পেছনে কালাচাঁদের ডাক শোনা গেল।–যশমশাই। কী হয়েছে?
–আমার সর্বনাশ করেছে গোরাচাঁদ ব্যাটাছেলে! দেখে যা কালাচাঁদ!
কালাচাঁদ ঘাটে এল। তার সঙ্গে একজন জটাজুটধারী লোক। তার হাতে ত্রিশূল। কপাল সিঁদুরে লাল। কালাচাঁদ বলল,-বাজার করে মোনাকে ডেকে নিয়ে এলুম। কেননা হতচ্ছাড়া হনুমান গোেরাচাঁদ কলকাতার বাবুমশাইকে জ্বালাতন করতে পারে। মোনা। শীগগির ওকে সেদিনকার মতো দাঁড়কাক করে দাও।
মোনা-ওঝা লাল চোখে ওপারের তালগাছের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে যন্ত্র পড়তে থাকল। তারপর কী অদ্ভুত ব্যাপার, সত্যিই একটা দাঁড়কাক একটা তালগাছের ডগায় উড়ে এসে বসল। তারপর কর্কশ স্বরে ডেকে উঠলা! স্খা! অঁাক! খ্রাক! গ্র্যা! গ্র্যা! গ্র্যাক! গ্র্যাক!
মোনা ত্রিশূল তুলে গর্জন করল,–চো-ও-প! মুখ খুললেই আবার অক্কা হয়ে যাবি।
এবার দাঁড়কাকটা স্থির হয়ে বসে রইল। বললুম,–যশমশাই! বাড়ি গিয়ে আবার পদ্য লিখতে বসুন। অন্তত মাস দেড়েক ধরে লিখতে থাকুন। তারপর আমার কাছে নিয়ে আসবেন। শুধরে দেব। আমি এখানে দুটো মাস থাকব।
তারাচরণ যশ খালি সুটকেস হাতে চুপচাপ চলে গেলেন। আমি দোতলার ঘরে গিয়ে এবার নিশ্চিন্ত মনে লিখতে বসলুম। তবে হ্যাঁ-সন্দীপ নতুনরকমের ভূতের কথা বলেছিল। মিলে গেল। ওকে বরং এই ভূত নিয়ে একটা বড় গল্প লিখে দেব। ভূত নিয়ে উপন্যাস লেখা কি সম্ভব আমার পক্ষে? সেটা পেরেছিলেন একমাত্র ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়।…
ভূতের চেয়ে সাংঘাতিক
কুরচি নামে একটা জায়গা আছে, কস্মিনকালেও শুনিনি। কিন্তু ওই যে আমাদের টপ্পাদা, তার আবার অদ্ভুত সব বাতিক। ম্যাপ খুঁজে খুঁজে উদ্ভুট্টে সব জায়গা বের করবেন। তারপর একটা শুভক্ষণ দেখে একদিন দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়বেন। ফিরে এসে এইসা একখানা গপ্পো শোনাবেন যে আমাদের গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাবে।
আমাদের অজানায় অভিযান ক্লাবের মূলে ওই টপ্পাদারই প্রেরণা ছিল। আমরা পঁচজন কিশোর মিলে রাতারাতি ক্লাবটা গড়ে ফেলেছিলুম। টপ্পাদা তার সভাপতি হলেন। ক্লাবের উদ্দেশ্য হল, আজগুবি অচেনা সব জায়গায় বেড়াতে যাওয়া। অর্থাৎ স্রেফ অ্যাডভেঞ্চার। প্রথমবার কোথায় যাওয়া হবে তা ঠিক করে দিলেন টপ্পাদাই এবং কুরচির কথা তার কাছে এই প্রথম শুনলুম। টপ্পাদা গম্ভীর মুখে বললেন, হা, কুরচিই ভালো হবে। প্রথমে ছোটখাট থেকে শুরু করা ভালো। ক্রমে-ক্রমে আরও কঠিন কঠিন জায়গার নাম বলব।
নিরু আমাদের নেতা। বয়সে বড়। ঢ্যাঙা, একটু কুঁজো, রোগাটে গড়ন। কিন্তু দারুণ সাহসী। সে খুঁতখুঁতে করে বলল, কুরচি। নাম শুনেই মনে হচ্ছে তেমন কিছু নয়। টপ্পাদা, বরং আরও দু-একটা জায়গার নাম বলুন।
টপ্পাদা রেগে গিয়ে বললেন,–তেমন কিছু নয়? ওরে হতভাগা! শেক্সপিয়ার পড়িসনি, তাই বলছিস! হোয়াটস ইন এ নেম? নামে কী আসে যায়? কুরচিকে অত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিস নে। মাত্র একরাত্তির ছিলুম সেখানে, তাতেই আমার যা অবস্থা হয়েছিল, বাপস!
টপ্পাদা চোখ বুজে কাঁধে ঝাঁকুনি দিলেন। যেন শিউরে উঠলেন। তবু বললুম, কী হয়েছিল টপ্পাদা?
টপ্পাদা চোখ খুলে মিটিমিটি হেসে মাথা দোলালেন। বললেন, উঁহু। আগে থেকে ফঁস করব না। তাহলে তো হয়েই গেল।
অমু বলল,–জাস্ট একটু হিন্ট দিন না! মানে…ঠিক…ব্যাপারটা…
টপ্পাদা মুখ ভেংচে বললেন,–মানে…ঠিক…ব্যাপারটা কী, গেলেই টের পাবে। সাহস থাকে তো যাও, নয়তো ভ্যানর-ভ্যানর কোরও না। আমি এখন নিজের কাজে বসব।
বলে টপ্পাদা বিহারের ম্যাপটা খুলে টেবিলে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। একটা ডটপেনের ডগা দিয়ে কী সব জায়গায় খোঁচাখুঁচি শুরু করলেন।
নিরু গম্ভীরমুখে বলল,–এক মিনিট ডিসটার্ব করছি টপ্পাদা!
টপ্পাদা ম্যাপে চোখে রেখে বললেন, উঁ?
–আরেকবার ম্যাপে কুরচিটা দেখিয়ে দিন না প্লিজ!
টপ্পাদা সহাস্যে ডটপেনের ডগা একটা জায়গায় রেখে বললেন,–এই যে এখানে। ভালো করে দেখেনে আবার।
নিরুর দেখাদেখি আমরা চারজনও ঝুঁকে পড়লুম ম্যাপের ওপর। কিন্তু কুরচি বলে কোনও নামই ডটপেনের ডগায় দেখতে পেলুম না। নিরু বলল, হুঁ বুঝেছি।
নিরু কী বুঝল কে জানে। সতু বলল,–কোথায় কুরচি? ওটা তো একটা শুঁয়োপোকা।
টপ্পাদা হো-হো হেসে উঠলেন,–ভূগোল এগজামিনে কত পেয়েছিস এবার?
সতু ভড়কে গিয়ে বলল, সাঁইতিরিশ টপ্পাদা!
–চোপ! চালাকি হচ্ছে? ম্যাপে পাহাড়পর্বত চিনিসনে, আবার বলছিস সাঁইতিরিশ পেয়েছিস? একেবারে তিরিশ চুরি? আচ্ছা বল তো, সাঁইতিরিশের তিরিশ চুরি করলে কত থাকে?
সতু আরও ভড়কে গিয়ে বলল,–সাত।
টপ্পাদা চোখ ছানাবড়া করে বললেন,–সাত! আঁ! হাসালি রে! সাঁইতিরিশের তিরিশ গেলে সাঁই থাকে না? আমরা টপ্পাদার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হেসে উঠলুম। সত্যি, সতুটা একেবারে গবেট। হাসির তোড়ে সতু একেবারে কোণঠাসা হয়ে গেল। আর কথাই বলল না। সাঁইতিরিশের তিরিশ গেলে সত্যি তো সাঁই পড়ে থাকে। কার সাধ্য এটা অস্বীকার করে?
নিরু বলল, ঠিক আছে? আশীর্বাদ করুন টপ্পাদা, যেন আপনার মুখ উজ্জ্বল করতে পারি।
টপ্পাদা ধমক দিয়ে বললেন, আমার মুখ উজ্জ্বল করে কাজ নেই। ক্লাবের মুখ উজ্জ্বল করলেই চলবে। যাও, এখন আর ডিসটার্ব কোরো না। কাজ করতে দাও…
আমাদের কুরচি অভিযানের ব্যাপারটা এভাবেই শুরু হয়েছিল। নিরু বলেছিল, আরে বোকা! ম্যাপে লেখা নেই বলেই তো আমরা সেখানে যাচ্ছি। ম্যাপে তো শুধু বড়-বড় জানাশোনা জায়গার নাম লেখা থাকে। সেসব জায়গায় তো রামশ্যাম-যদু–মধু সবাই যায়। এতে ক্রেডিট কীসের? অজানার অভিযানে বেরুব বলেই না আমরা ক্লাব করেছি।
