সতু দাঁত বের করে বলল,–ওর মুখ শুঁকে দেখ! তাছাড়া ও করল কী জানিস নিরু? ডিম খেয়েও খিদে মিটলো না। তখন পাখির বাসাটা চিবুতে শুরু করল।
নিরু গম্ভীর গলায় বলল, খুব অন্যায় করেছিস্ বিজু!
আমি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললুম,–আর তপু যে মরা পিঁপড়ে খাচ্ছিল। আর তুই যে শত মিটার মস্তো ভুতুড়ে হাতে আমাকে…
নিরু বাধা দিয়ে বলল, শা আপ! ডিসিপ্লিন ভাঙছিস বিজু!
তপু এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। এবার একটু হেসে বলল, বিজু কী বলল রে? আমি পিঁপড়ে খাচ্ছিলুম?
বললুম, হ্যাঁ। খাচ্ছিলি তো! আমাকেও খেতে বলছিলি!
নিরু আবার লিডারের ব্যবহার দেখাতে যাচ্ছিল, তপু তাকে থামিয়ে দিয় বলল,–কোথাও একটা গোলমাল হয়েছে মনে হচ্ছে।
নিরু বলল,–কীসের গোলমাল হবে। বিজুটা মিথ্যে করে আমার লম্বা হাতের কথা বলছে। এই তো আমার হাত। মেপে দ্যাখ ক মিটার।
তপু বলল,–ওয়েট, ওয়েট। শোন, গোলমাল একটা হয়েছে কোথাও। প্রথম কথা, জ্ঞানত ধৰ্মত বলছি–আমি মোটেও পিঁপড়ে-টিপড়ে খাইনি। আপন-গড। মা কালীর দিব্যি। মা সরস্বতীর দিব্যি।
সতু বললে,–আমিও দিব্যি করতে পারি। স্বীকার করছি, আমার বেশি খিদে পায়, তাই বলে ঘাস-পাতা খাব কোন দুঃখে।
অমু বলল,-আমিই বা মাটি খাব কেন? বই দে, ছুঁয়ে বলছি।
আমি বললুম, আমিও তো বলছি, পাখির ডিম বা বাসা খাওয়ার কী মানে হয়? আমি ভূত না রাক্ষস? যা ছুঁয়ে বলতে বলবি বলব।
তপু বলল, আমি শুনেই বুঝতে পেরেছি, কোথাও একটা গোলমাল হয়েছে।
নিরু বলল,–কিন্তু গোলমালটা কীসের?
তপু গম্ভীর হয়ে বলল,-ভৌতিক গোলমাল।
–ভৌতিক গোলমাল মানে?
এ পাহাড়টা মনে হচ্ছে ভুতুড়ে। বাংলোটাও তাই। তপু বলতে থাকল।
–আমরা পরস্পর যাদের আজেবাজে জিনিস খেতে দেখেছি। তারা সবাই ভূত। আমাদের চেহারা ধরে গোলমাল পাকাতে চেয়েছিল। কিন্তু জ্যান্ত মানুষ আমরা– আমাদের সঙ্গে এঁটে ওঠা কি সহজ? নিরু, অবস্থা তো বুঝলি। তুই লিডার, এবার ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করে বল, কী করবি?
ঘরে একেবারে চুপচাপ অবস্থা। শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দিনদুপুরে এমন গোলমেলে কাণ্ড দেখা যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল?
একটু পরে নিরু বলল, উল্লাদা কতকটা ইশারা দিয়েছিলেন বটে তবে উনি যখন ভয় পাননি, আমরাই বা ভয় পাব কেন? তোরা শোন! আমরা এখানে থাকছি। কিন্তু একটা কথা বলে দিচ্ছি, কেউ যদি কাউকে কোন বিদঘুঁটে কান্ড করতে দেখিস, জানবি সে ভূত। অমনি তাকে রামধোলাই দিতে শুরু করবি। এই আমার নির্দেশ। এবার চল, সবাই মিলে প্রবণটা খুঁজে বের করি। স্নানটান করে খেয়ে নেওয়া যাবে।
বিকেল অব্দি তেমন কিছু ঘটল না। রামনারাণ আর রঘুপতি, তাদের আর পাত্তা পাওয়া গেল না। আমরা ক্লান্ত ছিলুম বলে বিকেল অব্দি জিরিয়ে নিয়েছি। খাটটা বেশ চওড়া। পাঁচজনে ঠাসাঠাসি করে শুতে অসুবিধে নেই। শীতের সময়। এভাবে শুলে আরামই লাগে। বিকেলে উঠে শুকনো কাঠকুটো কুড়িয়ে একটা এনামেলের মগে জল ফুটিয়ে চা করা হল। চা-চিনি-দুধের কৌটো সবই ছিল।
চা খাওয়ার পর বাংলোর সামনে উঠোনে বসে আছি, হঠাৎ দেখি অমু সতুকে দুমদাম মারতে শুরু করল। সতু হাউমাউ করে উঠল। নিরু বলল, কী হল রে? হলটা কী?
অমু আবার একটা কিল চালিয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল,–ভূত! এ ব্যাটা ভূত! সতু না!
সতু ভ্যাঁ করে কেঁদে বলল, আমি ভূত না, সতু! মাইরি সতু! চিমটি কেটে দ্যাখ!
নিরু ছাড়িয়ে দিয়ে বলল, ব্যাপার কী বলবি তো অমু!
অমু বলল,–ও আবার ঘাস খাচ্ছিল।
সতু কাঁদতে কাঁদতে প্রতিবাদ করল, না রে নিরু, না। আমার অভ্যেস। আমি ঘাস ছিঁড়ে এমনি দাঁতে চিবুচ্ছিলুম,–অনেকেই তো এমন করে। অভ্যেস!
আমার আবার আঙুল কামড়ানো অভ্যেস। টের পেলাম আঙুলটা তখনও মুখে রয়েছে এবং তপু আড়চোখে তাকাচ্ছে, আর মুঠো রেডি করছে। ঝটপট আঙুল বের করে নিলুম। তপু সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তবু। কাঁচুমাচু হেসে ফিসফিস করে বললাম, কিছু না! অভ্যেস!
শীতের বেলা দ্রুত ফুরিয়ে এল। এমন জায়গায় রাত কাটানোর অস্বস্তি পেয়ে বসেছিল সবাইকে। তার ওপর, পরস্পরের প্রতি পরস্পরের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি। প্রত্যেকে খুব সতর্ক হয়ে গেছে। যেন বিদঘুঁটে কোনও কাণ্ড না করে ফেলি নিজের অজান্তেও।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশায় ঢেকে ফেলল পাহাড় আর এই বাংলোকে। তারপর হঠাৎ নিরু বলল, সর্বনাশ! মস্ত ভুল হয়ে গেছে। আমাদের একটা আলো আনা উচিত ছিল।
তপু বলল,–কেন? টর্চও তো আছে প্রত্যেকের।
একটা ল্যাম্পের দরকার ছিল না? –নিরু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল। অন্তত কিছু মোমবাতি আনাও উচিত ছিল। ধুস! এমন ভুল মানুষ করে? টর্চের আলোয় রান্না করতে হলে ব্যাটারি পুড়ে শেষ হয়ে যাবে।
আমরা তখন পরস্পর কাছাকাছি থাকছিলুম। ঘরে গিয়ে আরও কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করলুম। এমন সময় দেখা গেল, পাহাড়ের নিচের দিক থেকে একটা আলো উঠে আসছে। আমরা নেচে উঠলুম।
নিরু বলল, নিশ্চয় সেই দুই ব্যাটা ভূতের একজন আসছে। হয় রামনারাণ, নয়তো রঘুপতি। একটা কথা শোন। আলোটা আমাদের সত্যি বড় দরকার। ওদেরকে নিয়ে কী করব? ভূতটুত নিয়ে সমস্যায় পড়ব। ওদের ঝগড়া থামাতে হবে। তার চেয়ে একটা প্ল্যান করা যাক।
অমু বলল, বল। শুনি।
নিরু চাপা গলায় বলল, আলোটা আগে হাতিয়ে নেব। তারপর ব্যাটাকে রামধোলাই শুরু করব সবাই মিলে। মারের চোটে ভূত ভাগানোর কথা শুনিসনি? পাগল আর ভূত, দুটোকেই মার দিলে কাজ হয়। রেডি হ তোরা। টপ্পাদা ঠিক এমনি করেই সেবারে ওদের ভাগিয়ে দিয়েছিলেন।
