সেই সাধুবাবার গলা কামড়ে ধরে ঝুলছে বীভৎস বাদুড়টা আর সাধুবাবা তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন। মুখে অদ্ভুত একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে।
আমার দৌড়ে যেতে-যেতে সাধুবাবা সশব্দ পড়ে স্থির হয়ে গেলেন। বাদুড়টা ডানা ঝটপট করে উড়ে অন্ধকার আকাশে মিলিয়ে গেল।
আমার ডাকাডাকিতে, খেলার মাঠের ওপাশের বস্তি থেকে লোকেরা আলো আর লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়ে এল।
কিন্তু আশ্চর্য, লোকগুলোকে দ্রুত ঘটনা বলার পর ঘুরে দেখি, সাধাবাবু নেই। চারপাশে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে দেখা গেল না। তখন লোকগুলো হাসাহাসি করতে থাকল। একজন বলল, ওরে দাদাবাবু একলা বেড়াতে এসে ভয় পেয়েছেন!
ওরা চলে গেলে আমি ব্যাপারটা ভাবতে-ভাবতে বাড়ির দিকে চললাম। আগাগোড়া সবটাই আমার চোখের ভুল? বাদুড়ঘটিত ঘটনার এই উপসংহারটুকু আমি গুণধর বা বাড়ির কাউকে আর বললাম না।
তবে এতকাল পরে মনে হয়, আসলে ব্যাপারটা আগাগোড়াই ভৌতিক। দৈবাৎ কীভাবে ভূতদের জীবনে ঢুকে পড়েছিলুম এবং তার ফলে কিছুটা ভুগতেও হয়েছিল। ভূতেরা সত্যি বড় অদ্ভুত।
মাছ ধরার আপদ-বিপদ
কথাটা উঠেছিল খবরের কাগজের একটা বিজ্ঞাপন নিয়ে। সাঁতরাগাছিতে রেল লাইনের ধারে একটা পুকুর আছে। খুব মাছ আছে সেখানে। পুকুরের মালিক সরকারি রেল-দপ্তরের লোক। ছিপ ফেলে মাছ ধরার এমন সুযোগ নাকি আর কোথাও মিলবে না। অতএব রেলের অফিসে দশটা টাকা জমা দিয়ে সেই পুকুরে ছিপ হাতে বসে পড়া যায়।
ভাদ্র মাসের শেষ। কদিন বৃষ্টির পর আকাশ অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। শরতের কড়া রোদে ঘরবাড়ি গাছপালা দারুণ ঝলমল করছে। পুজোর ছুটি আসতে তখনও দেরি। কিন্তু এমন হাসিখুশি দিন দেখে মনটা আগাম ছুটি নিতে চাইছে।
সেই সময় সুবিখ্যাত নান্টুমামা এসে হাজির হলেন।
মামার মাথায় টাক, মুখে ইয়াবড় গোঁফ, আর পেটে ভুঁড়ি আছে। পাছে খুঁড়ি ওঁকে ছেড়ে পালায়, তাই চওড়া শক্ত বেল্ট টাইট করে পরে থাকেন। এসেই বললেন,–কী রে? তোরা সব খবরের কাগজ ঘিরে বসে আছিস কেন? ভোটে দাঁড়াবি নাকি? বিবৃতি দিয়েছিস? দেখি কী বলেছিস! রেশনে চালের কোটা বাড়াবার কথা বলেছিস তো?
উনি পকেট থেকে চশমা বের করে ঝুঁকে পড়লেন। তখন আমি বললুম, না মামা, মাছ!
মাছ? আর কিছু নয়, স্রেফ মাছ? বলে মামা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। আবার বললেন, চাল নয়, শুধু মাছ? সে কী রে? মাছ খাবি কী দিয়ে? যাঃ!
–হ্যাঁ মামা, মাছ! খবরের কাগজে মাছ বেরিয়েছে।
–খবরের কাগজে মাছ? চালাকি হচ্ছে? মাছ তো পুকুরে থাকে।
ভুতো বলল, কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছে মামা। এই দেখুন না!
মুখ তুলে বললেন, ! সাঁতরাগাছির রেলপুকুর–তার আবার মাছ। যেতিস যদি ডাইনিতলার পেতনিদিঘিতে, দেখতিস মাছ কাকে বলে! ছিপ ফেলতে না ফেলতেই আড়াই সের থেকে সাত সের ওজনের বাঘা বাঘা রুই উঠে এসে সিগ্রেট খেতে চাইবে!
ইতি বলল,–মাছ সিগ্রেট খায় নাকি মামা?
নান্টুমামা বিজ্ঞের মতো হেসে বললেন, খায়। তোরা দেখিসনি!
সন্তু বলল, ডাইনিতলায় পেতনিদিঘি না কী বললেন, সেখানে বুঝি পেতনি থাকে?
–হুঁ! থাকে বইকী!
–আপনি দেখেছেন?
–দেখেছি মানে? দেখেছি, কথা বলেছি। নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছি।
নান্টুমামা এলে আমাদের জোর জমে যায়। এবারও জমে গেল। ইনি ডাইনিতলার পেতনদিঘির পেতনি দেখার গল্প শোনাতে বসলেন। আমরা হাঁ করে শুনে গেলুম। গল্প শেষ হলে সন্তু বলল, ঠিক আছে। মামা, আমাদের তাহলে পেতনিদিঘিতেই নিয়ে চলুন। মাছ ধরব, পেতনি দেখব, আবার তার বাড়ি নেমন্তন্ন খাব। কী রে, তোদের কী মত?
আমরা সবাই এক কথায় বলে উঠলুম, হা-হ্যাঁ! নিয়ে চলুন।
নান্টুমামাকে চিন্তিত দেখাল। বললেন,–নিয়ে যেতে আপত্তি ছিল না, কিন্তু সম্প্রতি খবর পেলুম, শ্ৰীমতী পেতনি দেবী বোম্বে গেছেন। সিনেমার শুটিংয়েই গেছেন। অবশ্য বলা যায় না, থেকেও যেতে পারেন সেখানে। তার চেয়ে আমরা এই সাঁতরাগাছির রেল পুকুরেই যাই বরং। সেখানে কি দু-একজন পেতনি থাকবে না? আলবাত আছে। বিজ্ঞাপনে সব লেখেনি!
অগত্যা তাই ঠিক হল। দলে বেছে-বেছে শুধু সাহসী ছেলেমেয়েদের নেওয়া হল। কারণ পেতনির মুখোমুখি হওয়া সোজা নয়। আমি, সন্তু, ভুতো, পাগলু-চারজন ছেলে। আর মেয়ে শুধু একজন ইতি।
মামাকে নিয়ে আমরা হলুম ছজন। ছজনের জন্যে ছিপ নেওয়া হল দুখানা। একটা ছিপে মামা, আমি আর ভুতো বসব। অন্যটায় সন্তু, ইতি, পাগলু। ব্যাগ ভর্তি খাবার, ফ্লাস্কভর্তি চা নেওয়া হল। হাওড়া স্টেশনে গিয়ে মামা একগাদা ফল কিনলেন। ছিপ, বঁড়শি, চার, টোপ আগের দিন নিউমার্কেটে গিয়ে কেনা হয়েছিল! রেল অফিসে টাকাও জমা দিয়ে এসেছিল সন্তু।
রোববার সকালে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। নটা নাগাদ পৌঁছলুম সাঁতরাগাছি রেলপুকুরে। রেললাইনের ধারেই লম্বা-চওড়া মস্ত পুকুর। বাকি তিনদিকে ঝোঁপ ঝাড় আর গাছপালার ঘন জঙ্গল। দেখলাম আরও অনেকে ছিপ নিয়ে এসেছে। তারা জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়েছে। জঙ্গলের দিকগুলোয় লোক খুব কম। যত লোক রেল লাইনের দিকটায়।
নান্টুমামা আমাদের দক্ষিণের জঙ্গলে ঢোকালেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা ছিপ ফেলার মতো জায়গা পাওয়া গেল। সেখানে মামার দল বসল। তার হাত বিশেক দূরে ডাইনে একটা জায়গায় বসল সন্তুর দল। আমরা কেউ কোনও দলকেই দেখতে পাচ্ছিলুম না। ঝোঁপের আড়াল রয়েছে। তাতে কী? মাছ গাঁথা হলে চেঁচিয়ে জানিয়ে দেব পরস্পরকে। তাছাড়া নান্টুমামা পকেটে হুইসেল নিয়েছেন। দরকার হলে ওটা বাজিয়ে দেবেন। আয়োজন খুব পাকা করা হয়েছে।
