সবাই সায় দিয়েছিলুম। নিরু আমাদের লিডার। ব্যস এইটুকুই যথেষ্ট। ট্রেনে বার্থ রিজার্ভ থেকে শুরু করে সঙ্গে কী কী জিনিসপত্র নিতে হবে, সব ঠিক করল নিরু। আমরা চারজনে হুকুম তামিল করে গেলুম। তারপর এক শনিবার রাত নটার মেলট্রেনে আমরা সদলবলে উঠলুম। নিরু বলল, আপাতত আর কোনও কথা নয়। চুপচাপ নিজের বার্থে শুয়ে পড়। ঠিক সময়ে জাগিয়ে দেব।
ট্রেনে ঘুম ভালো হল না। অজানা জায়গায় আনন্দ যেমন, তেমনি অস্বস্তিও কম হচ্ছে না। না জানি কী বিপদ সেখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে!
ভোরের দিকে বোধ করি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, নিরুর ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। নিরু বলল, সামনের স্টেশনে নামতে হবে। উঠে পড় সব।
সবে শীত পড়েছে কলকাতায়। শেষরাতে ঠান্ডাটা পড়ে বেশি। কিন্তু এখানে দেখছি ঠান্ডা ভোরের দিকে অনেক বেশি। জানালা খুললে কনকনে হাওয়ায় হাড় কেঁপে উঠল। কুয়াশায় সব ঢাকা। তার মধ্যে মিটমিটে আলো দেখা যাচ্ছে। আমরা বিছানাপত্তর ঝটপট গুছিয়ে নিয়ে দরজার কাছে গেলুম।
বেশ বড় স্টেশন। কিন্তু তেমন ভিড় নেই। সতু বলল,–স্টেশনের নাম লেখা নেই রে!
নিরু বলল, তোকে স্টেশনের নাম নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না।
ধমক খেয়ে সে চুপ করে গেল। আমরা কিন্তু ঘুরে-ঘুরে স্টেশনের নাম খুঁজছিলুম। কোন স্টেশনের টিকিট কেটেছে নিরু, তাও তো জানি না। সব টিকিট ওর কাছে। চায়ের স্টলে চা খেতে-খেতে অমু সাহস করে বলল,–ঠিক স্টেশনে নেমেছি তো আমরা?
নিরুর শুধু জবাব,–হুঁ। তারপর বলল,–তোরা দাঁড়া। আবার টিকিট কাটতে হবে?
একটুপরে চা খেয়ে আমরা যে যার বোঁচকাকুঁচকি পিঠে আটকে নিয়ে স্কাউটদের মতো নিরুর পেছনে-পেছনে চললুম। ওভারব্রিজ দিয়ে অন্য একটা প্ল্যাটফর্মে গেলুম আমরা। তারপর নিরু বলল,–ট্রেন বদলাতে হবে। মিনিট পনেরোর মধ্যে ট্রেন পাওয়ার কথা। নাঃ। ওই যে আসছে। ওটাই হবে।
তবু বলল,-পোঁছব কখন?
নিরু বলল–প্রায় নটা বেজে যাবে। টপ্পাদার কথামতো।
যাকগে, বাঁচা গেল। তাহলে টপ্পাদার কাছে সব হালহদিস নিয়েই বেরিয়েছে নিরু! সে লিডার। আমরা চুপচাপ হুকুম তামিল করে যাব, ব্যাস!
এমন বিচ্ছিরি ট্রেনে কখনও চাপিনি, কামরাগুলো যেন কোন মান্ধাতার আমলে তৈরি। যেমন নোংরা, তেমনি বিদঘুঁটে শব্দ আর ঝাঁকুনি। ইঞ্জিনের হুইশিলও বড় মারাত্মক! কানের ভেতর গরম সিসে ঢুকে যাচ্ছে যেন। স্পিডও তেমনি ছাড়া গাড়ির মতো। ঘট ঘট ঘট্টাং…ঘট ঘট ঘট্টাং…একটানা বিরক্তিকর শব্দ। দুপাশে তখনও কুয়াশা। তাই কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কামরায় আমরা বাদে আর কেউ নেই। কঁকুনির চোটে প্রচণ্ড ঘুম আসছে। সতু তো হাঁ করে ঘুমুতে শুরু করল। দেখাদেখি আমিও আর চোখ খুলে থাকতে পারলুম না।
কতক্ষণ পরে নিরুর ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি ফাঁকা ধুধু মাঠের মধ্যে দিয়ে ট্রেন চলেছে। আর কুয়াশা নেই। রোদ্দুর ঝকমক করছে। কাছে ও দূরে টিলা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গাছপালা খুব কম। পাথুরে মাটি। কোনও ফসলের চিহ্ন নেই কোথাও। কোনও বসতির চিহ্নও চোখে পড়ছে না।
নিরু তাড়া লাগাল, রেডি, স্টেশন এসে গেল।
একটু পরে ট্রেনের গতি কমল। তারপর থামল। আমরা নেমে গেলুম জিনিসপত্তর নিয়ে, ট্রেনটা কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে ছেড়ে দিল। মনে হল, আমরা ছাড়া এ ট্রেনে যেন কোনও যাত্রী নেই!
তারপর দেখি, এ কী উদ্ভুট্টে স্টেশন। আমরা ছাড়া আর কেউ ট্রেন থেকে নামেনি। আর স্টেশন বলতে একটা মালগাড়ির কামরা নিচু প্ল্যাটফর্মের একধারে দাঁড় করানো আছে। তারও দরজা বন্ধ। কোথাও কোনও লোক নেই। একেবারে খাঁ-খাঁ নিঃঝুম। তারপর আমরা হইহই করে উঠলুম। প্ল্যাটফর্মের শেষে ইংরিজি ও হিন্দীতে বোর্ডে লেখা আছে কুরচি।
সতু বলল, কিন্তু আমরা থাকব কোথায়? কিছু দেখতে পাচ্ছিনে যে!
নিরু ধমকাল,–তোর আসাই উচিত হয়নি সতু! অ্যাডভেঞ্চারে বেরোতে হলে ওসব ভাবা চলে না।
সতু প্রায় কেঁদে ফেলার সুরে বলল, কিন্তু আমরা খাব কী? আমার যে বারবার খিদে পায়।
একথায় আমরা চারজনে হেসে উঠলুম। নিরু বলল–ওরে বোকা। খাওয়ার ব্যবস্থা না করে বেরোইনি। সে তুই ভাবিস নে। চল, মার্চ করে এগোন যাক্।
মালগাড়ির কামরাটা–থুড়ি, স্টেশনঘরের পাশ দিয়ে আমরা মাঠে নামলুম। কিছুটা হাঁটার পর একটা কাঁচা রাস্তা পাওয়া গেল। নিরু বলল–ওই যে পাহাড়টা দেখছিস, টপ্পাদা বলেছেন,–ওর ওপর একটা বাংলো পাওয়া যাবে।
সন্দিগ্ধ অমু বলল, কী করে বুঝলি ওটাই সেই পাহাড়?
নিরু তার বগলের ফাঁকে ঝোলানো কিটব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বাইনোকুলার বের করল। বলল, খালিচোখে দেখেই চিনেছি। তবে সার্টেন হওয়া যাক। বলে সে দূরবীন যন্ত্রটা চোখে রেখে কিছুক্ষণ দেখল। দেখে একটু হেসে বলল, আমার আইসাইটের জোর আছে। ভাবিস কী তোরা? ওটাই বটে। টপ্পাদা বলেছিলেন, শুধু ওই পাহাড়টাতেই কিছু গাছপালা-ঝোঁপঝাড় আছে–বাদবাকি সব ন্যাড়া। দ্বিতীয়ত, ওটার চূড়োয় একটা পুরোনো ভাঙাচোরা মন্দির আছে। মন্দিরের দেয়ালে বটগাছ গজিয়েছে। তৃতীয়ত, বাংলোটা পাহাড়ের অন্য পিঠে, তাই দেখা না গেলেও বাংলোর পিছনে একটা উঁচু দেবদারু গাছ আছে–তার ডগায় একটা সাদা পতাকা উড়ছে। পতাকাটাই প্রথমে চোখে পড়েছিল। তোদেরও এবার চোখে পড়বে তাকিয়ে দ্যাখ।
