ঠিক তাই বটে। আমরা খুব উৎসাহের সঙ্গে হাঁটতে থাকলুম। শীতের রোদ্দুরে হাঁটতে বেশ আরামই হচ্ছিল। অবশ্য বাতাস সামনে থেকে জোরে বইছে। পিঠে মস্ত বোঁচকা নিয়ে একটু ঝুঁকে হাঁটতে হচ্ছিল, এই যা।
নিরু গান গেয়ে উঠল একটু পরে। আমরাও ওর সঙ্গে গলা মেলালুম। সতুও বেসুরো গলা নিয়ে যোগ দিল। মহানন্দে আমরা পাহাড়টা লক্ষ্য করে চলতে থাকলুম।
আমরা কখনও পাহাড়ে উঠিনি। প্রায় হাজার ফুট উঁচুতে বাংলোউঠতে আমরা সবাই হাঁপিয়ে পড়েছিলুম। পাহাড়ের গায়ে চারদিক ঘুরে গাড়ি ওঠার রাস্তা রয়েছে। রাস্তায় কোন কালে খোয়া এবং যৎসামান্য পিচের প্রলেপ ছিল। এখন আর নেই। ওই ঘুরপথে উঠলে ততটা কষ্ট হত না। কিন্তু তাহলে আর অভিযান কিসের? সোজা নাক বরাবর উঠে গেলুম। কিন্তু ভাগ্যিস, মাঝে-মাঝে গাছ ছিল। তাই জিরিয়ে নিচ্ছিলুম। এখন আর শীতের নামগন্ধ নেই। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে।
অবশেষে বাংলোর উঠোনে পৌঁছনো গেল। পুরোনো বাংলো তা বোঝাই যায়। পাথরের দেওয়াল। ছাদও পাথরের টালি দিয়ে তৈরি। অমু বলল, মনে হচ্ছে এখানে অনেককাল মানুষ আসেনি রে নিরু!
নিরু বলল,–সেজন্যেই তো এখানে এলুম।
সতু বলল, আমার যে খিদে পেয়েছে নিরু!
নিরু ধমক দিতে গিয়ে হেসে ফেলল, হুঁ! দাঁড়া–-দরজা খোলা যায় নাকি দেখি। কোন ব্যাটা তালা দিয়ে রেখেছে দেখছি।
বলে সে একলাফে উঁচু বারান্দায় উঠল। তারপর যেমনি তালা ধরে টেনেছে, উঠোনে আমরা যে গাছটার তলায় দাঁড়িয়েছিলুম, সেই গাছের ওপর থেকে খনখনে গলায় কে বলে উঠল,–এ বাবু! এ খোকাবাবু! তালা মাং টুটিয়ে। মাৎ টুটিয়ে!
আমরা আঁতকে উঠেছিলুম। তারপর দেখি ঝাকড়া গাছটার পাতার আড়ালে একটা লোক বসে আছে। অদ্ভুত লোক তো! এতক্ষণ বুঝি চুপচাপ সব দেখে যাচ্ছিল।
আমাদের অবাক করে সে হনুমানের মতো দিব্যি নেমে এল। পরনে ময়লা নোংরা একটা নেভি-রু হাফপ্যান্ট, গায়েও তেমনি একটা ঘেঁড়াখোঁড়া শার্ট, কাঁচা-পাকা চুলগুলো মাথায় যেন পেরেকের মতো খোঁচা-খোঁচা বসানো রয়েছে। লোকটার দুটো কানই লক্ষ করার মতো। বিরাট লম্বা কান। গোঁফও দেখার মতো। কিন্তু এত রোগা আর লম্বা মানুষ কখন দেখিনি।
আমরা ভড়কে গিয়েছি। কিন্তু সে কপালে হাত তুলে মিলিটারি কায়দায় সেলাম ঠুকে হিন্দিতে বলল, আমাকে ডাকলেই তো দরজা খুলে দিতুম! আমার নাম রামনারাণ। এ বাংলোর চৌকিদার আমি। বলুন, কী করতে হবে।
নিরু গম্ভীর হয়ে বলল, । তোমাকে অনেক কিছুই করতে হবে। আপাতত ঘর খুলে দাও। তারপর বলছি।
সে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে চাবির গোছা বের করে তালা খুলল। বিশ্রী আওয়াজ করে দরজা খুলে গেল। আমরা ঘরে ঢুকে দেখি, যাচ্ছেতাই অবস্থা। কতকাল পরিষ্কার করা হয়নি কে জানে। ধুলোময়লায় নোংরা হয়ে আছে। আসবাব বলতে কোণার দিকে একটা লোহার খাট। তার ছোবড়ার গদিটার শোচনীয় দশা। রামনারাণ জানালাগুলো খুলে দিল। ঘরে ঢুকে বোটকা গন্ধ পাচ্ছিলুম। বাতাস ঢোকায় গন্ধটা কমে গেল। নিরু তাড়া দিয়ে বলল, কী করো? মাসে-মাসে দিব্যি তো বেতন নাও! ঘরে একবার ঝাড়ুও দাওনি দেখছি! যাও, বঁটা আনো! জলও এনো এক বালতি।
রামানারাণ কাঁচুমাচু হয়ে বলল,-খবর দিয়ে এলে সব ঠিক করা থাকত খোকাবাবু। আচ্ছা ঘাবড়াবেন না। আমি এখনই সাফ করে দিচ্চি সব।
সে বাংলোর টানা বারান্দা দিয়ে পিছন দিকে চলে গেল। আমি আর অমু বাইরে এসে চারিদিক ঘুরে ফিরে দেখতে থাকলুম। অমু বলল, হ্যাঁ রে বিজু রামনারাণ গাছে চড়ে কী করছিল, বল তো?
বললুম,–জ্বালানির জন্যে শুকনো কাঠ ভাঙছিল নিশ্চয়।
অমু সন্দিগ্ধ স্বরে বলল, ভ্যাট! ওই তো কত শুকনো কাঠ পড়ে রয়েছে। গাছে উঠতে যাবে কেন? আয় তো দেখি।
আমরা গাছটার তলায় গেলুম। গাছটা অচেনা। চ্যাপ্টা পাতা, সাদা ডাল। খুব উঁচুও বটে। তেমনি ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। বললুম ফলটল পারছিল তাহলে।
কিন্তু ফল কোথায়? দেখছিস না শুধু পাতায় ভর্তি। অমু দেখতে-দেখতে বলল–।
হঠাৎ আমার চোখ গেল ওপরে একটা ছড়ানো মোটা ডালের দিকে। আঁতকে উঠে বললুম, অমু! অমু! ওটা কী রে? ওই যে–দেখতে পাচ্ছিস, ঝুলছে?
অমু দেখে অবাক হয়ে বলল, সর্বনাশ। ডাল থেকে একটা ফঁস লাগানো দড়ি ঝুলছে যে! ডালে দড়ি বেঁধে ও কী করছিল রে? সুইসাইড করতে যাচ্ছিল নাকি?
শিউরে উঠে বললুম,–ওরে বাবা! তাহলে তো আমরা এসে না পড়লে রামনারাণ নির্ঘাত গলায় দড়ির ফাঁস আটকাত! কী সাংঘাতিক ব্যাপার!
আমরা দুজনে এইসব বলাবলি করছি, এমন সময় নিরুর চেঁচামেচি কানে এল, তুমি আবার কে? রামনারাণ গেল কোথায়? তোমাকে দিয়ে চলবে না। রামনারাণকে ডাকো।
তাহলে রামনারাণ ছাড়া এখানে আরও একজন লোক আছে, বোঝা গেল। তার গলাও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল না, কী বলছে সে। একটু পরে দেখি তপু হাসতেহাসতে বেরিয়ে এল। আমরা তার কাছে এগিয়ে গেলুম। অমু বলল, কী হল রে?
তপু বলল, দ্যাখ গে না! খুব গোলমেলে ব্যাপার। বলে সে বাংলোর অন্য পাশে চলে গেল।
রামনারাণের কাণ্ডটা ওকে বলার সুযোগ পেলুম না। এদিকে দেখি, রামনারাণ ওপাশ থেকে এক বালতি জল আর ঝাড়ু নিয়ে আসছে। যে মানুষ মনের দুঃখে একটু আগে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে যাচ্ছিল, তার মুখে হাসি দেখে অবাক হয়ে গেলুম। সে ঘরে গিয়ে ঢুকল। তারপর চ্যাঁচামেচি বেশ বেড়ে গেল। তখন অমু বলল, আয় তো দেখি কী ব্যাপার?
