আমরা দৌড়ে গেলুম। বারান্দায় উঠে মনে হল, যেন ঘরের ভেতর মারামারি শুরু হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকে দেখি, নিরু মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে রামনারাণ আর অন্য একটা অচেনা লোককে সামলাচ্ছে। দুজনেই মারমুখী। অমু বলল, কী হয়েছে রে নিরু?
নিরু হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, কী ঝামেলা দ্যাখ তো! রামনারাণ যাওয়ার পর কোত্থেকে এই লোকটা এসে বলছে, কার হুকুমে বাংলোয় ঢুকেছেন আপনারা? আমি বাংলোর চৌকিদার। রামনারাণ বলে এক চৌকিদার ছিল বটে, তবে সে নাকি তার ঠাকুর্দার আমলে। এখন ও নামে কেউ নেই।…
অচেনা লোকটা বাধা দিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলল,–নেইই তো।
অমনি রামনারাণ হুংকার দিয়ে বলল, খবরদার! নেই মানে? আমি কে তাহলে?
অচেনা লোকটাও রামনারাণের মতো রোগা। অমনি প্রকাণ্ড গোঁফ আছে। এমনকি এর পোশাকও হুবহু এক। তফাতের মধ্যে এর একটা কানই নেই, অন্য কানটাও রামনারাণের মতো অত বড় নয়। সে রামানারাণের কথা শুনে বলল, তুমি কে? তা বললে তো খোকাবাবুরা ভয় পাবেন। তাই বলছি, আর কথা বাড়িও না। ভালো চাও তো মানে-মানে কেটে পড়ো!
নিরু বলল, ভয় পাব মানে? ভয় পাব কী হে?
লোকটা বাঁকা হেসে বলল, আমার ঠাকুরদার কাছে শুনেছি, ডেভিড সাহেব এই বাংলোর মালিক ছিলেন। তাঁর আমলে রামনারাণ বলে একজন চৌকিদার ছিল। গলায় দড়ি দিয়ে মারা গিয়েছিল সে। আর কোনও রামনারাণের কথা জানি না।
একথা শুনে অমু আর আমি পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলুম। আর রামনারাণ লাফিয়ে উঠে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, দ্যা রঘুপতি! এবার আমার মাথায় সত্যি খুন চড়ে যাচ্ছে। আমাকে তুই মরা মানুষ বলতে চাইছিস?
রঘুপতি মুখ ভেংচে বললে,–আলবৎ বলছি! তুই তো মড়া। গাছে ঝোলা মড়া। কমবয়সি এসব ছেলেপুলে দেখে তাদের ভয় দেখাতে এসেছিস! লজ্জা করে না তোর?
রামনারাণ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ওরে রঘুপতি! আমি মড়া আর তুই বুঝি জ্যান্ত মানুষ? দেব এবার ফাস করে তোর কীর্তি? দেব? দিই তাহলে?
রঘুপতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, দে না ফাঁস করে, দি দিবি?
রামনারাণ নিরুর দিকে তাকিয়ে বলল,–খোকাবাবু, বাঁচতে চান তো এ ব্যাটাকে তাড়ান। এ ব্যাটা গত বছর কঠিন ব্যামোয় পটল তুলেছে। এই বাংলোর পেছনের একটা ঘরে থাকত ব্যাটা। এবার বুঝেছেন তো ও কে?
আমি ও অমু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। নিরু কিন্তু ঘাবড়ে যায়নি। সে হাসতে হাসতে বলল, তোমরা দুজনেই তাহলে মরা মানুষ–তার মানে ভূত, এই বলছ তো?
রঘুপতি বলল,-মোটেও না, মোটেও না। ও ব্যাটা ভূত, আমি ভূত হব কোন দুঃখে খোকাবাবু? আসলে কী জানেন? ওর বড় খারাপ অভ্যাস। এখনও দখল ছাড়তে পারে না। কিছুদিন আগে এক বাবু এলেন, আপনাদের মতো বাঙালি, মাথায় বড় বড় চুল বয়েস চব্বিশ-পঁচিশ হবে…
নিরু বলল, হুঁ। আমাদের টপ্পাদা।
রঘুপতি বলল,–তো সেই বাবুও এসে ওর পাল্লায় পড়লেন। গতি দেখে আমাকে আসতে হল। তারপর তো বুঝতেই পারছেন, আমাদের ঝগড়া থামাতে বাবুর হিমশিম অবস্থা। শেষে বললেন, ঠিক আছে। মীমাংসা করে দিচ্ছি।
নিরু বলল,–হুঁ, জানি। টপ্পাদা তোমাদের রেস লড়িয়ে দিলেন। যে আগে ওই ওপরকার মন্দিরের বটগাছ থেকে একটা পাতা আনতে পারবে–সে জ্যান্ত মানুষ, আর যে হেরে যাবে সে মরা মানুষ।
রামনারাণ একগাল হেসে বলল, আমি জিতেছিলুম না? রঘুপতিটাই তো হেরে গিয়েছিল। বলেননি আপনাকে?
নিরু কী বলতে যাচ্ছে, রঘুপতি চেঁচিয়ে বলল,-বাঙালিবাবু বোকা! বোকার হদ্দ! আরে, ভূতের সঙ্গে জ্যান্ত মানুষ কখনও পারে? তাই আমি হেরে গিয়েছিলুম।
নিরু এবার রেগে গেল, টপ্পাদা মোটেও বোকা নন। যা-তা বোলো না।
রঘুপতি বেজার হয়ে বলল, ঠিক আছে। কে জ্যান্ত, কে মড়া বুঝুন। আমি চলে যাচ্ছি। ওই গাছে-ঝোলা রামানারাণটা যখন নিজের মূর্তি ধরবে, তখন বুঝবেন ঠ্যালা। তখন আর মাথা ভাঙলেও আমি আসব না।
বলে রঘুপতি জোরে বেরিয়ে গেল। নিরু বলল,–যতে সব! রামনারাণ, ঘর সাফ করো! ততক্ষণ আমরা বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে নিই। হ্যাঁজল কোথায় পাব, বলে দাও তো রামনারাণ!
রামনারণ ঝাড়ু হাতে মেঝের দিকে ঝুঁকে বলল, বাংলো-ঘরের দক্ষিণদিকে গেলে একটা পাতালঝরনা পাবেন।
নিরু বলল, আয় তোরা!
বেরিয়ে গিয়ে অমু বলল,-পাতালঝরনা কী রে? প্রস্রবণ নাকি?
নিরু বলল, । কিন্তু সতুটা কোথায় গেল? তপুই বা কোথায়?
বললুম,–তপু ওই উত্তরদিকে গেল দেখলুম একটু আগে।
নিরু বলল,–ডাক তো ওকে। আর অমু, তুই দ্যাখ তো সতু কোথায় গেল। এরা এখন থেকেই ডিসিপ্লিন ভাঙতে শুরু করেছে।
আমি ততক্ষণে মনে-মনে বেশ অস্বস্তিতে ভুগছি। গাছের দড়িটা, আর এই দিনদুপুরে ভূত-মানুষ তর্কাতর্কি, কোনও মাথামুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছিনে। ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে ডাকলুম,–তপু! তপু!
তপুর সাড়া এল,–এই যে এখানে!
ঝোঁপের শেষে উঁচু হয়ে ওঠা পাহাড়ের গা থেকে একটা প্রকাণ্ড পাথর বেরিয়ে রয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখি, একটা গুহা। এবং গুহার দরজায় বসে তপু কী চিবুচ্ছে। আমাকে দেখে হাসিমুখে ডাকল হাত তুলে। কাছে গিয়ে বললুম, কী চিবুচ্ছিস রে?
তপু পাশে বসতে ইশারা করল। বসলুম। তপু বলল,-খাবি নাকি? দারুণ টেস্টফুল জিনিস! দ্যাখ না খেয়ে।
কী বলতো? বলে হাত বাড়ালুম।
তপুর মুঠোয় কিছু রয়েছে। সে মুঠো থেকে আমার হাতে যা দিল, আমি তক্ষুনি ছি-ছি করে ফেলে দিলুম। খিদেয় পেট ফোঁ-টো করছে। এখন এই ঠাট্টা-তামাশার মানে হয়?
