লণ্ঠনটা উঠোনের ও প্রান্তে দেখা গেল। ঘন পাহাড়ি কুয়াশা। আলোর ছটা দুহাত অব্দি পৌঁছচ্ছে। দেখা গেল, একজন নয় দুজন আসছে। তার মানে রামনারাণ আর রঘুপতি দুজনেই। হয়তো নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নিয়েছে। নাকি আবার ঝগড়াঝাঁটি করতেই আসছে?
নিরু ফিসফিস করে বলল, রেডি। তপু, তুই ওরা বারান্দায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলোটা কেড়ে নিয়ে ঘরে চলে আসবি। সত্যু, বিজু, অমু! তোরা আমার সঙ্গে হাত লাগাবি। কাম অন!
বারান্দায় দুজনে উঠেছে, অমু, তপু বাঘের মতো দরজা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছে। তারপর হাচটা টানে হ্যারিকেনটা কেড়ে নিয়েছে। আর আমরাও একসঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছি ওদের ওপর। তারপর দুমদাম কিল-থাপ্পড়চড়-ঘুষি।
দুই মূর্তি আলো কাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হকচকিয়ে গিয়েছিল। মার খাওয়ার কয়েক সেকেণ্ড পরে যেন তারা টের পেল যে তাদের বেজায় রামধোলাই দেওয়া হচ্ছে। গলা ফাটিয়ে একসঙ্গে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠল, ওরে বাবা রে! মেরে ফেললে রে! ওরে বাবা রে! এরা কারা রে!
আমার কানে একটা গলা খুব চেনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু ভূত তো চেনা মানুষ হয়েই দেখা দেয়, দেখা দিয়েছে আমাদের।
তারপর একজন পড়ে গিয়ে চেঁচাতে থাকল,–ওরে নিরু রে! তপু-রে! বিজু রে! অমুসতু-রে! তোরা কোথা গেলি রে! আমায় বাঁচা রে।
তপু দৌড়ে এল আলো নিয়ে। আলোয় দেখি সর্বনাশ! স্বয়ং টপ্পাদা সেজে এসেছে! চালাকি বুঝছিস নে?
সে আবার ঘুষি পাকিয়ে যেতেই টপ্পাদা আর্তস্বরে বললে,–ওরে, আমি ভূত নই! মারিসনি, আর মারিসনি। তোদের বিপদ-আপদ হবে ভেবে লোক নিয়ে এসেছি রে!
.
তারপর কী হল, কহতব্য নয়। টপ্পাদার পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেও ওঁর রাগ পড়ে না, তোদের জন্যে আমি পরের ট্রেনে কষ্ট করে এলুম। ভেবেছিলুম ডেভিড সাহেবের বাংলোয় আবার ভূতের হাতে না পড়ে। অনভিজ্ঞ ছেলেপুলে সব। তাই তিন মাইল দূরের গ্রাম থেকে চৌকিদারকে ডেকে নিয়ে আসছি, আর তোরা…উঃ!
এই লোকটাই তাহলে আসল চৌকিদার। বেচারা একটু হেসে বলল, ছোড় দিজিয়ে বাবুজী। খোকাবাবুলোগ ডরসে মারা হ্যায়। ডর পেয়ে মাথা বিগড়িয়ে গিয়েছে। উনহিদের হাতমে মারউর বহুৎ মিঠা হ্যায়। ছোটা-ছোটা হাত, মার ভি বহুং ছোটা।
টপ্পাদার মুখে হাসি ফুটল। বললেন, ঠিক আছে।
ভৌতিক বাদুড় বৃত্তান্ত
গুণধর বলল,-একটা কথা বলি দাদাবাবু! বাদুড়কে রাতবিরেতে কক্ষনো বাদুড় বলবেন না। বলবেন রাতপাখি।
অবাক হয়ে বললুম,–কেন বলল তো গুণধর?
গুণধর হাসল।–এ তো সোজা কথা দাদাবাবু। কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বললে রেগে যায়। সাপকে কেউ কি সাপ বলে। বলে, পোকা। বাঘকে বলে, বড়মিয়া। ভূতপ্রেতের নাম ধরে কি কেউ ডাকে? বলে–ওনারা। বাদুড় বড় অমঙ্গুলে জীব দাদাবাবু, কক্ষনও রাতবিরেতে ও নাম মুখে আনবেন না।
–আহা, বাদুড় অমঙ্গুলে কেন?
–প্রথম কথা হল, বাদুড়ের সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার। সবাই পা নিচে আর মাথা ওপরে করে দাঁড়ায়। বাদুড় দাঁড়ানো তো দূরের কথা, পা ওপরে মাথা নিচে করে উল্টো হয়ে ঝোলে। দ্বিতীয় কথা হল, বাদুড় উড়তে পারে। কিন্তু দেখুন, যারা ওড়ে তারা ডিম থেকে জন্মায়–অথচ বাদুড় ডিম থেকে জন্মায় না। তার চেয়ে বড় কথা, বাদুড় মায়ের স্তন থেকে দুধ খেয়ে বড় হয়। এসব সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড না দাদাবাবু?
কথা হচ্ছিল বাদুড় নিয়ে। কারণ কিছুদিন থেকে দেখছি, খেলার মাঠের ধারে পুরোনো শিবমন্দিরে দেয়াল ফাটিয়ে-ফাটিয়ে যে গাছটা উঠেছে, তার ডালে একটা বাদুড় ঝোলে। ছেলেরা সন্ধ্যার মুখে খেলা শেষ করে চলে গেলে মাঠটা যখন নিরিবিলি ভৌতিকবাদুড় বৃত্ত হয়ে ওঠে, তখন বাদুড়টা অদ্ভুত চিৎকার করে আমার দিকে ছুটে আসে এবং আমি সরে বসার আগেই চঁটি মেরে উড়ে যায়।
কদিন এই জ্বালাতন সহ্য করার পর আমাদের বাড়ির কাজের লোক গুণধরকে (আমরা ওকে চাকর বলি না–বলতে নেই।) ব্যাপারটা বললাম। বাদুড়টাকে তাড়াতেই হবে। এজন্য ওর সাহায্য দরকার। কিন্তু গুণধর এইসব কথা বলে আমাকে ভড়কে দিল। শেষে বলল, সন্ধেবেলা একা-দোকা নাইবা গেলেন ওখানে? রাতপাখিটা যখন আপনাকে পছন্দ করছে না তখন না যাওয়াই ভালো।
আমার জেদ চড়ে গেল মাথায়। দিনের বেলা বাদুড় চোখে দেখতে পায় না। সকালবেলা একটা ছোট্ট লাঠি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বাড়িটা এই মফস্বল শহরের শেষ দিকটায়। খেলার মাঠ পেরিয়ে ভাঙা শিবমন্দিরের কাছে গিয়ে দেখি হতচ্ছাড়া বাদুড়টা ঝুলছে, লাঠিটা জোরে ছুঁড়ে মারলাম তার দিকে। অমনি বিকট চিৎকার করে নিচে পড়ে গেল। তখন মায়া হল বড্ডসামান্য একটা কারণে বেচারিকে মেরে ফেললুম?
বাদুড়টা মরেনি কিন্তু। ঘাসের ওপর চিত হয়ে চুপচাপ পড়ে রয়েছে। চকচকে লালচোখে তাকিয়ে আছে। দাঁত বের করা বেজির মতো মুখ। দেখে একটু ভড়কে গেলুম। বাদুড়টাকে বড় ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। ঠোঁটের একপাশে খানিকটা রক্তও জ্বলজ্বল করছিল। মুখে একটু জল দেব ভাবলুম। কিন্তু এমন হিংসে বিটকিলে মুখের দিকে তাকাতে দিনদুপুরেই গা ছমছম করছে যে। হঠাৎ সেই সময় মন্দিরের পাশ থেকে জটাজুটধারী এক সাধু বেরিয়ে এলেন। তারপর ব্যাপারটা দেখেই গর্জন করে বললেন,–আরে আরে দূরাচার পাপিষ্ঠ। তুই আমার বাহনকে বধ করেছিস? অভিশাপ লাগবে তোর। তুই উচ্ছন্নে যাবি।
