙ্গল, একদিকে কয়েকটা ঝাকড়া ঝাকড়া প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছ। তার ওধারে একটা পুকুর। ভাদ্রমাসের ধান তুলতে থানাপুলিশ হয়ে গেছে। সেই ফৌজদারি মামলাও ঝুলছে আদালতে। আশ্বিনে হঠাৎ কী অসুখে ভুগে বটকেষ্ট শহরের হাসপাতালে গেল এবং মারাও পড়ল। শ্রাদ্ধে দয়া করে হরেন ঘনশ্যামকে কিছু নগদ টাকাকড়িও দিয়েছে। শর্ত হল, ঘনশ্যাম আদালতে যাবে না। তারপর হরেন জমিটাতে কলাই বুনে দিয়েছে। সারের জোরে দেখতে-দেখতে ঝাপালো সবুজ হয়ে উঠেছে জমিটা। গরুছাগলের বড় উপদ্রব এদিকটাতে। তাই কঁটাঝোঁপের বেড়া দিয়েছে। এবেলা-ওবেলা এসে একবার করে দেখে যায় হরেন। তার কাছে খুব গর্বের জিনিস এই মাটিটুকু।
বিকেলে বাসরাস্তার ধারে গজার দোকানে হরেন চা খাচ্ছিল। সেই সময় তার মেয়ে পাত্তি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিল, বাবা! শিগগির এস। তেঁতুলতলার কলাইয়ের খেতে ঘনকাকার বউ ঝান্ডা পুঁতেছে।
ঝান্ডা পোতার ব্যাপারটা পাড়াগাঁয়ে ইদানীং রীতিমতো ঘটনা! কিন্তু হরেনের বিশ্বাসই হল না। ঘনশ্যাম তার বাবার মতো নয়। কোনও ঝামেলায় থাকে না। তবে তার বউটা একটু তেজি, একথা ঠিকই। তাই বলে তার ঝান্ডা পোঁতার সাহস হবে, এটা অবিশ্বাস্য এবং সেও কিনা হরেনের দখল করা কলাইবোনা জমিতে?
হরেন বলল,–যা!
সত্যি বাবা! –পাত্তি চোখ বড় করে বলল, মা দেখেছে। আমি দেখলাম। মা বলল, শিগগির তোর বাবাকে খবর দে।
হরেন হ্যাঁ-হা করে হেসে বলল,–বাড়ি যা দিকি। কাজ নেই কম্ম নেই, খালি পাড়া-বেড়ানো। ঝান্ডা পুঁতেছে তো কী হয়েছে? বাড়ি যাওয়ার সময় উপড়ে ফেলে দিয়ে যাব।
পাত্তি মনমরা হয়ে চলে গেল। জগা বলল,-পেছনে লোক জুটিয়েছে হরেন! নইলে ঘনার বউয়ের এত সাহস হতো না।
হরেন চটে গিয়ে বলল, তুমিও মাইরি যেন কী! লোক জোটাবে! এত সস্তা? লোক জোটাতে হলে মালকড়ি দরকার। ঘনার হাঁড়ির অবস্থা ঢনঢ়ন। কালই দেখবে মুনিশ খাটতে নেমেছে।
জগা বলল,-তোমার বেপাট্টির লোক হলেই জুটবে। আজকাল তো এরকমই হয়েছে।
গোঁ ধরে হরেন বলল,-বেপাট্টি? এ গাঁয়ে আমার বেপাটি হবে কোন শালা? সবগুলোকে তো দেখলাম। পায়ের তলায় এসে মুন্ডু কাত করেছে। মরা মানুষের নিন্দে করতে নেইবটকেষ্ট সম্পর্কে জ্যাঠাও ছিল বটে, তবে সেও গেছে সব ঠান্ডাও হয়েছে।
জগা কথা বাড়াল না। চায়ের দোকানে এ সময়টা খদ্দেরের ভিড় বেড়ে যায়।
.
চা শেষ করে হরেন উঠল। কিছুক্ষণ দোনামনা করে রাস্তার নয়ানজুলির দিকে ঘুরল। শর্টকাটে যাওয়ার পথে বাধা নয়ানজুলির জল। শেষ বেলায় আলোর গায়ে কুয়াশার ছাপ পড়েছে। এখান থেকে তেঁতুলতলার জমিটা দেখা যায় না। অনেকটা ঘুরে বাঁধের ওপর দিয়ে মাঠে নামল হরেন। গাঁয়ের শেষ দিকটায় ঘন গাছগাছালি। জমিটার কাছাকাছি যেতে দিনের আলো কমে এল আরও।
তেঁতুলতলা পোঁছেই চোখ জ্বলে গেল হরেনের। সত্যিই কলাইয়ের জমির মাঝখানে পোঁতা কঞ্চিতে লটকানো এক ঝান্ডা। খুঁজতে-খুঁজতে একখানে কাটার বেড়া ওপড়ানোও চোখে পড়ল। হরেন হুঙ্কার দিল,–তবে রে হতচ্ছাড়ি। হুঙ্কারের লক্ষ্য ঘনশ্যামের বউ।
