কথা শেষ না করে সে আমাকে দোতলায় পূর্বের একটা ঘরে নিয়ে গেল। তারপর জানালাগুলো খুলে দিয়ে বলল,–উত্তরে পুকুর। জোছনায় পুকুরের জলকেমন ঝিলমিল করছে দেখুন। পুকুরে মাছ আছে। কাল জেলে ডেকে এনে মাছ ধরাব।
উঁকি মেরে দেখে ভালো লাগল। তারপরই চোখে পড়ল আমার পাশেই টেবিলের ওপরে আমার ব্যাগ আর ব্রিফকেস রাখা আছে। ঘর তো তালাবন্ধ ছিল। ব্যাপারটা যে দেখছি একেবারে ভুতুড়ে!
কালাচাঁদ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ফের,–অ্যাই হনুমান! তালগাছের ডগায় আবার চড়েছিস?
আবার উঁকি মেরে কিছু দেখতে পেলুম না। কিন্তু তারপরই পুকুরের জলে ঝপাং করে কেউ ঝাঁপ দিল। বললুম,–কেউ যেন জলে ঝাঁপ দিল কালাচাঁদ-খুড়ো! গোরাচাঁদ নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। কথায় বলে, স্বভাব যায় না মলে! বলে কালাচাঁদ আমার দিকে ঘুরল।– বাবুমশাই! আপনি বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধোন। ওই দেখুন বাথরুম। আমি আপনার জন্য চায়ের ব্যবস্থা করি।
সে রাতে আর কোনও গণ্ডগোল ঘটেনি। তবে শুয়ে পড়ার পর পুকুরের জলে কিছুক্ষণ অন্তর বারদুয়েক ঝপাং করে কার ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ শুনেছি। কেউ তালগাছের ডগা থেকে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল তা ঠিক। গোরাচাঁদ নাকি?
ভোরে কালাচাঁদের ডাকে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সে কথামতো বেড-টি এনেছিল। চা খেতে-খেতে ওকে গোরাচাঁদের ব্যাপারটা জিগ্যেস করেছিলুম। কালাচাঁদ হাসতে-হাসতে বলেছিল,–ওকে নিয়ে চিন্তার কারণ নেই বাবুমশাই। মোনা-ওঝার নাম করেছি। আর হতচ্ছাড়া আপনার কাছে ঘেঁষবে না। বরং একটুখানি বাইরে ঘুরে জায়গাটা দেখে আসুন। ভালো লাগবে। আমি বাজারে যাই। খুঁজে পেলে মোনা ওঝাকেও ডেকে আনব। চিন্তা করবেন না।
সত্যি ঘুমঘুমিতলার প্রাকৃতিক পরিবেশ সুন্দর। গিরিবালা ভবনের কাছাকাছি কোনও বাড়ি নেই। ঝোঁপঝাড়, জঙ্গলে লাল ফুলের শোভা আর পাখির ডাক শুনে আমার মগজের কল্পনাযন্ত্রটি চালু হয়ে গেল। বাড়ি ফিরেই লিখতে বসলুম। কালাচাঁদ তখনও ফেরেনি।
কয়েক লাইন লিখেছি, নিচে কার হাঁকডাক শোনা গেল। কালাচাঁদ! ও কালাচাঁদ-খুড়ো! আমাদের মহামান্য লেখকমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলুম। যা বাবা! গেল কোথায় কালাচাঁদ! ও কল্লোলবাবু!
বিরক্ত হয়ে কাগজ কলম রেখে বারান্দায় গেলুম। তারাচরণ যশমশাইকে দেখতে পেলুম। তাঁর হাতে একটা সুটকেস।
একটু পরে তারাচরণ যশ উঠে এসে সুটকেস হাতেই নমস্কার করে সহাস্যে বললেন, আপনি আমার কী যে উপকার করেছেন! পদ্যটা যে শুনছে, সেই বলছে খাসা পদ্য।
বলে তিনি বারান্দার মেঝেতেই বসে পড়লেন। বললুম, আহা! ওখানে কেন? ঘরে চলুন।
না মশাই! ঘরে বসে পদ্য জমবে না। বলে তিনি সুটকেস খুলে একগাদা কাগজ বের করলেন। আপনাকে শোনাব বলে এনেছি। ভুল থাকলে শুধরে দেবেন। আপনি বরং ওই চেয়ারে বসুন। আমি শুরু করি।
সর্বনাশ! এ তো ভূতুড়ে উৎপাত নয়। মানুষের উৎপাত। এ উৎপাত ভূতের চেয়ে সাংঘাতিক। অতগুলো পদ্য শুনতে হলে সারাটা দিন কেটে যাবে। সন্দীপ কেন এসব লোকের কথা আমাকে বলেনি?
যশমশাই কাগজের সাজানো স্তূপ মেঝেয় রেখে মুচকি হেসে বললেন, বলতে ভুলে গেছি। গতকাল সন্ধ্যায় সে এক কাণ্ড। হঠাৎ হতচ্ছাড়া গোরাচাঁদ গিয়ে আমার পথ আটকে বলল, এবার তার পদ্য শুনতে হবে। বেগতিক দেখে মোনা-ওঝার নাম করে শাসালুম। তখন কেটে পড়ল। গোরাচাঁদ ওই পুকুরের ধারে বেঁকে থাকা একটা তালগাছের ডগায় চেপেছিল। বুঝলেন? এই তো গত মাসের কথা। ওর মাথায় ছিট হল। তারপর কী করে তালগাছের ডগা থেকে পুকুরের ঠান্ডা জলে পড়ে অক্কা। অক্কা বোঝেন তো? পৌষমাসে এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে। পুকুরের ঠান্ডা জলে পড়ে– ব্যস! গোরাচাঁদকে যখন ভোলা হল, তখন সে মড়া। পেটে জলভরা ঢোল মড়া! যাকগে ও কথা। শুরু করি।
এ বিপদের মুহূর্তে চোখ বুজে মনে-মনে যশমশাইয়ের মতো বললুম,–জয় মা তারা। কিন্তু তাতেও কাজ হল না। যশমশাই সগর্জনে পদ্য–আসলে ছড়াপাঠ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মাথামুন্ডু বোঝা যাচ্ছিল না। এই উৎপাত থেকে বাঁচবার জন্য শেষে মরিয়া হয়ে উঠেছিলুম। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,–গোরাচাঁদ-খুড়ো! বাঁচাও!
অমনি এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। দক্ষিণ থেকে একটা জোরালো ঘূর্ণিহাওয়া এসে যশমশাইয়ের কাগজগুলো উড়িয়ে নিয়ে চলল। যশমশাই আর্তনাদ করলেন, হায়! হায়! এ কী হল, মা গো!
ততক্ষণে কাগজগুলো শুন্যে ঘুরপাক খেতে-খেতে পূর্বদিক ঘুরে উত্তরে পুকুরের জলে গিয়ে পড়ছিল। অবশ্য পরে তা দেখেছিলুম। এদিকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তারাচরণ যশ বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে তার পদ্যের কাগজ ধরতে যাচ্ছিলেন। আমি তাকে টেনে ধরেছিলুম। তা না হলে উনি দোতলা থেকে নিচে পড়ে নির্ঘাত মারা যেতেন!
বাধা পেয়ে তিনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন। তাকে অনুসরণ করলুম। কালার্টাদ তখনও ফেরেনি। যশবাবুর সঙ্গে খিড়কির দরজা দিয়ে পুকুরের ঘাটে গেলুম। দেখলুম, তার পদ্যলেখা কাগজগুলো সবই ঘেঁড়া পাতার মতো জলে ভাসছে। ঘূর্ণি হাওয়াটা তখনও জলকে তোলপাড় করছে। তাই কাগজগুলো উল্টেপাল্টে ভিজে গিয়ে ডুবে যাচ্ছে।
যশমশাই জলে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলেন। তাকে দু-হাতে চেপে ধরে বললুম, বরং মোনাওঝাকে ডাকুন যশমশাই!
উনি এবার চেঁচিয়ে উঠলেন,–মোনা-ওঝা কোথায় আছিস রে? ওরে মোনা, শিগগির আয় রে।
