আলোরানি মুখ টিপে হাসছিল। গৃহবধূর গলায় বলল,-গরম জল করে দিই, হাত-মুখ ধুয়ে নিন। তারপর শ্বশুরের পায়ে ঢিপ করে প্রণামও ঠুকল।
বটকেষ্ট আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল, আগে এক কাপ চা। রায়পুরে খগেনের বাড়ি খাট দিয়ে বেরিয়েছি। বলে ছেলের দিকে ঘুরল। মাথা ন্যাড়া করেছিলি দেখছি। তার মানে, বাপের ছেরাদ্দও করেছিস। হাঁদারাম।
তারাদাসী তার ডেরায় চুপচাপ ছিল। হঠাৎ তার ফোঁপানি শোনা গেল। আলোরানি বলল, আঃ। চুপ করুন তো। রাত-দুপুরে কেলেঙ্কারি করবেন না।
বউমার তাড়ায় তারাদাসী থেমে গেল। ঘনশ্যাম গুম হয়ে বলল,–কেলেঙ্কারি হবেই, সকালে গাঁসুদ্ধ হইচই পড়ে যাবে। তুমি মাইরি খালি ঝামেলা বাড়াও-কোনও মানে হয়? হাসপাতালে ভালো লাগল না তো বাড়ি চলে আসবে। তা নয়, এক মাস নিপাত্তা। এদিকে কোন শালার বডির মুখে আগুন দিয়ে ধুস!
বটকেষ্ট আস্তে বলল,-চেপে থাক দিনকতক। কাকপক্ষীটিও যেন টের না পায়। বলে সে বারান্দায় উঠল। বিধবা স্ত্রীর উদ্দেশে ফিক করে হেসে বলল, কী? গোঁসাঘরে খিল দিলে নাকি? যা-যা বলতাম, ঠিক-ঠাক মিলে গেছে তো? বলেছিলাম না ঘনা ঘরে ঢুকবে আর তোমাকে এই পায়রার খোপে ঢোকাবে?
ঘনশ্যাম ফুঁসে উঠল, না জেনে খামোকা যা-তা বোলো না। মা নিজেই বলল, তোরা ঘরে থাক। আমাকে বাইরে দে।
মামলায়-মামলায় প্রায় সর্বস্বান্ত বটকেষ্ট বউমা আর ছেলের জন্য বারান্দায় এই ঘেরাটোপের ব্যবস্থা করেছিল! আশা ছিল, হরেনের সঙ্গে টুকরো জমি নিয়ে মামলায় তার জয় হবে এবং তাই বেচে পাশে একখানা ঘর তুলবে। কিন্তু হাকিমের অভাবে আদালতে নাকি মামলার পাহাড় জমে উঠেছে।
বটকেষ্ট হ্যারিকেনটা তুলে তেরপলের পরদা ফাঁক করে তার বিধবাকে দেখতে গেল। কিন্তু তারাদাসী লেপমুড়ি দিয়েছে। বটকেষ্ট খ্যাখ্যা করে বলল, ঢং। বিধবা হয়েছে তো বিধবা হয়েই থাকো। ছেরাদ্দ হাওয়া লোকের বউ। যাগযজ্ঞ করে গন্ডাকতক বামুন খাইয়ে আবার বিয়ের পিড়িতে বসতে হবে, জানো তো? বউমা, আমাকে এখানেই বিছানা করে দিও!
ঘনশ্যাম পিতৃভক্তিতে গদগদ হয়ে বলল, না, না। তুমি ঘরে শোবে। আমরা বরং এখানেই শোব। এখনও তত শীত পড়েনি!
.
সকালে শাশুড়ির সাড়াশব্দ না পেয়ে আবোরানি তেরপলের পরদা তুলেছিল। তারাদাসীর বিছানা খালি। বাড়ির আনাচেকানাচে ঘুরেও পাত্তা পেল না। গাঁয়ের একটেরে বাড়ি। পড়শিদের কাছে খোঁজখবর নিয়ে ফিরে এল আলোরানি। কেউ দেখেনি তারাদাসীকে। তখন উদ্বিগ্ন ঘনশ্যাম বেরুল মায়ের খোঁজে।
কিছুক্ষণ পরে ঘুরে এসে সে গম্ভীরমুখে বলল, জগা বলল, ভোরের বাসে মাকে চাপতে দেখেছে। বাবাকে মাইরি কী বলব? খালি ঝামেলা বাড়ানো স্বভাব।
ঘরের ভেতর তক্তপোশে বসে বটকেই চা খাচ্ছিল এবং পুরোনো পোকায় কাটা দলিল-পরচা দেখছিল। ছেলের কথা কানে যেতেই চাপাগলায় ডাকল,–ঘনা। শুনে যা।
ঘনশ্যাম বারান্দায় উঠে বলল, বলো।
তোর মা কেটে পড়েছে তো? বটকেষ্ট বাঁকা হাসল। জগা বলল না কোন বাসে চাপতে দেখেছে?
–সাঁইথের বাসে। কেন?
বটকেষ্ট তারিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আমি ভাবছিলাম হাসপাতালে গিয়ে ঢুকবে নাকি! সাইথে যাওয়া মানে রোঘোর বাড়ি। যত্নআত্যি পাবে। তোর মায়ের কিছু কিছু ব্যাপারে বেশ টনটনে বুদ্ধি। আয়, বোস এখানে।
ঘনশ্যাম অনিচ্ছার ভঙ্গিতে বসল। সিন্দুক থেকে এসব পোকায় কাটা কাগজপত্তর বের করে খুঁটিয়ে দেখা তার মামলাবাজ বাবার বরাবরকার অভ্যাস। মুখ তেতো করে বলল, আবার ওই মড়া ঘাঁটতে বসেছ?
স্বভাব যায় না মলে। বটকেষ্ট ফিক করে হাসল।–তোর মা কাল রাত্তিরে বেশ বলছিল। তোর মায়ের কথাটা মনে ধরার মতো। তুই ছেরাদ্দ করে ন্যাড়া হয়েছিল। তোর মা শাখা ভেঙে সিঁদুর মুছে বিধবা হয়েছে। তার মানে, আমি এখন মরা মানুষই বটে। কাজেই চেপে যা।
চাপবটা কী? –ঘনশ্যাম জানতে চাইল। বটকেষ্ট জ্বলজ্বলে চোখে ঝিলিক তুলে বলল,-কাল রাত্তিরে বললাম কী তোকে? আমি যে বেঁচেবত্তে আছি, একেবারে চেপে যা।
–হুঁ, তারপর?
–তেঁতুলতলার জমিতে একখানা ঝান্ডা পুঁতে দিয়ে আয়।
ঘনশ্যাম জোরে মাথা নেড়ে বলল,–তোমার মাথা খারাপ? হন্নাদা আমার বডি ফেলে দেবে। কলাই বুনে কাটার বেড়া দিয়ে রেখেছে নিজে গিয়ে দেখে এসো গে না।
বটকেষ্ট একটু ভেবে বলল, কাটার বেড়া দিয়েছে নাকি? যাচ্চলে। মামলা এখনও ঝুলে আছে। মগের মুলুক পড়ে গেছে দেখছি। তোর বাধা দেওয়া উচিত ছিল।
ঘনশ্যাম চটে গেল,–তুমি গিয়ে ঝান্ডা পুঁতে দিয়ে দেখো না, কী হয়। হন্নাদা এখন গাঁয়ের মাথা হয়েছে। পঞ্চায়েতের মেম্বার। এসব আমার দ্বারা হবে না।
তুই একটা অকম্মা। বটকেষ্টও চটল।–তোরই ভালোর জন্য চিন্তা ভাবনা করে বাড়ি ফিরে এলাম। নইলে অ্যাদ্দিন গয়া-কাশী-মথুরা করে দিব্যি ঘুরে বেড়াতাম। সংসারে ঘেন্না ধরে গিয়েছিল, জানিস?
ঘনশ্যাম আঙুল খুঁটতে থাকল।
বটকেষ্ট চাপাগলায় বলল,-বউমা! শোনো তো!
আলোরানি মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে ঢুকল। সে বারান্দা থেকে কান করে সব শুনছিল। বলল, কাকে কী বলছেন? সেদিন তালপুকুরের মাছ ধরে সব্বাই যে যার ভাগ নিয়ে বাড়ি ঢুকল। মাঝখান থেকে আমি চাচামেচি করে গলা ভাঙলাম। আপনার ছেলে উল্টে আমাকে বকাঝকা করে ঠেলতে-ঠেলতে
বাজে কথা বোলো না। –ঘনশ্যাম বাধা দিয়ে বলল,–মেয়েছেলে–অপমান করে বসলে খুব ভালো হতো? চারটে পুঁটিমাছের জন্য ঝামেলার মানে হয় না।
