তপু যেন অবাক হয়ে বলল,–ফেলে দিলি? এত কষ্ট করে খুঁজে আনলুম।
–ভ্যাট! কী বলছিস তুই? মরা পিঁপড়ে মানুষ খায়?
তপু আমাকে দারুণ অবাক করে সেই ইয়া বড় মড়া পিঁপড়েটা কুড়িয়ে নিয়ে মুখে পুরল। তারপর তৃপ্তির সঙ্গে মুড়মুড় করে চিবুতে লাগল।
আমি হতভম্ব হয়ে বললুম, ছি-ছি! তোর কি মাথা খারাপ হল তপু? এ কী খাচ্ছিস তুই?
তপু মুঠো থেকে আঙুলের ডগায় করে আরও একটা প্রকাণ্ড মরা পিঁপড়ে মুখে চালান করে দিল। এবার আমি খুব রেগে গেলুম যা খুশি কর! নিরু ডাকছে। আমি চললুম। বলে হনহন করে ওর কাছ থেকে চলে এলুম।
বাংলোর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, রামনারাণ যত্ন করে ঘর ধুচ্ছে। দক্ষিণপাশে গিয়ে ডাকলুম, নিরু! তোরা কোথায়?
পাহাড়ের একটু নিচের দিকে সাড়া এল,–চলে আয়, বিজু! শিগগির চলে আয়!
এদিকে ঘন জঙ্গল। মধ্যে মধ্যে অনেক পাথর রয়েছে। কিছুটা নেমে গিয়ে দেখলুম একটা প্রস্রবণ রয়েছে। একটা চৌবাচ্চার মতো পাথরের খাদ থেকে ঝিরঝির করে জল নিচে গড়িয়ে যাচ্ছে। প্রস্রবনের ধারে বসে নিরু বনরুটি ছিঁড়ে খাচ্ছে। একটু অভিমান হল। সবাই আসার তর সইল না ওর? ও না দলের লিডার? আমি চৌবাচ্চাটার অন্য ধরে দাঁড়িয়ে বললুম,–ওরা এখনও আসেনি?
নিরু হেসে বলল, আসছেখন। নে, খেয়ে ফেল।
চৌবাচ্চার ওধারে যেখানে সে বসে আছে, সেখান থেকে আমি যেখান দাঁড়িয়ে আছি, কমপক্ষে শতমিটার দূরত্ব তো বটেই। আমার চোখ বড়ো হয়ে গেল। নিরুর হাতটা শতমিটার লম্বা হয়ে আমার নাকের ডগায় একটা মোড়কে ভরা বনরুটি ধরেছে।
এই রুটিগুলো গতকাল আমাদের পাড়ার বেকারি থেকে কেনা। কিন্তু কথা হচ্ছে, নিরু যত লম্বাই হোক, এত দুরে ওর হাত এল কীভাবে? টের পেলুম, আমার পা দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে।
নিরু বলল,–নে না বাবা! কতক্ষণ ধরে থাকব?
অমনি চোখ বুঝে দৌড়তে শুরু করলুম। দৌড়নো বলা ভুল। পাহাড়ে চড়াই ভাঙা কী ব্যাপার, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝানো কঠিন। দুহাত-দুপায়ে কাঠবিড়ালির মতো হাঁচড়-পাঁচড় করে এগোচ্ছিলুম আর কী!
একটু পরে বাংলোর দেখা মিলল। সমতল একটা জমিতে বাংলোটা রয়েছে এতক্ষণে বোঝা গেল। উঠোনের পাশে একটা গাছের তলায় অমুর দেখা পেলুম। সে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে হাঁপাতে-হাঁপাতে উঠতে দেখে সে তাকাল। বলল, কী রে তোরা। খুঁজেই পাচ্ছিনে তোদের! নিরু কোথায় গেল? তুই বা কোথায় গিয়েছিলি?
ভাবলুম, ব্যাপারটা বললে অমু নিশ্চয় হো-হো করে হেসে উঠবে। বলবে, গুল দিচ্ছি। তাই চেপে গেলুম। বললুম, সতু কোথায়? পেলি দেখা?
অমু বলল,–অদ্ভুত ব্যাপার রে! সতু…
ওকে থামতে দেখে বললুম, কী হল সতুর?
অমু ফিসফিস করে বলল,–অবাক কান্ড বিজু। সতুটা ওখানে একটা ঝোঁপের ধারে বসে কী খাচ্ছিল জানিস? ঘাস। বিশ্বাস কর বিজু। খিদেটা ওর বরাবর বেশি। তাই বলে ঘাস খাবে? আমাকে দেখে খুব লজ্জা পেয়ে গেল। বলল, কাকেও বলিস নে। তারপর করল কী জানিস? হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে ঝোঁপ থেকে পাতা ছিঁড়ে খেতে লাগল। বকাবকি করে চলে এলুম। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি বল?
কথাগুলো করুণ মুখে বলার পর অমু ধুপ করে বসে পড়ল। বললুম, বসে কী হবে? উঠে আয়। ব্যাপার বড্ড গোলমেলে মনে হচ্ছে। বাংলোয় গিয়ে আলোচনা করা যাক।
অমু বলল,-আলোচনা করার কী আছে?
–আছে রে! তুই সতুকে ঘাস আর পাতা খেতে দেখলি। আমি তপুকে কী খেতে দেখলুম জানিস? ইয়া বড় বড় মরা পিঁপড়ে। পাহাড়ি পিঁপড়ে।
অমু মুখ ভেংচে বলল, রামো! পিঁপড়ে! ছ্যা ছ্যা! বড় বোকা তো তপুটা, বরং মাটি খেলেও পারত।
বলে সে পায়ের কাছ থেকে একমুঠো কঁকড়ঘুটি-ভরা মাটি তুলে নিয়ে মুখে পুরল এবং কড়কড় করে খেতে শুরু করল।
আর সহ্য করতে পারলুম না। রেগে চেঁচিয়ে উঠলুম,–তোরা কি রাক্ষস, না ভূত? হয়েছে কী তোদের? এই নাক কান মলা–কেটে পড়ছি।
তারপর হনহন করে বাংলোয় গিয়ে ঢুকলুম। জিনিসপত্তর নিয়ে এক্ষুনি কেটে পড়া যাক দল থেকে। আগে যদি জানতাম, এরা এখানে কেউ ভূতের মতো হাত শতমিটার লম্বা করে ফেলবে, কেউ পিঁপড়ে খাবে, কেউ ঘাস, কেউ মাটি–তাহলে কে আসত এদের সঙ্গে? ফিরে গিয়ে টপ্পাদাকে সব রিপোর্ট করবখন।
ঘরে ঢুকে দেখি, কেউ নেই। রামনারাণ হোক, কিংবা গাছেঝোলা ভূতই হোক, ঘরটা চমৎকার সাফ করে রেখেছে। লোহার খাটের ভেঁড়া গদির ওপর সুন্দর একটা চাদরও বিছিয়ে দিয়েছে। বালিশও এনে রেখেছে গুনে-গুনে পাঁচটা।
পেটের খিদে ভুলে গেছি অনেক আগেই। কিন্তু এখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছি। এমন সুন্দর বিছানা দেখেই ঘুমের টান এসেছে চোখে। ধুপ করে গড়িয়ে পড়লুম।
সবে চোখ এঁটেছে, হল্লার শব্দে ঘুম ছুটে গেল। চোখ খুলে দেখি, নিরু, তপু, অমু আর সতু তর্কাতর্কি করতে করতে ঘরে ঢুকছে। নিরু বলছে, আলবাত দেখেছি, তুই মাটি খাচ্ছিলি।
অমু বলছে, কিন্তু সতু যে ঘাস আর পাতা খাচ্ছিল, তার বেলা?
সতু বলছে–হুঁ। আমি না হয় তাই খাচ্ছিলুম। বিজু কী খাচ্ছিল জিগ্যেস কর
লাফিয়ে উঠলুম, খবর্দার সতু। যা-তা বলবিনে। আমি কিছু খাইনি।
সতু বলল, মিথ্যে বলবিনে বিজু। তুই গাছে চড়ে পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করে খাচ্ছিলি। আমাকেও ডাকলি না, বল?
–কী বললি? আমি রুখে দাঁড়ালুম। মিথ্যুক তুই! মহা মিথ্যুক!
