একে-একে নেমে গেলুম, চারদিকের গাছ থেকে বৃষ্টিভেজা ছটি অদ্ভুত মূর্তি। সবাই ঠকঠক করে কাঁপছি। মামা ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বললেন,-সব পড়ে থাক। চল, আগে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নিই। জঙ্গলের বাইরে নিশ্চয় ঘরবাড়ি আছে। আয়, চলে আয়।
আমরা এগোলুম। স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। বিদ্যুতের আলোয় দেখে-দেখে পা ফেলতে হচ্ছে। কতদূর যাওয়ার পর নান্টুমামা বলে উঠলেন, সামনে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে না?
একবার বিজলি ঝলসে উঠতেই দেখলুম, তাই বটে। গাছপালার মধ্যে একটা মস্ত দালানবাড়ি হয়েছে। দৌড়ে গিয়ে সেখানে পৌঁছলুম আমরা। কিন্তু আশ্চর্য, বাড়িটায় কোনও আলো নেই। কোনও লোকজন নেই।
নিশ্চয়ই পোড়ো-বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকে গেলুম। বারান্দায় উঠে দেখি, সত্যি তাই। দরজা-জানালা বলতে কিছু নেই। ভেতরে কোনও আসবাবপত্রও নেই। টর্চ পুকুরের ধারে পড়ে আছে। এবার তাই নান্টুমামা দেশলাই জ্বালালেন। সেটুকু আলোয় যা দেখলুম, আমার পিলে আবার চমকাল।
ঘরের কোনায় শুয়ে আছে আবার কে? সেই যমের মতো ভালুকটা। আর কী? এবার আর রক্ষে নেই। পাগলু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভূতো বলল,–মা-মা মা মা। ভা-ভা-ভা-ভালু…।
ওদিকে মামা তখন মরিয়া। বিকট চেঁচিয়ে উঠলেন,–গেট আউট! গেট আউট স্কাউলে! ডু ইউ নো, হু অ্যাম আই? ইউ ব্ল্যাক বিয়ার। আই অ্যাম নান্টুবাবু!
সেই সময় কার কথা শোনা গেল অন্ধকারেই, সেই ঘরের কোনা থেকে!–বাবুসাব মাং ঘাবড়াইয়ে। লছমী কুছ নেহি বোলে গা! বহুং আচ্ছা ভালু বাবুসাব!
নান্টুমামা হুঙ্কার দিয়ে বললেন, কোন ব্যাটা রে?
–হামি ভালুকওয়ালা আছি বাবুসাব। আজ সকাল থেকে লছমী-হামার এই ভালু হারিয়ে গিস্লো। বিষ্টি সমোয়ে লছমীকে জঙ্গুলে দেখতে গেছল বাবুসাব। তো এখানেই নিয়ে আসল।
নামামা হো-হো করে হেসে বললেন,–ব্যাটা উঁত কাহেকা। আমরা এতক্ষণে হেসে উঠলুম। হেসেই বেঁচে উঠলুম বলা যায়। কিন্তু সাঁতরাগাছির রেল-পুকুরে তাই বলে আর কখনও মাছ ধরতে যাচ্ছি না। বাপস!
মানুষ-ভূতের গল্প
আলোরানি হেরিকেনের দম কমিয়ে শুয়ে পড়তেই ঘুমের ফাঁদে আটকে যাচ্ছিল প্রায়, এমন সময়ে বাড়ির পেছনে খিড়কির দিকে কঁপা-কঁপা গলায় সন্দেহজনক ডাকাডাকি,–ঘনশ্যাম, ঘনশ্যাম। ঘনা রে।
এক ঝটকায় ফাঁদ ছিঁড়ে উঠে বসল আলোরানি। বাইরে বারান্দার খানিকটা দরমা ঘেরা কুঠুরি। শাশুড়ি তারাদাসীর ডেরা সেখানে। তার ভয়কাতুরে চাপা ধমক শোনা যাচ্ছিল,–যা। যা। ধুসধুস।
বয়স বাড়লে ঘুম কমে। কানও খর হয়। গাছগাছালি থেকে পাতা খসে পড়লেও শাসায়।
আলোরানি হ্যারিকেনের দম বাড়িয়ে চমকানো গলায় বলল,-বাবার গলা মনে হচ্ছে যেন?
এবার খ্যাখ্যা করে হাসতে লাগল ঘনশ্যাম, ছাড়ো তো। কোন শালা রাতদুপুরে মস্করা করতে এসেছে।
সেই সময় আবার শোনা গেল,–ও ঘনা। ঘনা রে।
ঘনশ্যাম এবার লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। হাড়জ্বালানে মামলাবাজ বলে গাঁয়ে তার বাবার খুব বদনাম ছিল। আড়ালে তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশাও করা হতো। কিন্তু আর তো নোকটা বেঁচে নেই। তা ছাড়া, বাবা খারাপ হতে পারে, ঘনশ্যাম মোটেও খারাপ নয়। কারও সাতে-পাঁচে থাকে না। বাবার রেখে যাওয়া মামলা-মোকদ্দমা নিয়েও তার মাথাব্যথা নেই। অন্যপক্ষ এই এক মাসেই ঝটপট একতরফা ডিক্রি পেয়ে যাচ্ছে। ঘনশ্যাম লাঠিহাতে বেরুল। পেছনে হ্যারিকেন হাতে তার বউ আলোরানি। তারাদাসী দরমা এবং তেরপলের ভেতর থেকে ঝাঝালো গলায় বলে উঠল,–স্বভাব যায় না মলে। সকালে গেনুকে খবর দিস বরং।
গেনু ভূতের বদ্যি। ঘনশ্যাম মায়ের মুখে গেনুর নাম শুনে একটু ভড়কে গেল বটে; কিন্তু ফের করুণস্বরে ঘনা রে শুনে লাঠি বাগিয়ে হাঁক ছাড়ল, কোন শালা রে?
খিড়কির দরজার বাইরে থেকে অবিকল বটকেষ্টর গলা শোনা গেল, আমি যে, আমি। খামোকা শালা সমন্দি না করে দুয়োর খুলবি না কি? শীতে অবস্থা কাহিল একেবারে।
ঘনশ্যাম হকচকিয়ে গিয়েছিল। আলোরানি ঠোঁট কামড়ে ধরে কী ভাবছিল। তার হাতে হ্যারিকেন। হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে খিড়কির দরজা খুলে দিল এবং যে লোকটি বাড়ি ঢুকল, সে অবিকল বটকেষ্ট।
সেই ময়লা ফতুয়া, খাটো ধুতি, কঁচাপাকা গোঁফ, কাঁধে ব্যাগ। চোখে তেমনই জ্বলজ্বলে চাউনি, চালাক-চালাক ঝিলিক।
ঘনশ্যাম প্রচণ্ড আতঙ্কের চোটেই লাঠি তুলেছিল। বটকেষ্ট খপ করে ধরে ফেলে খাপ্পা মেজাজে বলল, হতচ্ছাড়া বাঁদর, বাবার মাথায় লাঠি তুলতে হাত কাঁপল না? তখন থেকে ডেকে-ডেকে গলা ভেঙে গেল, আবার বাড়ি ঢুকতেই লাঠি। মারব গালে এক থাপ্পড়।
ঘনশ্যাম লাঠি ছেড়ে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। সেই আদি অকৃত্রিম বাবা মনে হচ্ছে, কিন্তু–
সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে উঠল, ধুস শালা। তাহলে ধারদেনা করে কার বডি পুড়িয়ে এলাম?
বটকেষ্ট থমকে দাঁড়িয়ে বলল,–পুড়িয়ে এলি মানে?
ঘনশ্যাম গুম হয়ে বলল,–বেড খালি দেখে খোঁজ করলাম। বলল, মগগে গিয়ে দেখুন।
বটকেষ্ট হতভম্ভ হয়ে বলল,–মগগে গিয়ে আমাকে দেখেছিস?
তাই তো মনে হল। –ঘনশ্যাম মিনমিনে স্বরে বলল, হাসপাতালের লোকেরাও বলল। তাছাড়া বডি ফুলে ঢোল!
বটকেষ্ট এতক্ষণে একটু হাসল, আর বলিসনে। হাসপাতালের যা খাবার। গত জন্মের ভাত উঠে আসে পেট থেকে। কাঁহাতক আর সহ্য হয়। শেষে কেটে পড়লাম।
