মামা ছিপের ফাতনার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। আমার ও পাগলুর কিন্তু চোখ ব্যথা করছে। ঠায় দুপুর অবধি বসেও মাছের পাত্তা নেই। একটা বাজলে মামা কথামতো খাবারের জন্য ডাক দিলেন হুইসেল বাজিয়ে। ছিপ ফেলে রেখে সন্তুরা এসে গেল তক্ষুনি। আমাদের ছিপের একটু তফাতে ঝোঁপের মধ্যে শতরঞ্চি পেতে আমরা খেতে বসলুম। টোস্ট, ডিমসেদ্ধ, কলা খেতে-খেতে চাপা গলায় আমরা কথা বলছি, হঠাৎ ডানদিকে কোথাও জলের মধ্যে জোর শব্দ হল। অমনি সন্তু লাফিয়ে উঠল,–ওই রে, আমার মাছ গেঁথেছে।
নামামা বললেন, ছিপ আটকে না রাখলে নিয়ে পালাবে রে। দেখে আয় শিগগির।
সন্তু দৌড়ে ঝোঁপঝাড় ভেঙে চলে গেল। আমরা খুব আশান্বিত হলুম। নির্ঘাত বড়সড় একটা মাছ গেঁথেছে ওর বঁড়শিতে।
কিন্তু সন্তু গেল তো গেলই, কোনও সাড়া নেই। আমরা অধৈর্য হয়ে পড়েছি। তখন মামা দুবার হুইসিল বাজালেন। তবু সন্তুর সাড়া এল না। এবার মামা গলা চড়িয়ে ডাকলেন,-সন্তু! সন্তু!
সন্তুর জবাব নেই।
আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি। ইতি উঠে দাঁড়াল। আমি দেখে আসি– বলে চলে গেল।
কিন্তু সেও গেল তো গেলই। ব্যাপারটা কী?
নান্টুমামার মুখ গম্ভীর দেখাল এতক্ষণে। বললেন, ভুতে! তুই যা তো বাবা। দেখে আয় তো, কী হল!
ভুতো ভয়েভয়ে বলল, আ-আ-মি যাব?
নাণ্টুমামা বেঁকিয়ে উঠলেন, হ্যাঁ, তুমি। তুমি না তো কি এই হুইসিলটাকে পাঠাব?
ভূতো আমাদের দিকে তাকাতে-তাকাতে ঝোঁপের আড়ালে অদৃশ্য হল। আশ্চর্য, দশ মিনিট অপেক্ষা করেও সে ফিরল না। তখন মামা গম্ভীরমুখে বললেন,–এবার পাগলু যা!
পাগলু নাদুসনুদুস ছেলে। তাই হাঁটতে কষ্ট হয় মোটকা শরীর নিয়ে। সে ঝোঁপ ঠেলে অনেক কষ্টে এগোল। নান্টুমামাকে বেজায় ভয় করে। না গিয়ে উপায় কী?
পাগলুও যখন ফিরল না, তখন নান্টুমামা রেগেমেগে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–তোদের মতো অকম্মা দেখা যায় না। আমি নিজেই যাচ্ছি। এই রাজু, তুই ছিপের কাছে যা! ফাতনা নড়লেই জোর খাচ দিবি। সাবধান! এই হুইসিলটা রাখ বরং। বেগতিক দেখলে তিনবার বাজাবি। মনে থাকে যেন তিনবার।
নান্টুমামা চলে গেলে আমি ছিপের কাছে এলুম। তারপর উঁকি মেরে সন্তুর ঘাটটা দেখার চেষ্টা করলুম। কিন্তু একটা ঝোঁপ জলে ঝুঁকে থাকায় কিছু দেখা গেল না। পুকুরটাও দামে ভর্তি। ওর ছিপ দেখাও সম্ভব নয়।
বসে আছি তো আছিই। ফাতনা কাপে না যেমন, তেমনি সন্তুদের ওখান থেকেও কোনও সাড়া নেই। এর মধ্যে পুকুরের ওপারে দূরে রেললাইনে কতবার রেলগাড়ি গেল। একা চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে আমারও খুব রাগ হল। আশ্চর্য তো! কী এমন কাণ্ড হচ্ছে ওখানে, যে যাচ্ছে সে আর ফিরছে না?
শেষমেশ আমি উঠে দাঁড়ালুম। মামার বারণ না মেনে সন্তুদের ঘাটের দিকে এগোলুম।
ঝোঁপঝাঁপ যত, গাছও তত! কাটায় জামাপ্যান্ট আটকে যাচ্ছিল। হাত দশেক এগিয়েছি, হঠাৎ লক্ষ করলুম সামনেই একটা ঘন ডাল-পালাওয়ালা গাছে নান্টুমামা বসে রয়েছেন। ব্যাপার কী? মামার মুখটা ওপাশে ঘোরানো। কী যেন দেখছেন। শরীরটা ঠকঠক করে কাঁপছে। ডাকতে যাচ্ছি, নান্টুমামা হঠাৎ ঘুরে আমাকে দেখেই ঠোঁটে আঙুল দিয়ে গাছে চড়তে ইশারা করলেন। ভুরু কুঁচকে ঘন-ঘন মাথা নাড়ছেন মামা। চোখে ভর্ৎসনার ভঙ্গি। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ওদিকে মামা সমানে ইশারা দিচ্ছেন গাছে চড়তে।
এবার বাঁ-দিকে আরেকটা গাছে চোখ গেল। চমকে উঠলুম! দেখলুম, ভুতো ডগার একটা ডালে বাঁদরের মতো বসে আছে। গোড়ার কাছে একটা মোটা ডালে পাগলুও রয়েছে। ডাইনে তাকালুম। সেদিকে একটা গাছে দেখলুম সন্তু আর ইতি চুপচাপ বসে আছে।
কী করব, ভাবছি। এমন সময় দেখি মামার গাছের তলায় ঝোঁপ ঠেলে বেরিয়ে এল একটা মস্ত ভালুক।
ব্যস অমনি টের পেয়ে গেলুম। দিশেহারা হয়ে কাছেই একটা গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়লুম। তারপর যে কসরত করে ডালে উঠলুম তা সার্কাস ছাড়া আর কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে না।
ডালে উঠে নিরাপদে বসে নিচে সেই ভালুকটাকে খুঁজলুম। ব্যাটা মামার ডালের নিচেই দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে চারপায়ে। মামার নাকের ওপরে চশমাটা ঝুলছে। ভয় হল, এক্ষুনি বুঝি ভালুকের নাকেই গিয়ে পড়বে। না জানি কী ধুন্ধুমার কাণ্ড হবে তাহলে!
ভালুকটা নড়ছে না। কিন্তু ভালুক তো গাছে চড়তে পারে!
যেই কথাটা মনে হওয়া, পিলে চমকে গেল। সর্বনাশ হয়েছে। গাছে ওঠা তো ঠিক হয়নি। কিন্তু এখন নামাও যে বিপদ। মুখোমুখি পড়ে যাব যে!
কতক্ষণ এইভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে বসে আছি ঠিক নেই। হঠাৎ জঙ্গলে বাতাস উঠল। তারপর টের পেলাম আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে। ভালুকটা চুপচাপ শুয়ে পড়েছে নান্টুমামার গাছটা নিচে। দেখতে-দেখতে আলোর রঙ ধূসর হয়ে গেল। তারপর শুরু হল বৃষ্টি, সে বৃষ্টির তুলনা নেই। মনে হল আকাশের মেঘগুলো ভেঙে পড়ছে একেবারে। ভিজে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকলুম। গাছের তলায় আর জঙ্গলের সবখানে অন্ধকার ঘনিয়ে উঠল! অসহায় হয়ে বসে-বসে ভিজছি আর ভিজছি। মাঝে-মাঝে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে। বুকে খিল ধরে যাচ্ছে। মনে-মনে নাক কান মুলছি–আর কখনও মাছ ধরার নাম করব না।
বৃষ্টি একটু কমেছে সবে। কিন্তু সন্ধের অন্ধকার ঘন হয়েছে। এমন সময় নান্টুমামার চাপা ডাক শুনতে পেলুম, সন্তু! ইতি! পাগলু! ভুতো! সবাই নেমে আয়। ভালুকটা পালিয়েছে।
